NEW জেলা অনুযায়ী সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬
হোম » উম্মাহ ও সংস্কার » আসুন, জাতীয় জীবনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্...
মুক্তি ও শান্তির একমাত্র শাশ্বত পথ

আসুন, জাতীয় জীবনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করি

auth Deenul Haq ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৬ মিনিটে পড়ুন
feature

মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই শান্তিপ্রিয়। সে চায় শান্তিতে ও নিরাপদে জীবনযাপন করতে। অন্যায়, অবিচার, অশান্তি ও হানাহানি কোনো সুস্থ মানুষই কামনা করে না। শান্তিতে বাস করার এই প্রবণতা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। তবে একটি সমাজে শান্তি বিরাজ করবে নাকি অশান্তি, তা নির্ভর করে সেই সমাজের প্রচলিত জীবনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর। জীবনব্যবস্থা যদি ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে মানুষ তার শত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শান্তিতে বাস করতে পারে না এবং নিজের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

আজকের জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রতিটি মানুষই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কামনা করে। প্রতিটি মানুষ চায় এমন এক সমাজে বাস করতে, যেখানে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ভয় থাকবে না। যেখানে জনজীবনে কোনো আতঙ্ক থাকবে না। বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে হিমশিম খেতে হবে না। কারো কষ্টার্জিত অর্থ কেউ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করবে না। মানুষ চায় স্বাধীনভাবে কথা বলতে ও মতামত প্রকাশ করতে। যেখানে বিচারালয়ে কোনো ঘুষ থাকবে না, নির্দোষ ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হয়রানি করা হবে না। যেখানে মানুষ তার পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারবে এবং শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রাণ হারানোর শঙ্কামুক্ত থাকবে।

কিন্তু এই পরম আকাঙ্ক্ষিত শান্তি অর্জনের জন্য মানবজাতিকে কিছু অত্যাবশ্যকীয় শর্ত পূরণ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষ এক উন্নত মস্তিষ্কসম্পন্ন প্রাণী। প্রকৃতির সবকিছুকে বশে আনার মতো বৈজ্ঞানিক ক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তি যেমন মানুষের রয়েছে, তেমনি তার মধ্যে এমন রিপুর তাড়না, হিংসা, লোভ ও অহঙ্কার রয়েছে, যা সুন্দর এই পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। মানুষ চাইলে একদিকে যেমন পৃথিবীকে জান্নাতের বাগানে পরিণত করতে পারে, তেমনি তার ভুল সিদ্ধান্তে দুনিয়াকে নরককুণ্ডে পরিণত করতে পারে।

মানুষের মধ্যে ভালো ও মন্দ-যেকোনো কিছু গ্রহণ বা বর্জন করার ইচ্ছাশক্তি আল্লাহই প্রদান করেছেন। তবে আল্লাহ চান মানুষ ন্যায়পথে পরিচালিত হোক এবং শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করুক। এজন্যই তিনি যুগে যুগে তাঁর নবী-রসুলদের পাঠিয়েছেন। নবী-রসুলগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘হেদায়াহ’ বা সঠিক পথের বাণী নিয়ে এসেছেন। সেই বাণীর মূল কথা হলো-আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কারো হুকুম ও বিধান মানব না। এই ধ্রুব সত্যের স্বীকৃতি দেওয়াই হলো ঈমান বা তওহীদ।

পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বলেছেন, “যে বিষয়ে আমি নূহকে নির্দেশ দিয়েছিলাম এবং যা আমি তোমার কাছে ওহী হিসেবে পাঠিয়েছি, তেমনি আমি ইবরাহীম, মুসা ও ঈসাকে যে নির্দেশ দিয়েছিলাম তা হলো – তোমরা দীন কায়েম করবে এবং এ নিয়ে কোনো প্রকার মতভেদ করবে না। তুমি যেদিকে মোশরেকদের আহ্বান করছ, তা তাদের কাছে কঠিন মনে হয়; আল্লাহ যাকে চান তাঁর দিকে পরিচালিত করেন এবং যে তাঁর দিকে মুখ ফিরায়, তাকে তিনি হেদায়াত দেন” (সুরা শুরা- ১৩)।

অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর নবী-রসুলদের হেদায়াহ ও দীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন। এখানে ‘দীন’ হলো আল্লাহর প্রেরিত পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানুষ ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে কীভাবে চলবে, তার অর্থনীতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও ব্যবসা-বাণিজ্য কেমন হবে-সবকিছুর মূলনীতি এই জীবনব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ কেবল দীন পাঠিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং নির্দেশ দিয়েছেন এই দীনকে প্রতিষ্ঠিত করতে। কারণ তিনি জানেন, এই দীন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত মানুষ অন্যায়, অবিচার ও রক্তপাতে নিমজ্জিত থাকবে।

আজ আমাদের দেশের মানুষ শান্তি ও স্বস্তি চায়। তারা চলমান রাজনৈতিক সংঘাত ও হানাহানি থেকে মুক্তি চায়। তবে যে জীবনব্যবস্থার মাধ্যমে তারা শান্তি খুঁজছে, তা দিয়ে প্রকৃত শান্তি আসা অসম্ভব। মানুষের তৈরি সীমিত জ্ঞানের কোনো সিস্টেম বা তন্ত্র-মন্ত্র দিয়ে পৃথিবীতে নিখুঁত শান্তি আনা সম্ভব নয়। কিন্তু মহান আল্লাহ যেহেতু মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি জানেন কোন ব্যবস্থায় মানুষ সুখে ও শান্তিতে থাকতে পারবে। এজন্য আখেরী নবী (সা.)-এর মাধ্যমে তিনি এমন একটি জীবনব্যবস্থা পাঠিয়েছেন, যা চির সতেজ, গতিশীল ও প্রাকৃতিক নিয়মের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি যেকোনো স্থান ও সময়ের জন্য কার্যকর ও শান্তিদায়ক।

দুর্ভাগ্যবশত, এই জাতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আল্লাহর দেওয়া দীন ত্যাগ করে মানুষের তৈরি তন্ত্র-মন্ত্রের ওপর আস্থা রেখেছে। তারা মনে করে, আধুনিক রাজনীতির জটিল ক্ষেত্রে আল্লাহর দেওয়া দীন মানা সম্ভব নয়। তাদের চিন্তা-চেতনায় ও মস্তিষ্কে মানুষের দেওয়া বিধানগুলোই স্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছে। কিন্তু মানুষের তৈরি এই জীবনব্যবস্থাগুলোর বিষময় ফল আজ আমাদের সামনে স্পষ্ট। এই পথে শান্তি লাভের আর কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই এখন সময় এসেছে মানুষের তৈরি ভঙ্গুর ব্যবস্থাগুলোকে বর্জন করে আল্লাহর দেওয়া শাশ্বত দীনকে গ্রহণ করার।

প্রশ্ন হলো, এই দীন আমরা কীভাবে প্রতিষ্ঠা করব? এর উত্তর হলো-আল্লাহর রসুল (সা.) যে পদ্ধতিতে দীন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ঠিক সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা। সেই পদ্ধতিটি হচ্ছে জেহাদ বা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও আপোষহীন সংগ্রাম। বর্তমানে জেহাদের নানা ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক হামলা বা সন্ত্রাসবাদকে জেহাদ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা চরম বিভ্রান্তি। জেহাদ ও সন্ত্রাস সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। জেহাদ হচ্ছে আল্লাহর দীনের প্রয়োজনীয়তা মানুষের কাছে যুক্তি ও হিকমত দিয়ে ব্যাখ্যা করা-তা হতে পারে মৌখিকভাবে বা লেখনীর মাধ্যমে। অন্যদিকে, সন্ত্রাস হচ্ছে হিংসাত্মক কাজ ও ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। অথচ আজ ইসলামের এই পবিত্র সংগ্রামকে সন্ত্রাস হিসেবে প্রচার করে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করা হচ্ছে। বাস্তবে জেহাদ হলো সমাজে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক পবিত্র আমল।

