ইসলামের সকল আলেম ও ফকিহদের সর্বসম্মত অভিমত হলো-আকিদা সঠিক না হলে ঈমানের কোনো মূল্য নেই। আর ঈমান ছাড়া নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতসহ হাজারো ইবাদত অর্থহীন। ঈমান হলো সেই মূল ভিত্তি, যার ওপর ইবাদতের ইমারত দাঁড়িয়ে থাকে। প্রশ্ন হলো-যে আকিদা সঠিক না হলে ঈমান ও আমল সবকিছুই পণ্ড হয়ে যায়, সেই মহা-গুরুত্বপূর্ণ ‘আকিদা’ আসলে কী?
সহজ কথায়, আকিদা হলো কোনো বিষয় বা বস্তু সম্পর্কে সঠিক ও সম্যক ধারণা (Comprehensive Concept)। কোনো একটি জিনিসের উদ্দেশ্য কী এবং তা দিয়ে কী হয়-সে সম্পর্কে স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ ধারণাই হলো আকিদা। আল্লাহ তাঁর রাসূলদের মাধ্যমে মানবজাতিকে যে ‘দীন’ বা জীবনব্যবস্থা দিয়েছেন, তা কি কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া দিয়েছেন? অবশ্যই নয়। যদি আমরা সেই মূল উদ্দেশ্য না বুঝি বা ভুল পথে পরিচালনা করি, তবে পুরো দীনই আমাদের জন্য অর্থহীন হয়ে পড়বে।
মোটরগাড়ির উপমা ও আকিদার গুরুত্ব
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। মনে করুন, কেউ আপনাকে একটি চমৎকার মোটরগাড়ি উপহার দিলেন। গাড়িটি হলো ‘ইসলাম’। আর গাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে ‘মেইনটেন্যান্স বুক’ দেওয়া হলো, তা হলো পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিস।
গাড়ি তৈরির মূল উদ্দেশ্য হলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করা। আর যাত্রীদের আরামের জন্য ভেতরে গদি দেওয়া হয়েছে, শোনার জন্য মিউজিক প্লেয়ার লাগানো হয়েছে এবং বাহ্যিক সৌন্দর্যের জন্য সুন্দর রং করা হয়েছে। এখন আপনি যদি মেইনটেন্যান্স বই দেখে অতি সতর্কতার সাথে গাড়িতে তেল-মবিল দেন, চাকা পাম্প করেন এবং প্রতিদিন ধোয়ামোছা করে ঝকঝকে রাখেন, কিন্তু না জানেন যে গাড়িটি দিয়ে ‘ভ্রমণ’ করতে হয়-তবে আপনার যাবতীয় পরিশ্রমই অর্থহীন।
আপনি যদি গাড়ির আসল উদ্দেশ্য না বোঝেন, তবে অগ্রাধিকারের (Priority) ক্ষেত্রেও ভুল করবেন। আপনার কাছে তখন গন্তব্যস্থলে যাওয়ার চেয়ে গাড়ির রেডিও চালানো বা সিটে বসে আরাম করাই মুখ্য হয়ে দাঁড়াবে। ঠিক একইভাবে, বর্তমান মুসলিম উম্মাহ ইসলামের আমলগুলো (নামাজ, রোজা, হজ) নিখুঁতভাবে পালনের চেষ্টা করছে, কিন্তু ইসলামের প্রকৃত উদ্দেশ্য-অর্থাৎ ‘শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা’-তা ভুলে গেছে। আমরা কোরআন-হাদিস দেখে দাড়ি, টুপি, পাগড়ি বা লেবাস নিয়ে অতি সতর্ক, অথচ তওহীদ ও তা প্রতিষ্ঠার সেই মূল সংগ্রামী লক্ষ্য (গন্তব্য) হারিয়ে ফেলেছি। ফলে আজ আমরা গ্যারেজে পড়ে থাকা এক অকেজো গাড়ির মালিকের মতো সারা বিশ্বে লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত হচ্ছি।
আকিদা: ইসলামের মালার সেই অদৃশ্য সুতো
