NEW জেলা অনুযায়ী সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬
হোম » আকিদা » গুরুত্বের ওলট পালট: প্রসঙ্গ সওম

গুরুত্বের ওলট পালট: প্রসঙ্গ সওম

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সন্ধ্যা ০৭.০০ ৪ মিনিটে পড়ুন Deenul Haq
feature

সওমের মাস বা রমজান এলে চারদিকে যেভাবে ব্যাপক আয়োজন শুরু হয়, তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে সওমই বুঝি ইসলামের একমাত্র বা প্রধান কর্তব্য। গণমাধ্যমগুলো ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে, পত্রিকায় প্রতিদিন বিশেষ ফিচার ও প্রবন্ধের জোয়ার বয়ে যায়। টেলিভিশনের পর্দায় জাদরেল আলেম-ওলামারা আলোচনার ঝড় তোলেন। সওমের বৈজ্ঞানিক উপকারিতা বোঝাতে হাজির হন চিকিৎসকেরা। রাতভর চলে হামদ-নাত এবং শেষ রাতে সেহরি নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান। ইসলামের একটি বুনিয়াদি বিধান নিয়ে এই যে ব্যাপক আলোচনা ও চর্চা, তা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য; কারণ ইসলামের কোনো বিষয় যত বেশি আলোচিত হবে, তা মানুষের জীবনে তত বেশি আচরিত হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-গুরুত্বের বিচারে আমরা কি সঠিক অবস্থানে আছি?

পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহ সওম ফরদ হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন মাত্র একবার এবং এর নিয়ম-কানুন বর্ণিত হয়েছে মাত্র দুই-তিনটি আয়াতে। পক্ষান্তরে, জেহাদ ও কিতাল (সংগ্রাম) ফরদ হওয়ার কথা বলা হয়েছে বহুবার এবং এর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে প্রায় সাতশর মতো আয়াতে। জেহাদ ও কিতাল সংক্রান্ত সব আয়াত একত্র করলে তা প্রায় আট পারার মতো হয়ে যায়। এমনকি মুমিনের সংজ্ঞার মধ্যেও আল্লাহ জেহাদকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন শুধুমাত্র তারাই যারা আল্লাহ ও রসুলের প্রতি ঈমান আনার পর আর সন্দেহ পোষণ করে না এবং সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে (সূরা হুজরাত ১৫)।’ লক্ষ্যণীয় যে, এই সংজ্ঞায় আল্লাহ সওমকে অন্তর্ভুক্ত করেননি, কিন্তু জেহাদকে করেছেন। শুধু তা-ই নয়, সওম পালন না করলে কেউ ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হবে-এমন কথা আল্লাহ কোথাও বলেননি। কিন্তু জেহাদ ত্যাগ করলে আল্লাহ কঠিন শাস্তি দেবেন এবং পুরো জাতিকে অন্য জাতির গোলামে পরিণত করবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন (সূরা তওবা ৩৯)। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, জেহাদ ছাড়া ইসলামের এমন কোনো আমল নেই যা পালন না করলে ইসলাম থেকে বহিষ্কার হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আল্লাহ বলেছেন, ‘কুতিবা আলাইকুমুল কিতাল- তোমাদের জন্য কিতাল (সংগ্রাম) ফরদ করা হলো (সূরা বাকারা ২১৬, ২৪৬, সূরা নিসা ৭৭)।’ ঠিক একই শব্দমালা ব্যবহার করে আল্লাহ সওমকেও ফরদ করেছেন- ‘কুতিবা আলাইকুম সিয়াম (সূরা বাকারা ১৮৩)।’ শব্দচয়ন উভয় ক্ষেত্রে একেবারে এক-কেবল এক স্থানে বলা হয়েছে ‘কিতাল’, অন্য স্থানে ‘সিয়াম’। আল্লাহ কোনো বিষয়ে একবার মাত্র হুকুম দিলেও তা অবশ্যই ফরদ এবং মহাগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো-যে বিষয়টি একইভাবে ফরদ করা হলো এবং সেই প্রসঙ্গে পবিত্র কোর’আনে শত শত বার তাগিদ দেওয়া হলো, সেটির গুরুত্ব কি মাত্র দুই-তিনটি আয়াতে বর্ণিত বিষয়ের চেয়ে কম হতে পারে? নিশ্চয়ই নয়। অথচ আজ জেহাদ ও কিতাল সম্পর্কে কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করেন না। মিডিয়ার কথা না-ই বা বললাম, মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে যে ইমাম সাহেব সওমের ফজিলত নিয়ে সুরেলা ওয়াজে শ্রোতাদের মোহিত করেন, তিনিও ভুলেও জেহাদের নাম উচ্চারণ করেন না।

