কোর’আন খতমের বিনিময় গ্রহণ কতটুকু শরিয়তসম্মত?
রমজান মাস এলেই আমাদের দেশে তারাবির নামাজ নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক দানা বেঁধে ওঠে। বিশেষ করে তারাবির নামাজ ২০ রাকাত নাকি ৮ রাকাত-তা নিয়ে রীতিমতো ঝগড়া ও বাহাস চলতে থাকে। ২০ রাকাত তারাবির ক্ষেত্রে সাধারণত কোর’আন খতম করা হয়। একদল আলেম যুক্তি দেন যে, কোর’আনের তেলাওয়াত শুনলে অশেষ নেকি লাভ হয়, আর রমজানে তার সওয়াব বহুগুণ বেড়ে যায়। তবে একটি শব্দও না বুঝে কেবল তেলাওয়াত শোনার মধ্যে প্রকৃত সুফল কী-সে প্রশ্নও ইদানীং অনেকে তুলছেন।
বাস্তবতা হলো, অনেক সময় ধর্মীয় উপলক্ষগুলোকে কেন্দ্র করে ধর্মব্যবসার বাজার রমরমা হয়ে ওঠে। রমজান মাস তেমনই একটি সময়। এই মৌসুমে হাফেজে কোর’আনদের ব্যস্ততা ও চাহিদা বৃদ্ধি পায়। আমাদের সমাজে যেন একটি অঘোষিত নিয়ম দাঁড়িয়ে গেছে যে, কোরআনে হাফেজরা কেবল কোর’আন পাঠ করেই জীবিকা নির্বাহ করবেন। অনেক ক্ষেত্রে হেফজখানায় ভর্তির সময় থেকেই অভিভাবক বা শিক্ষার্থীরা এই পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হন। তাঁরা হয়তো হাফেজদের ফজিলত শুনে ভাবেন যে, বংশে একজন হাফেজ থাকলে পরকালে নাজাতের জন্য শাফায়াত পাওয়া যাবে। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যে আসহাবগণ ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন, তাঁরা কিন্তু জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে কোর’আন হিফজ করেননি। তাঁরা কোর’আন সংরক্ষণের জন্য হিফজ করেছিলেন এবং কোর’আন প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। বর্তমানের উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি ও ছাপাখানার যুগে কোর’আন সংরক্ষণের জন্য আগের মতো মুখস্থ রাখা অপরিহার্য না হলেও সওয়াবের আশায় এই চর্চাটি আজও বিদ্যমান।
হাফেজে কোর’আনদের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই প্রশ্ন জাগে-কোর’আন খতম দিয়ে অর্থ উপার্জন করা কি আসলেই বৈধ? যেহেতু জীবিকা বৈধ না হলে ইবাদত কবুল হয় না, তাই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, আল্লাহর রাসূল (সা.) কখনো ‘খতম তারাবি’ পড়েননি; এমনকি হাদিসের গ্রন্থগুলোতে ‘তারাবি’ শব্দটিও নেই বলে আলেমগণই উল্লেখ করে থাকেন। একে উত্তম আমল হিসেবে উৎসাহিত করার পেছনে কোনো বাণিজ্যিক স্বার্থ লুকিয়ে নেই তো? এ প্রশ্নের সমাধান আপনার নিজের বিবেকের কাছেই রইল। এখন দেখা যাক, কোর’আন ও তারাবির বিনিময় গ্রহণ সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
বিনিময় গ্রহণ সম্পর্কে মহান আল্লাহর সিদ্ধান্ত
পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বলেন: “যারা আল্লাহর অবতীর্ণ কেতাবকে গোপন করে এবং এর বিনিময়ে পার্থিব তুচ্ছমূল্য গ্রহণ করে তারা তাদের উদরে আগুন ছাড়া কিছুই পুরে না। হাশরের দিন আল্লাহ তাদেরকে পবিত্র করবেন না, তাদের সঙ্গে কথাও বলবেন না। এরাই হচ্ছে সেই সমস্ত মানুষ যারা সঠিক পথের পরিবর্তে ভ্রান্ত পথ এবং ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তি ক্রয় করেছে। আগুন সহ্য করতে তারা কতই না ধৈর্যশীল।” (সুরা বাকারা ১৭৪)।
অত্যন্ত সরল সত্য হলো, আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ মানে স্বয়ং ‘আগুন ভক্ষণ’। এ বিষয়ে আল্লাহ আরও বলেন: “তোমরা আমার আয়াতসমূহ সামান্যমূল্যে বিক্রি করো না এবং কেবল আমাকেই ভয় কর। আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-বুঝে সত্যকে গোপন করো না।” (সুরা বাকারা ৪১-৪২)। পবিত্র কোর’আনে ইসলামের যেকোনো কাজের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং যারা বিনিময় গ্রহণ করে তাদের অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলছেন: “অনুসরণ করো তাদের, যারা বিনিময় নেয় না এবং হেদায়াহপ্রাপ্ত।” (সুরা আল ইয়াসীন- ২১)।
