‘সার্বভৌমত্ব’ শব্দটি মূলত ‘সর্বভূমি’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর অবাধ ও নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, সার্বভৌম সত্তা বলতে এমন এক কর্তৃপক্ষকে বোঝায়, যিনি সকল আইনের ঊর্ধ্বে এবং যাঁর ক্ষমতা কোনো সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নয়। জাঁ বোডিন, জন অস্টিন, থমাস হবস, জন লক কিংবা জাঁ-জ্যাক রুশোর মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের প্রদত্ত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সার্বভৌমত্বের মূল বৈশিষ্ট্য হলো অসীম ক্ষমতা ও শ্রেষ্ঠত্ব।
প্রকৃতপক্ষে, রক্ত-মাংসের কোনো মানুষ কখনো ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। মানুষ মরণশীল, পরমুখাপেক্ষী এবং তার জ্ঞান অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। অনাগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই নিরঙ্কুশ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার যোগ্যতা কোনো মানুষের থাকতে পারে না। এ কারণেই ইসলামে সার্বভৌমত্বের একক অধিকার কেবল মহান আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে; যিনি মহাবিশ্বের স্রষ্টা, সকল সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে, আদি ও অন্তহীন, এবং সকল সত্তার ধারক।
ইলাহ: চূড়ান্ত সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ
ইসলামের মূলমন্ত্র ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র মধ্যে ‘ইলাহ’ শব্দটি সার্বভৌমত্বের ধারণাকে পূর্ণতা দেয়। ইলাহ শব্দের অর্থ হলো-তিনি সেই সত্তা, যাঁর হুকুম বা নির্দেশ মানা অনিবার্য (He who is to be obeyed)। এই কালেমা বা তওহীদে বিশ্বাস স্থাপন করাই হলো আল্লাহর প্রতি ঈমানের ভিত্তি এবং ইসলাম গ্রহণের প্রথম শর্ত। প্রত্যেক নবী-রাসূল এই একই দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন যে, একমাত্র স্রষ্টাই হবেন চূড়ান্ত হুকুমদাতা। আল্লাহ বলেন, “আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই দিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই; সুতরাং আমারই আনুগত্য করো।” (সুরা আম্বিয়া: ২৫)।
এই তওহীদ বা সার্বভৌমত্বের ধারণা কেবল মুসলমানদের জন্য নয়, বরং এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য সত্য। আরবী ভাষায় ‘ইলাহ’ শব্দটি এসেছে বলে এর মর্মার্থ নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রাচীন হিব্রু, সুমেরীয়, অ্যারামাইক এমনকি সংস্কৃত ও পালি ভাষার ধর্মগ্রন্থগুলোতেও স্রষ্টার এই এককত্বের প্রতিধ্বনি ছিল। সনাতন ধর্মের ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ (তিনি এক, যাঁর কোনো দ্বিতীয় নেই) কিংবা ‘একমব্রহ্ম দ্বৈত্ব নাস্তি’ কথাগুলো মূলত তওহীদের ঘোষণারই নামান্তর। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বারবার নিজের সার্বভৌমত্বের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, “তোমাদের ইলাহ একমাত্র আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সকল জ্ঞানের অধিকারী।” (সুরা ত্বাহা: ৯৮)।
সৃষ্টিকর্তার কেন সার্বভৌমত্ব প্রয়োজন?
আল্লাহ কেন একমাত্র নিরঙ্কুশ কর্তৃপক্ষের মালিক হবেন, তার যৌক্তিক কারণও তিনি কোরআনে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, “যেহেতু তিনি সৃষ্টি করেছেন, তাই কেবল তাঁরই নির্দেশ প্রদানের (সার্বভৌমত্বের) অধিকার রয়েছে।” (সুরা আরাফ: ৫৪)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “বলুন, হে আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী (মালিকুল মুলক)। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান করো এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও।” (সুরা আল ইমরান: ২৬)।
বর্তমানে পৃথিবীতে প্রচলিত মানবরচিত ব্যবস্থাগুলোতে সার্বভৌমত্বের উৎস ভিন্ন ভিন্ন। যেমন-গণতন্ত্রে সার্বভৌমত্ব থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের হাতে, সমাজতন্ত্রে তা থাকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের (পলিট ব্যুরো) হাতে, আর রাজতন্ত্রে থাকে রাজার হাতে। যখন সার্বভৌমত্ব মানুষের হাতে অর্পিত হয়, তখন সেই মানুষ বা গোষ্ঠী প্রায়শই স্বৈরাচারী (Fascist) হয়ে ওঠে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সার্বভৌমত্ব আল্লাহর হাতে থাকায় এবং শাসক কেবল তাঁর বিধানের আমানতদার হওয়ায় সেখানে স্বৈরাচারী হওয়ার অবকাশ নেই। রাসূল (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামল এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তওহীদ বনাম শিরক: আপসহীন অবস্থান
ইসলামে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নেই। ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহকে বিশ্বাস করা আর জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় জীবনে অন্য কোনো মানবরচিত সার্বভৌমত্বকে গ্রহণ করা মূলত ‘শিরক’। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “আল্লাহ অন্য যেকোনো অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করলেও শিরকের অপরাধ কোনোভাবেই ক্ষমা করবেন না।” (সুরা নিসা: ৪৮)।
সুতরাং তওহীদ হলো আল্লাহর সাথে বান্দার এক গভীর চুক্তি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “জান্নাতের চাবি হলো তওহীদ।” (আহমদ)। বান্দার সাথে আল্লাহর এই চুক্তি হলো-বান্দা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে চূড়ান্ত হুকুমদাতা মানবে না। এখানে মনে রাখতে হবে, এই তওহীদ কেবল জিকির-আসকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আইন-কানুনসহ মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানের নিঃশর্ত আনুগত্য। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়ার প্রকৃত অর্থ সুরা আহযাবে পরিষ্কার করা হয়েছে: “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর সেই বিষয়ে ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না।” (সুরা আহযাব: ৩৬)।
পরিশেষে, তওহীদ বা আল্লাহর সার্বভৌমত্বই হলো মানবজাতির প্রকৃত মুক্তি ও বিশ্বশান্তির একমাত্র চাবিকাঠি। মানুষের তৈরি ত্রুটিপূর্ণ বিধানের পরিবর্তে স্রষ্টার নিখুঁত জীবনব্যবস্থাকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে গ্রহণ করার মাধ্যমেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও শান্তি নিশ্চিত হতে পারে।

