সওম নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও বাড়াবাড়ি
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী ও হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কখনো কখনো তিনি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়েছেন, রাগে তাঁর মুখমণ্ডল লাল হয়ে গেছে। আমরা জানি, ক্রোধ মানুষের ‘ষড়রিপু’র অন্তর্ভুক্ত। প্রশ্ন জাগতে পারে-আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ও শ্রেষ্ঠ মহামানব কি তবে রিপুর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন? অসম্ভব! কারণ তিনি নিজেই শিক্ষা দিয়েছেন: “সবচেয়ে বড়ো পালোয়ান সেই ব্যক্তি যে নিজের ক্রোধকে পরাজিত করতে পারে।” (আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. থেকে মুসলিম, হাদিস-৬৪০৩)।
তাহলে সেই সর্বরিপুজয়ী মহামানব কেন রাগান্বিত হতেন? নিশ্চয়ই এর কোনো সুগভীর কারণ ছিল। রাসূল (সা.) অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে যে অপরাজেয় ‘উম্মতে মোহাম্মদী’ গড়ে তুলেছিলেন, সেই জাতির অস্তিত্ব ও ঐক্যবিনাশী কোনো কর্মকাণ্ড তাঁর সামনে ঘটলে তিনি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হতেন। জাতির ঐক্য, শৃঙ্খলা ও আনুগত্য হলো তার টিকে থাকার প্রধান শর্ত। আর এই ঐক্যবিনাশী কাজের অন্যতম প্রধান রূপ হলো-দীন নিয়ে অহেতুক বাড়াবাড়ি ও অতি-বিশ্লেষণ। বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন।
একবার একজন ব্যক্তি এসে অভিযোগ করলেন যে, জনৈক ইমাম নামাজ অনেক লম্বা করে পড়ান, ফলে তিনি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না বলে জামাতে যোগ দিতে পারেন না। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) এতটাই রাগান্বিত হলেন যে-বর্ণনাকারী আবু মাসউদ (রা.) বলছেন- “আমরা তাঁকে এত রাগতে আর কখনো দেখিনি।” (হাদিস- আবু মাসউদ রা. থেকে বোখারী)।
অন্য একটি ঘটনায় জানানো হলো যে, কিছু লোক সওম রাখা অবস্থায় স্ত্রীদের চুম্বন করেন না এবং রমজান মাসে সফরে থাকলেও সওম ছাড়েন না। এ কথা শুনে ক্রোধে বিশ্বনবীর (সা.) মুখ-চোখ লাল হয়ে গেল। তিনি মসজিদে গিয়ে মিম্বরে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা করার পর বললেন: “সেই সব লোকদের কী দশা হবে যারা আমি নিজে যা করি তা থেকে তাদের বিরত রেখেছে? আল্লাহর কসম তাদের চেয়ে আমি আল্লাহকে বেশি জানি এবং বেশি ভয় করি।” (হাদিস-আয়েশা রা. থেকে বোখারী, মুসলিম, মেশকাত)।
আল্লাহ যতটুকু করতে বলেছেন তার চেয়ে বেশি করা মূলত এক প্রকার সীমালঙ্ঘন ও জুলুম। আল্লাহর বিধানে যখন অতিরিক্ত কঠোরতা বা ‘তাশাদ্দুদ’ আরোপ করা হয়, তখন দ্বীনের সহজ-সরল বৈশিষ্ট্য হারিয়ে গিয়ে তা দুর্বোধ্য ও জটিল হয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষ দ্বীনের বিধান পালনে বীতশ্রদ্ধ ও হতাশ হয়ে পড়ে। রাসূল (সা.) সর্বদা এই বাড়াবাড়ি থেকে তাঁর সাহাবীদের সতর্ক করেছেন। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। আনাস (রা.) বলেন, “একবার নবী (সা.) এর সঙ্গে আমরা সফরে ছিলাম। আমাদের কেউ সিয়াম পালন করেছেন আবার কেউ ছেড়ে দিয়েছেন। এরপর প্রচণ্ড গরমের সময় আমরা এক প্রান্তরে অবতরণ করলাম। চাদরবিশিষ্ট লোকেরা আমাদের মধ্যে সর্বাধিক ছায়া লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। যারা সিয়াম পালন করছিল তারা কোন কাজই করতে পারছিল না। যারা সিয়াম রত ছিল না, তারা উটের তত্ত্বাবধান করছিল, খেদমতের দায়িত্ব পালন করছিল এবং পরিশ্রমের কাজ করছিল। তখন রসুলাল্লাহ বললেন, আজ তো সওম ভঙ্গকারীরা সমুদয় সওয়াব অর্জন করে নিল।” (বোখারি: ২৬৯১, মুসলিম: ২৪৯৩)।
সফরের কষ্ট থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য আল্লাহ সওম ছাড়ার অনুমতি দিয়েছেন-এটি মূলত বান্দার প্রতি আল্লাহর অশেষ রহমত। রাসূলের (সা.) জীবদ্দশায় সওম নিয়ে অহেতুক কঠোরতা কেউ করতে পারেনি। কিন্তু আজ এই জাতিকে এই ভারসাম্যহীনতা থেকে কে ফিরিয়ে আনবে?
