হোম » ধর্মীয় আকিদা » আর্টিকেল

মো’মেন ও মুসলিম বনাম কাফের ও মোশরেক

১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সন্ধ্যা ০৬.৫০ ৪ মিনিটে পড়ুন Shahadat
feature

‘মো’মেন’ ও ‘মুসলিম’-পবিত্র কোর’আনের এই দুটি পরিভাষা পৃথক তাৎপর্য বহন করলেও আমাদের সমাজে সচরাচর এদের সমার্থক মনে করা হয়। একইভাবে কাফের ও মোশরেক শব্দের সংজ্ঞাও আমাদের সঠিকভাবে জানা প্রয়োজন। কারণ, সঠিক সংজ্ঞা জানা না থাকলে আমরা নিজেদের প্রকৃত অবস্থান-অর্থাৎ আমরা মো’মেন নাকি কাফের-তা নিরূপণ করতে পারব না। আসুন, আল্লাহর কিতাবের আলোকে এই শব্দগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ জেনে নিই।

মো’মেন:
পবিত্র কোর’আনে মো’মেনদের পরিচয় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। আল্লাহ বলেন, “মো’মেন কেবল তারাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনে, অতঃপর কোনো সন্দেহ পোষণ করে না এবং তাদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জেহাদ (সর্বাত্মক সংগ্রাম) করে।” (সুরা হুজুরাত: ১৫)। এই সংজ্ঞার আলোকে মো’মেন হওয়ার দুটি প্রধান শর্ত পরিলক্ষিত হয়:

১. তওহীদ বা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব: ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়-জীবনের কোনো অঙ্গনেই আল্লাহর হুকুম ছাড়া অন্য কারো বিধান না মানার দৃঢ় অঙ্গীকার।

২. জেহাদ ফী সাবিলিল্লাহ: আল্লাহর নাজিলকৃত সত্যদীন ‘ইসলাম’কে পৃথিবীতে বিজয়ী করার লক্ষ্যে জান ও মাল উৎসর্গ করে নিরন্তর সংগ্রাম করা।

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, যারা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে এবং ব্যক্তিগত আমল (নামাজ-রোজা) করে, তারাই মো’মেন। কিন্তু কেবল অস্তিত্বে বিশ্বাস করা মো’মেন হওয়ার একমাত্র শর্ত নয়; কারণ এই বিশ্বাস তো ইবলিসেরও আছে। মো’মেন হওয়ার প্রকৃত শর্ত হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করা, অন্য সকল খোদাদ্রোহী শক্তিকে অস্বীকার করা এবং দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত থাকা। মো’মেনদের প্রতি আল্লাহর ওয়াদা হলো-তিনি তাদের পৃথিবীতে ‘খেলাফত’ বা কর্তৃত্ব দান করবেন এবং তাদের ক্ষমা করে জান্নাতে দাখিল করবেন (সুরা নূর: ৫৫)। এই মাপকাঠিতে বিচার করলে দেখা যায়, বর্তমান বিশ্বের বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী কার্যত মো’মেনর সংজ্ঞার বাইরে চলে গেছে; কারণ তারা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ত্যাগ করে মানুষের তৈরি আইন ও জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং দীন প্রতিষ্ঠার জেহাদও বর্জন করেছে।

মুসলিম:
আল্লাহ কোর’আনে নির্দেশ দিয়েছেন, “হে মো’মেনগণ! তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।” (সুরা ইমরান: ১০২)। এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, মো’মেন ও মুসলিমের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। ‘মুসলিম’ শব্দটি এসেছে ‘তসলিম’ থেকে, যার অর্থ বশ্যতা স্বীকার করা বা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করা। সুরা হুজুরাতের ১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- আরবরা বলে ‘আমরা ঈমান এনেছি’। হে রাসুল! আপনি বলুন, ‘তোমরা ঈমান আনোনি; বরং বলো-আমরা বশ্যতা স্বীকার করেছি। কারণ ঈমান এখনও তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি।’

সুতরাং, যারা আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা ‘ইসলাম’-এর কাছে নতি স্বীকার করে, তারাই মুসলিম। ইসলামের পণ্ডিতদের মতে, যারা কোনো প্রশ্ন বা শর্ত ছাড়া আল্লাহর সমস্ত হুকুমের কাছে গর্দান পেতে দেয়, তারাই প্রকৃত মুসলিম। কিন্তু বর্তমান মুসলিম উম্মাহর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা কয়েক শতাব্দী ধরে আল্লাহর হুকুমের পরিবর্তে মানুষের তৈরি বিধানের আনুগত্য করছে। যারা কোর’আন ও ইসলামের পরিবর্তে অন্য কোনো জীবনব্যবস্থাকে সাদরে গ্রহণ করে, তারা কোনো যুক্তিতেই ‘মুসলিম’ পরিচয় বহন করতে পারে না।

কাফের:
আল্লাহ বলেছেন, “মানুষ দুই প্রকার-মো’মেন ও কাফের।” (সুরা তাগাবুন: ২)। তাই মো’মেনের সংজ্ঞায় যারা পড়ে না, তারা স্বভাবতই কাফেরের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ স্পষ্টভাবে কাফেরের সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন, “আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তা দিয়ে যারা শাসন বা বিচারকার্য পরিচালনা করে না, তারাই কাফের, জালেম ও ফাসেক।” (সুরা মায়েদা: ৪৪, ৪৫, ৪৭)। এই মানদণ্ড অনুযায়ী, আল্লাহর জীবনব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রত্যাখ্যান করে যারা পাশ্চাত্য বা মানবসৃষ্ট আইন দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, তারা কার্যত কাফেরের কাতারে শামিল হয়েছে।

মোশরেক:
‘মোশরেক’ শব্দটি ‘শিরক’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক বা অংশীদার করা। জীবনের কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম মানা আর অন্য ক্ষেত্রে মানুষের তৈরি বিধান অনুসরণ করার নামই শিরক। আল্লাহ বলেন, “তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ মানো আর কিছু অংশ মানো না? যারা এমনটা করে, তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি।” (সুরা বাকারা: ৮৫)।

আল্লাহ শিরকের অপরাধ কখনোই ক্ষমা করবেন না বলে ঘোষণা করেছেন (সুরা নিসা: ৪৮)। তিনি শিরককে ‘সবচেয়ে বড় জুলুম’ এবং মোশরেকদের ‘নাপাক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বর্তমান মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা হলো-তারা নামাজ-রোজার মতো কিছু ব্যক্তিগত বিধান পালন করলেও রাজনীতি, অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থায় মানুষের তৈরি বিধান মেনে নিচ্ছে। এটিই হলো প্রকাশ্য শিরক। এই ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো-আল্লাহ ছাড়া সকল হুকুমদাতাকে অস্বীকার করা (তওহীদ) এবং পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করা (সুরা বাকারা: ২০৮)।

উপরে প্রদত্ত কোর’আনিক সংজ্ঞার আলোকে আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের ঈমান ও আমলকে পরখ করে নেওয়া এবং প্রকৃত মো’মেন ও মুসলিম হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা।

×
QR কোড স্ক্যান করুন