হোম » নারী » আর্টিকেল

নারীদের অধিকার ও মর্যাদায় ইসলামের ভূমিকা

১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সন্ধ্যা ০৭.০৫ ৪ মিনিটে পড়ুন Shahadat
feature

আজকের পৃথিবীতে আমরা দেখছি, নারীরা অফিস-আদালত থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, অবকাঠামো নির্মাণ ও কৃষিকাজে পুরুষের পাশাপাশি কায়িক শ্রম দিয়ে চলেছেন। ইট-পাথর বহন, মাটি কাটা কিংবা উদয়াস্ত কঠোর পরিশ্রমে তারা আজ লিপ্ত। কিন্তু এই কাজের পেছনে কি আদৌ কোনো সম্মান বা মর্যাদা নিহিত আছে? গার্মেন্টস শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের নিগ্রহ ও দুর্দশার চিত্র আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার অংশ। অথচ জীবিকার তাগিদে, পেটের ভাত জোগাড়ের নিরুপায় সংগ্রামে তারা এসব কাজে বাধ্য হচ্ছেন।

বর্তমান যুগে মাটির কাজ, দিনমজুরি বা কঠোর পরিশ্রমকে নারীর ‘অধিকার’ হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু এখানে আমাদের মৌলিক দ্বিমত রয়েছে। এগুলো নারীর অধিকার নয়, বরং অধিকার হারানোর করুণ পরিণতি। কাউকে অন্যায়ভাবে আঘাত করে আহত করার পর যদি বলা হয়-‘ওষুধ ও চিকিৎসা পাওয়া আহত ব্যক্তির অধিকার’, তবে তা কি যৌক্তিক হয়? চিকিৎসা প্রয়োজন, কিন্তু সেই প্রয়োজন তৈরি হওয়াটাই তো এক বড় অন্যায়। ঠিক তেমনি, নারীর জন্য কঠোর কায়িক শ্রম কোনো অর্জিত অধিকার নয়, বরং তার প্রাপ্য মর্যাদা ও সুরক্ষার অভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।

নারীর প্রকৃত অধিকার ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি
নারীর অধিকার ও মর্যাদা বুঝতে হলে প্রথমেই স্রষ্টার অভিপ্রায় ও সৃষ্টির রহস্য হৃদয়ঙ্গম করা প্রয়োজন। মানবজাতির বিকাশে নারী ও পুরুষের ভূমিকা পরিপূরক। পুরুষকে দেওয়া হয়েছে শক্তিশালী পেশি ও পরিশ্রমী দেহ, যেন সে প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে পরিবারকে সুরক্ষা ও আহার প্রদান করতে পারে। অন্যদিকে, নারীকে দেওয়া হয়েছে সন্তান ধারণের সক্ষমতা এবং স্নেহ-করুণায় পূর্ণ এক হৃদয়, যেন সে নতুন প্রজন্মকে লালন-পালন ও মমতা দিয়ে বড় করে তুলতে পারে। এই মৌলিক ভারসাম্য উপেক্ষা করলে মানবসভ্যতাই হুমকির মুখে পড়বে।

নারীর প্রকৃত অধিকার হলো এমন একটি নিরাপদ সংসার, যেখানে তার মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা থাকবে। কন্যা হিসেবে বাবা-মায়ের আদর-স্নেহ পাওয়া, স্ত্রী হিসেবে সম্মান, ভালোবাসা ও ভরণপোষণ লাভ করা এবং মা হিসেবে সন্তানদের সুশিক্ষায় গড়ে তোলার সুযোগ পাওয়া-এগুলোই তার চিরন্তন অধিকার। নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘আমাকে আদর্শ মা দাও, আমি তোমাকে আদর্শ জাতি উপহার দেব।’ জাতিগঠনে মায়ের যে অপরিহার্য ভূমিকা, তা কেবল একটি মর্যাদাপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশেই সম্ভব। যেহেতু নারী শারীরিক ও মানসিকভাবে তুলনামূলক কোমল, তাই জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তার সুরক্ষা ও অভিভাবকত্ব প্রয়োজন। এটি কেবল ধর্মীয় নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য।

অধিকার হারানোর প্রেক্ষাপট
নারী তার এই চিরন্তন অধিকার ও মর্যাদা কখন হারাল? যখন মানুষ প্রলোভনে পড়ে জীবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করল, নারী ও পুরুষ উভয়েই নিজ নিজ অবস্থান ও দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হলো। বর্তমান বস্তুবাদী সভ্যতায় জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের যে ঊর্ধ্বশ্বাস প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তাতে নারী-পুরুষ উভয়কেই জীবিকার অন্বেষণে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে। একটি সংসারে নারী যখন উপার্জনক্ষম হলো, তখন সে তার জন্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে গৌণ মনে করতে শুরু করল।

পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে নারীর লালিত্য, মাধুর্য ও লাবণ্য আজ হুমকির মুখে। ফুলকে যেমন ফুলদানিতে বা বাগানে রাখলে তার সৌন্দর্য ও অস্তিত্ব বজায় থাকে, তেমনি নারীকেও তার সৃষ্টিগত মর্যাদায় রাখা প্রয়োজন। অথচ আজকের এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তাকে কামারশালার উত্তপ্ত আগুনে হাতুড়ি পেটানো লোহার মতো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। এতে তার মর্যাদা বাড়েনি, বরং সে তার নারীত্বের সহজাত মাধুর্য হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে।

সামাজিক অবক্ষয় ও অধিকারহীনতা
পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসনে আজ পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়েছে। কিশোরীরা বাবা-মায়ের অবাধ্যতা শিখছে, নিজের কক্ষপথ নিজেই বেছে নিচ্ছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের টানাপোড়েনে সংসার ভাঙছে, শান্তি বিদায় নিচ্ছে। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে অশ্লীলতা ও কলহপ্রিয়তা বাড়ছে। সন্তানরা বাবা-মায়ের সান্নিধ্যের চেয়ে টেলিভিশন, ইন্টারনেট ও মোবাইলের কাছে বেশি সময় কাটাচ্ছে, ফলে তাদের মধ্যে পারিবারিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে উঠছে না। বার্ধক্যে মায়েরা আজ সন্তানের কাছে অবহেলিত হচ্ছেন, অথচ পরিবারের এই আশ্রয় ও শ্রদ্ধাই ছিল তার মৌলিক অধিকার।

দুইমুখী সংকটে নারী
আজ নারী এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। একদিকে বস্তুবাদী সভ্যতা নারীর সৃষ্টিগত অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে কঠোর পরিশ্রমের পথে ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে, তথাকথিত ধর্মব্যবসায়ীরা ফতোয়ার জাল বিস্তার করে নারীকে সমাজ ও অর্থনীতির মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। অথচ ইসলাম নারীর উপার্জনের পথে বাধা দেয়নি, বরং তার সম্মান ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, আজ নারীদের যে কষ্টকর কায়িক শ্রম বা জীবিকার সংগ্রামে নামতে হচ্ছে, তা তাদের অধিকার নয়, বরং অধিকার হারানোরই পরিণতি। আল্লাহ প্রদত্ত ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থায় নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য নির্দিষ্ট মর্যাদা ও অধিকার রয়েছে। সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই হোক আমাদের লক্ষ্য, যাতে নারী তার সৃষ্টিগত লাবণ্য ও মর্যাদা নিয়ে একটি নিরাপদ ও শান্তিময় জীবনে ফিরে আসতে পারে।

×
QR কোড স্ক্যান করুন