NEW জেলা অনুযায়ী সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬
হোম » ইবাদত » শিল্পচর্চায় হালাল ও হারামের সীমারেখা
সুস্থ সংস্কৃতি ও বিনোদনের ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

শিল্পচর্চায় হালাল ও হারামের সীমারেখা

auth Deenul Haq ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৪ মিনিটে পড়ুন
feature

শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চা মানুষের সহজাত ও প্রাকৃতিক প্রবণতা। মহান আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা এই প্রাকৃতিক প্রবৃত্তিকে রুদ্ধ করেনি, বরং একে সঠিক ও কল্যাণকর পথে পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ইসলামপূর্ব আরব সমাজে অশ্লীল কাব্যচর্চার ব্যাপক প্রচলন ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) কাব্যচর্চাকে নিষিদ্ধ করেননি, বরং কেবল তার মধ্য থেকে অশ্লীলতা পরিহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি পবিত্র কোরআনও নাজিল হয়েছে অনন্য কাব্যিক ও অলঙ্কারপূর্ণ ভাষায়। একইভাবে সেকালের আরবদের নাচ-গান ও জীবনাচরণে যে চারিত্রিক স্খলন ছিল, ইসলাম কেবল সেই ‘অশ্লীলতা’কে নিষিদ্ধ করেছে; কিন্তু পরিশীলিত সংস্কৃতি বা গানকে হারাম ঘোষণা করেনি।

ইসলামে কোনো কিছু হালাল বা হারাম হওয়ার মূলনীতি হলো-আল্লাহ যা স্পষ্টভাবে হারাম করেননি, তা-ই হালাল। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে গুটিকতক কাজ ও খাদ্য হারাম করেছেন। তিনি বলেন: “বলুন, আমার পালনকর্তা কেবলমাত্র অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন-যা প্রকাশ্য ও যা গোপন; হারাম করেছেন আল্লাহর নাফরমানি, অন্যায়-অত্যাচার, আল্লাহর সাথে এমন কিছুকে অংশীদার করা যার কোনো সনদ তিনি অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা যা তোমরা জানো না।” (সুরা আরাফ: ৩৩)

এই আয়াতের আলোকে তিনটি বিষয়কে প্রধানত নিষিদ্ধ করা হয়েছে: ১. প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, ২. আল্লাহর বিধানের লঙ্ঘন বা নাফরমানি এবং ৩. আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা। সুতরাং এই মৌলিক নীতিগুলো মেনে যেকোনো শিল্পচর্চা বা বিনোদন ইসলামে বৈধ। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপস্থিতিতে মদিনায় সাহাবায়ে কেরামের বিয়ে কিংবা বিভিন্ন উৎসবে দফ (বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে গান গাওয়ার নজির রয়েছে। আল্লাহর রাসূল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন: “তোমরা এই বিবাহের ঘোষণা দাও, এটি মসজিদে সম্পন্ন করো এবং বিবাহ উপলক্ষে দফ বাজাও।” (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)

সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্র যদি আমূল হারাম হতো, তবে পবিত্র কোরআনের কোনো না কোনো আয়াতে অবশ্যই তার উল্লেখ থাকত। কিন্তু আল্লাহ এ জাতীয় কোনো নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেননি। বরং নবী দাউদ (আ.)-এর সুরেলা কণ্ঠ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ মুজিজা। তিনি ‘বীণা’ (Harp) নামক বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়, এমনকি তৎকালীন মুদ্রাতেও এর চিত্র অঙ্কিত ছিল।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানব ইতিহাসের ব্যস্ততম বৈপ্লবিক মহাপুরুষ। মাত্র ৯-১০ বছরে ১০৭টি ছোট-বড় সামরিক অভিযানের আয়োজন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তনের সংগ্রামে তিনি নিয়োজিত ছিলেন। এমন এক মহান বিপ্লবীর কেবল গান-বাজনা নিয়ে পড়ে থাকার অবকাশ ছিল না। তবুও বিভিন্ন হাদিস থেকে জানা যায়, অবসরে নিজ গৃহে কিংবা যুদ্ধজয় শেষে ফেরার পর তাঁকে গান শোনানো হয়েছে এবং তিনি তা শুনেছেন। এমনকি মদিনার মসজিদে নববী নির্মাণের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের সঙ্গে সম্মিলিত কণ্ঠে ‘কর্মসঙ্গীত’ গেয়েছিলেন। (বোখারী ও মুসলিম)

জাহেলিয়াতের যুগে গান ও অশ্লীলতা একীভূত ছিল বলে কোনো কোনো সাহাবী একে অপছন্দ করতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের সেই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছিলেন। আম্মা আয়েশা (রা.) গান পছন্দ করতেন এবং তাঁর গৃহে রাসূল (সা.)-এর উপস্থিতিতেই গান গাওয়ার একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে:

১. একদিন দুজন মেয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঘরে দফ ও তাম্বুরা বাজিয়ে গান গাইছিল। তখন আবু বকর (রা.) এসে তাদের তিরস্কার করলে নবীজি (সা.) বললেন, “আবু বকর! ওদের গাইতে দাও, আজ ওদের ঈদের দিন।” (সহিহ বোখারী)

২. আয়েশা (রা.) যখন লালন-পালন করা এক মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফিরলেন, তখন রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন-সেখানে গীত গাওয়ার মতো কাউকে পাঠানো হয়েছে কি না? কারণ হিসেবে তিনি বললেন, “আনসাররা অত্যন্ত সঙ্গীতপ্রিয়।” (মিশকাত)

৩. আবু বোরায়দা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) একটি যুদ্ধ থেকে ফেরার পর একজন নারী সাহাবী এসে বললেন যে-তিনি মানত করেছিলেন রাসূল (সা.) নিরাপদে ফিরলে সামনে দফ বাজিয়ে গান গাইবেন। নবীজি (সা.) তাঁকে মানত পূর্ণ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। (তিরমিজি ও আবু দাউদ)

পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধানে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার দ্বার উন্মুক্ত। মানুষের নিজের মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে বিকশিত করে গান, নাটক, কবিতা, চলচ্চিত্র বা অভিনয়ের মাধ্যমে সত্য ও সুন্দরের প্রচার করার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। তবে শর্ত হলো-সেখানে অশ্লীলতা, মিথ্যা, প্রতারণা ও আল্লাহর নাফরমানি থাকা চলবে না। বিনোদন জীবনের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তা জীবনের পরম লক্ষ্য নয়। মানুষের মূল কর্তব্য হলো-আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে ন্যায়, শান্তি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত থাকা। এই মহান লক্ষ্যের পরিপন্থী না হয়ে যেকোনো সুস্থ সংস্কৃতিই ইসলামে অনুমোদিত।

টপিক: বিনোদনশিল্পচর্চাসঙ্গীত ও ইসলামসুস্থ সংস্কৃতিসৃজনশীলতা
লেখক পরিচিতি
Author

Deenul Haq

সম্পাদক
কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান প্রচার এবং দ্বীনি দাওয়াতের একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। আমাদের সাথে থাকুন আপনার ঈমানি যাত্রায়।
×
QR কোড স্ক্যান করুন