এ ব্যাপারে পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বলছেন, “আর তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাক যতক্ষণ না ফেতনা নির্মূল হয় এবং আল্লাহর সমস্ত হুকুম প্রতিষ্ঠা হয়।” (সুরা আনফাল: ৩৯)। তিনি আরো বলেছেন, “তোমাদের কী হল যে, তোমরা আল্লাহর রাহে লড়াই করছ না দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে, যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদিগকে এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর; এখানকার অধিবাসীরা যে, অত্যাচারী! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষালম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও।” (সুরা নিসা ৭৫)।

সুতরাং স্পষ্ট যে, সমাজের অসহায় ও নিপীড়িত মানুষকে রক্ষা করাই হচ্ছে জেহাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য। এই জেহাদ করতে হবে মানুষকে বুঝিয়ে, লিখে এবং তওহীদের প্রকৃত শিক্ষা ও ইসলামের আকিদাহ মানুষের সামনে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করে। এই দাওয়াতের প্রক্রিয়াটি হতে হবে বিনম্র ও হিকমতপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলছেন: “তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহবান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর। নিশ্চয় একমাত্র তোমার রবই জানেন, কে তার পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে এবং হেদায়াতপ্রাপ্তদের তিনি খুব ভাল করেই জানেন” (সুরা আন-নাহল ১২৫)।

এখানে কোনো প্রকার জোরাজুরি বা চাপ প্রয়োগ করা নিষেধ। আল্লাহ বলেছেন, “এই দীনে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সুরা বাকারা ২৫৬)। অর্থাৎ কাউকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা যাবে না। তবে এই প্রচার করতে গিয়ে জান-মালের ক্ষতি ও বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হতে পারে। তাই আল্লাহ সুরা বাকারা ১৫৫ আয়াতে বলেছেন, “আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, জান-মালের ক্ষতি ও ফল-ফসলের ধ্বংসের মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।”

আমাদের এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে। যখন মানুষ উপলব্ধি করবে যে আল্লাহর হুকুমের মধ্যেই প্রকৃত মুক্তি, তখন তাদের একটি সুসংগঠিত কর্মসূচির অধীনে আনতে হবে। রসুল (সা.)-এর শেখানো সেই কর্মসূচি হলো পাঁচটি:
১. তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া
২. নেতার আদেশ শোনা
৩. নেতার নির্দেশ পালন করা
৪. হিজরত করা (শিরক ও কুফর পরিত্যাগ করা)
৫. আল্লাহর রাস্তায় জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করে জেহাদ করা।

রসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এই ঐক্যবন্ধন থেকে এক বিঘত পরিমাণও বিচ্যুত হলো, সে তার গলদেশ থেকে ইসলামের বন্ধন খুলে ফেলল, যদি না সে তওবা করে ফিরে আসে। আর যে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের কোনো বিষয়ের দিকে আহ্বান করল, সে নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করলেও, নামাজ পড়লেও এবং রোজা রাখলেও সে জাহান্নামের জ্বালানি হবে।’

এই সুশৃঙ্খল আদর্শই একসময়কার অনগ্রসর ও বিশৃঙ্খল আরব জাতিকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতায় রূপান্তরিত করেছিল। যারা তুচ্ছ কারণে রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকত, ইসলাম তাদের ভ্রাতৃত্বের ডোরে আবদ্ধ করেছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে তারা বিশ্বের কাছে মডেল হয়ে উঠেছিল।

কাজেই আমরাও মানুষকে আল্লাহর দেওয়া সেই দীন গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। কারণ, আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য দীন হলো ইসলাম। এর বাইরে অন্য কোনো পথে মানুষ প্রকৃত শান্তি পাবে না। তাই পৃথিবীতে ও পরকালে শান্তি পেতে হলে আমাদের অবশ্যই আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আল্লাহ কোর’আনে যা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন এবং যা রসুলাল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেটিই একমাত্র বিশুদ্ধ ইসলাম। আসুন, আমরা সেই শান্তির পথে ঐক্যবদ্ধ হই।

টপিক: জাতীয় জীবনতওহীদদীন প্রতিষ্ঠাশান্তিসমাজ সংস্কার
লেখক পরিচিতি
Author

Deenul Haq

সম্পাদক
কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান প্রচার এবং দ্বীনি দাওয়াতের একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। আমাদের সাথে থাকুন আপনার ঈমানি যাত্রায়।
×
QR কোড স্ক্যান করুন