বাস্তব অভিজ্ঞতার একটি করুণ চিত্র তুলে ধরছি। একবার এক পঁচাত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ হজ পালনকারী অন্তত ৪০ জন সমবয়সী মানুষের সঙ্গে ওমরাহ পালন করতে যাচ্ছিলেন। তাঁদের ফ্লাইটের দিনটি ছিল পহেলা রমজান। ভোর চারটায় সেহরি খেয়ে বিমানবন্দরে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর দুবাই হয়ে জেদ্দা পৌঁছাতে তাঁদের দীর্ঘ সময় লেগে যায়। বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে দশটায় তাঁরা মক্কায় পৌঁছান। সৌদি আরবের সময় অনুযায়ী তাঁদের সূর্যাস্ত হতে আরও কয়েক ঘণ্টা বাকি ছিল। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ মুসাফিরদের জন্য সওম ছাড়ার স্পষ্ট বিধান রেখেছেন: “যে লোক অসুস্থ অথবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে, সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করে নিবে।” (সুরা বাকারা ১৮৫)।
কিন্তু তাঁদের সাথে থাকা মোয়াল্লিম, যিনি একজন ‘মুফতি’ হিসেবে পরিচিত, তিনি সেই বৃদ্ধ হাজিদের সওম ভাঙার অনুমতি দিলেন না। তাঁর যুক্তি ছিল-রাসূলের যুগে সফর কষ্টকর ছিল, এখন বিমান ভ্রমণ আরামদায়ক, তাই এই সুবিধা নেওয়া যাবে না। ফলে সেই বয়োবৃদ্ধ মানুষগুলোকে সেদিন প্রায় সাড়ে ষোল ঘণ্টা রোজা রাখতে হয়েছিল। এটিই হলো দীন নিয়ে সেই বাড়াবাড়ি, যা রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন।
বিদায় হজের ভাষণে তিনি হুশিয়ারি দিয়েছিলেন: “হে মানুষ! তোমরা কখনোই দীন (বিধি-বিধান) নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না- কারণ অতীতে বহু জাতি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে।” ইয়ামেনে প্রতিনিধি পাঠানোর সময়ও তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন: “তোমরা (দীন পালনকে) সহজ কর, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, বীতশ্রদ্ধ করো না। পরস্পর মেনে ও মানিয়ে চলো, মতবিরোধ করো না।” (বোখারি ৩০৩৮, মুসলিম ৪৬২৬)।
আজ আমাদের আলেম-ওলামারা সওম নিয়ে হাজার হাজার খুঁটিনাটি ও কাল্পনিক প্রশ্নের অবতারণা করেন। কিন্তু সাহাবীরা এমন অহেতুক প্রশ্ন পছন্দ করতেন না। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “আমি রসুলাল্লাহর সঙ্গীদের চাইতে উত্তম কোনো মানব দল কখনো দেখিনি। রসুলাল্লাহর গোটা যিন্দেগীতে তাঁরা তাঁকে মাত্র তেরটি প্রশ্ন করেছেন। এর সবগুলোই কোর’আনে উল্লেখ হয়েছে।” সাহাবীরা কেবল সেই সব বিষয়েই প্রশ্ন করতেন যা তাঁদের জন্য উপকারী ছিল। উমর (রা.) মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেছেন, “আমি আল্লাহর নাম নিয়ে যা ঘটেনি সে সম্পর্কে কোন ব্যক্তি কর্তৃক প্রশ্ন করাকে নিষিদ্ধ করছি। কারণ যা কিছু ঘটবে তার সব কিছুরই বিবরণ আল্লাহ দিয়ে দিয়েছেন।” (দারেমি ১/৫০)।
উমর ইবনে ইসহাক (রহ.) বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বহু সাহাবীর দেখা পেয়েছেন এবং তাঁদের মতো সহজ ও জটিলতামুক্ত মানুষ আর দেখেননি। সাহাবীরা রাসূল (সা.)-কে যা করতে দেখতেন, ঠিক সেভাবেই অনুসরণ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনোই ওজুর ফরজ বা ওয়াজিব নিয়ে চুলচেরা ব্যাখ্যা দেননি।
অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কোনো মাসআলা জানতে চাইলে রাসূল (সা.) তা সহজভাবে বলে দিতেন। কিন্তু কেউ যদি অহেতুক খুঁটিয়ে জানতে চাইত, তবেই তিনি রেগে যেতেন। কারণ তিনি জানতেন, এই অতি-বিশ্লেষণ ও ফতোয়াবাজিই পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করে তাদের ধ্বংস করে দিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আজকের মুসলিম উম্মাহও ঠিক সেই একই পথে হাঁটছে। সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ দ্বীনকে তারা অতি-বিশ্লেষণের মাধ্যমে জটিল ও শতধা বিভক্ত করে ফেলেছে। ফলে তারা আজ হীনবল ও দুর্বল হয়ে অন্যের গোলামিতে পর্যবসিত হয়েছে। আকিদার এই বিচ্যুতি ও বাড়াবাড়ি থেকে মুক্তি পাওয়াই আজ এই জাতির টিকে থাকার প্রধান শর্ত।