এর কারণ কী? প্রথমত, সওম একটি অত্যন্ত ‘নিরাপদ’ আমল; এতে জীবনের ঝুঁকি নেই, আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই এবং বড় কোনো ত্যাগের প্রয়োজন নেই। পক্ষান্তরে জেহাদ এমন একটি আমল, যা করতে গেলে জীবন ও সম্পদের পূর্ণ কোরবানি প্রয়োজন। দ্বিতীয় কারণটি আরও গভীর। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে ইসলাম প্রচলিত আছে, তা মূলত আল্লাহ ও রসুলের বিশুদ্ধ ইসলাম নয়। এটি ব্রিটিশ খ্রিষ্টানদের তৈরি করা সেই বিকৃত ইসলাম, যা তারা মাদ্রাসার সিলেবাস ও কারিকুলাম তৈরির মাধ্যমে এই জাতির ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। এই বিকৃত ইসলামে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব (তওহীদ) নেই, দীনুল হক প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নেই এবং রাষ্ট্রীয় কোনো আইন-কানুন বা অর্থব্যবস্থা নেই। এটি নামাজ-রোজাসর্বস্ব অন্যান্য ধর্মের মতো একটি ব্যক্তিগত ‘উপাসনা ধর্মে’ পরিণত হয়েছে।

এই বিকৃত ধর্মের পণ্ডিতদের কাছে দীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নামাজ, রোজা, দাড়ি ও টুপি। অথচ তওহীদ ও জেহাদ-যা ছাড়া একজন মানুষ ‘মুমিন’ হতেই পারে না-তাকে তারা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় করে ফেলেছেন। মানুষ নামাজ পড়ুক বা রোজা রাখুক, তার আগে তো তাকে মুমিন হতে হবে। কাফেরের জন্য তো আর নামাজ-রোজার প্রয়োজন নেই। সুতরাং যে ইসলামে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব নেই এবং জেহাদ নেই, সেই ইসলাম একটি মৃত ও প্রাণহীন জীবনব্যবস্থা, যা মূলত আল্লাহর রসুলের ইসলামের বিপরীতমুখী একটি ধর্ম।

ধর্মপ্রাণ মানুষ পবিত্র রমজান মাসে সত্তর গুণ প্রতিদান পাওয়ার আশায় প্রচুর পরিমাণে ফরদ, ওয়াজেব ও নফল আমল করে থাকেন এবং এতেই তাঁরা আত্মতৃপ্তি লাভ করেন। কিন্তু করুণ বাস্তবতা হলো-আকিদাগত ভ্রান্তি থাকলে কোনো আমলই আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না। তওহীদহীন ইসলাম প্রকৃত ইসলাম নয় এবং এই জাতি আল্লাহর দেওয়া সংজ্ঞার আলোকে ‘মুমিন’ হিসেবেও গণ্য নয়। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো ‘গুরুত্বের ওলটপালট’। আল্লাহ ও তাঁর রসুল যে বিষয়কে (জেহাদ ও তওহীদ) সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন, বিকৃত ইসলামে তাকে গুরুত্বহীন করা হয়েছে। আর যে কাজটির গুরুত্ব তুলনামূলক কম, তাকেই আজ মহাগুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আকিদার এই বিচ্যুতিই আজ মুসলিম উম্মাহর যাবতীয় লাঞ্ছনার মূল কারণ।

লেখক পরিচিতি
Deenul Haq

Deenul Haq

কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান প্রচার এবং দ্বীনি দাওয়াতের একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। আমাদের সাথে থাকুন আপনার ঈমানি যাত্রায়।
×
QR কোড স্ক্যান করুন