ইসলামের অসংখ্য বিধান-নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, জেহাদ-এগুলোকে যদি একেকটি ফুল ধরা হয়, তবে ইসলাম হলো সেই ফুলগুলো দিয়ে গাঁথা একটি সুন্দর ‘মালা’। কিন্তু ফুলগুলোকে যতক্ষণ না একটি সুতো দিয়ে গেঁথে শক্ত গিঁট দেওয়া হবে, ততক্ষণ তা মালা হতে পারবে না। এই সুতোর গিঁটটিই হলো ‘আকিদা’। যে সঠিক ধারণার মাধ্যমে ইসলামের সমস্ত বিধান, বিশ্বাস ও রাসূলের সংগ্রামী জীবনের কর্মপ্রক্রিয়া একটি সূত্রে সমন্বিত থাকে, তাকেই আকিদা বলা হয়।
গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ যেমন ইঞ্জিন, গিয়ারবক্স বা চাকা সঠিকভাবে স্থাপন করতে না পারলে তা গাড়ি হিসেবে সফল হয় না, তেমনি আকিদার জ্ঞান না থাকলে দীনের কোনো বিধান কোথায় প্রয়োগ হবে তা বোঝা অসম্ভব। গত ১৪০০ বছরে এক আল্লাহ, এক রাসূল ও এক কিতাবের অনুসারী এই জাতিকে ভেঙে শত শত ফেরকা ও মাজহাবে বিভক্ত করা হয়েছে। আজ একেকটি ফেরকা ইসলামের একেকটি খণ্ডিত অংশকে (যেমন কেবল পোশাক বা কেবল তসবিহ) আঁকড়ে ধরে তাকেই পূর্ণাঙ্গ ইসলাম মনে করছে। ফলে সামগ্রিক ইসলামের যে উদ্দেশ্য-শান্তি প্রতিষ্ঠা-তা অর্জিত হচ্ছে না।
রাসূল (সা.)-এর আগমনের প্রকৃত লক্ষ্য
পবিত্র কোরআনের অন্তত তিনটি আয়াতে (সুরা ফাতাহ: ২৮, সুরা সফ: ৯ ও সুরা তওবা: ৩৩) আল্লাহ পরিষ্কারভাবে রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেন, “তিনিই তাঁর রাসূলকে হেদায়াহ ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন, যেন একে অন্য সমস্ত জীবনব্যবস্থার ওপর জয়যুক্ত করেন।”
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সমগ্র নবুয়তি জীবন ব্যয় করেছেন এই দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। তাঁর সংগ্রামী জীবনের সেই মূল লক্ষ্য ভুলে গিয়ে আজ আমল বা পদ্ধতিগুলোকেই চরম লক্ষ্য বানিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলশ্রুতিতে আজ মুসলিম বিশ্ব ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো একের পর এক মুসলিম দেশগুলো ধ্বংস করছে, গণহত্যা চালাচ্ছে এবং কোটি কোটি মানুষকে উদ্বাস্তু করছে। অথচ জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে এই আগ্রাসন মোকাবিলা করতে পারছে না।
উত্তরণের পথ
এই ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দুটি কাজ জরুরি: প্রথমত, যাবতীয় অনৈক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং দ্বিতীয়ত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সংগ্রামী জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য ও কর্মপন্থা অনুধাবন করে সেই পথে অগ্রসর হওয়া। কিন্তু দীনের প্রকৃত আকিদা হারিয়ে যাওয়ায় মানুষ ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তর্ক ও বাহাসে লিপ্ত হয়ে ঐক্যের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।
এমতাবস্থায়, হেযবুত তওহীদ সেই মহৎ উদ্যোগ নিয়েছে-যাতে আল্লাহ ও রাসূলের প্রকৃত আকিদা জাতির সামনে তুলে ধরা যায়। হাজারো বিকৃতি ও মতভেদের পাহাড় সরিয়ে ইসলামের মূল দর্শনের দিকে যদি জাতি ফিরে আসে, তবেই পুনরায় বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সম্ভব। মনে রাখতে হবে, আকিদাবিহীন ঈমান ও আমল মূলত প্রাণহীন এক কাঠামো মাত্র।