বিনিময় গ্রহণ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা.) সিদ্ধান্ত
বিশিষ্ট সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে শিবল (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি: “তোমরা কোর’আন পড় তবে তাতে বাড়াবাড়ি করো না এবং তার প্রতি বিরূপ হয়ো না। কোর’আনের বিনিময় ভক্ষণ করো না এবং এর দ্বারা সম্পদ কামনা করো না।” (মুসনাদে আহমদ ৩/৪২৮; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা ৫/২৪০; কিতাবুত তারাবীহ)।
অর্থাৎ কোর’আন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রেও তিনি পরিমিতিবোধ বজায় রাখতে বলেছেন, যাতে শ্রোতা বা পাঠকারীর মনে বিরক্তি না আসে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে সম্পদ লাভের মানসিকতাকেও তিনি নিষিদ্ধ করেছেন। অর্থের বিনিময়ে কোর’আন খতমের বর্তমান ধারা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা.) একটি ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) একদিন আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়ে বললেন: “তোমরা সৌভাগ্য দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছি। তোমরা আল্লাহর কেতাব তেলাওয়াত করে থাক। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রসুল বর্তমান রয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতে মানুষের নিকট এইরূপ এক যুগ আসবে যখন তীরের ফলক বা দণ্ড যেরূপ সরল ও সোজা করা হয়, লোকেরা কোর’আন তেলাওয়াতকে ঠিক সেইরূপ সরল ও সোজা করবে। তারা দ্রুত তেলাওয়াত করে নিজেদের পারিশ্রমিক আদায় করবে এবং এর জন্য তাদের বিলম্ব সহ্য হবে না।” (মুসনাদে আহমদ, তাফসির ইবনে কাসীর)।
সাহাবী ও তাবেয়ীনদের অবস্থান
রাসূলের সাহাবীরা কোর’আন পাঠ বা শিক্ষাদানের বিনিময় গ্রহণ করাকে আগুনের মতো ভয় করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মা’কাল (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি এক রমজানে তারাবি পড়ানোর পর ঈদের দিন উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ প্রদত্ত এক জোড়া কাপড় ও ৫০০ দিরহাম ফেরত দিয়ে বলেছিলেন: “আমরা কোর’আনের বিনিময় গ্রহণ করি না।” (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা)। তাবেয়ী যাযান (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি কোর’আন পড়ে মানুষ থেকে এর বিনিময় গ্রহণ করে, সে যখন হাশরের মাঠে উঠবে তখন তার চেহারায় কোনো গোশত থাকবে না, শুধু হাড্ডি থাকবে।” (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা)।
ফকীহ ও ইমামদের সিদ্ধান্ত
আলেম-ওলামাগণ একমত যে, খতম তারাবির বিনিময় দেওয়া-নেওয়া উভয়ই নাজায়েজ ও হারাম। মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন: “বিনিময় লেনদেন হয় এমন খতম তারাবি শরিয়তপরিপন্থী। এরূপ খতমের দ্বারা সাওয়াবের অংশীদার হওয়া যাবে না বরং গোনাহের কারণ হবে।” (এমদাদুল ফতোয়া ১/৪৮)। দারুল উলুম দেওবন্দ কর্তৃক প্রদত্ত ফতোয়াতেও বলা হয়েছে: “বিনিময় গ্রহণ করে কোর’আন শরিফ তেলাওয়াত করা জায়েজ নেই। বিনিময়ের কোরআন তেলাওয়াত না শোনা উত্তম। কিয়ামুল লাইলের সাওয়াব শুধু তারাবি পড়লেই অর্জন হয়ে যাবে।” (ফতোওয়া দারুল উলুম)। একইভাবে ফতোয়ায়ে রশীদিয়া ও ফতোয়ায়ে আহলে হাদিসেও একে হারাম বলা হয়েছে। প্রখ্যাত আলেমগণ অর্থ দিয়ে কোর’আন শোনার চেয়ে ঘরে বসে ছোট সুরা দিয়ে তারাবি আদায় করাকেই সওয়াবের দিক থেকে উত্তম বলে অভিহিত করেছেন।
পরিশেষে, আমাদের মনে রাখা উচিত যে ধর্মব্যবসা ধর্মের প্রাণশক্তি ধ্বংস করে দেয়। একটি ভুল প্রথা দীর্ঘদিন চলে আসছে বলেই তা অনুসরণ করতে হবে এমন ধারণা ত্যাগ করা প্রয়োজন। এই ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ অবস্থানই পারে আমাদের হারানো গৌরব ও বিশুদ্ধ ধর্মচর্চা ফিরিয়ে আনতে।