একটি রাষ্ট্র যখন বিভিন্ন দিক থেকে পিছিয়ে পড়ে, রাষ্ট্রীয় খাতগুলো দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয় এবং নাগরিকদের মধ্যে জাতীয় ঐক্যের বদলে বিভেদ ও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়, তখন এর দায়ভার মূলত সেই রাষ্ট্রের শিক্ষিত সমাজের ওপরই বর্তায়। শিক্ষিত শ্রেণির এই নৈতিক স্খলন প্রমাণ করে যে, বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো না কোনো গভীর মৌলিক ত্রুটি রয়েছে।
বর্তমানে এই অপ্রিয় সত্যটি প্রায় সর্বমহলে স্বীকৃত। আমাদের প্রচলিত সাধারণ শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা-উভয় ক্ষেত্রেই এই ব্যর্থতা স্পষ্ট। সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছর এটি লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার সৃষ্টি করছে। যারা কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন, তাদের একটি বড় অংশ দুর্নীতির চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা ওপরস্থ মহলের অন্যায় আদেশ নির্লজ্জভাবে পালন করছেন এবং নীতি-নৈতিকতার চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। জাল সার্টিফিকেট প্রদান, গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি এবং তুচ্ছ পদোন্নতির জন্য নোংরা রাজনীতিতে লিপ্ত হওয়া আজ উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। উচ্চশিক্ষিত ব্যাংকার, আমলা কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার ও আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, বর্তমান শিক্ষা মানুষকে দক্ষ করতে পারলেও দেশপ্রেমিক বা মানবতাবাদী করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।
অন্যদিকে, মাদ্রাসাকে নৈতিক শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র দাবি করা হলেও সেখান থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্র বা সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে ধর্মকে বৈষয়িক স্বার্থে ব্যবহার করা, ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি এবং ‘মব কালচার’ বা গণহিংস্রতার মতো নেতিবাচক কাজে তাদের সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে চরম নৈতিক অবক্ষয় ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার খবরও পাওয়া যায়। এর মূল কারণও সেই একই-ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা।
একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত নির্ধারিত হয় সেই রাষ্ট্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে। যেমন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ফরাসিদের জন্য সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছিলেন তাঁর বিশ্বজয়ের লক্ষ্যকে সামনে রেখে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট জাতীয় লক্ষ্য কী এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে কী ধরনের নাগরিক প্রয়োজন, তা আজও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে। ব্রিটিশদের মূল লক্ষ্য ছিল এমন একদল ‘কেরানি’ তৈরি করা যারা তাদের শাসনব্যবস্থার সহায়ক হবে। পাশাপাশি, ১৭৮১ সালে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস কর্তৃক আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিকৃত ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে মুসলমানদের মানসিকভাবে ব্রিটিশদের অনুগত দাসে পরিণত করা। প্রায় ১৪৬ বছর ধরে ব্রিটিশ খ্রিষ্টান পণ্ডিতরা এই মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেছেন। সেখানে কর্মমুখী শিক্ষার বদলে কেবল অকেজো মাসলা-মাসায়েলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে শিক্ষিতরা জীবিকার প্রয়োজনে ধর্মকেই পণ্যে পরিণত করতে বাধ্য হয়। আজ স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা সেই ষড়যন্ত্রমূলক দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থাই বয়ে বেড়াচ্ছি।
এই দ্বিমুখী ব্যবস্থার ফলে সমাজ আজ মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিভক্ত। একদল পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতার অন্ধ অনুকরণে অভ্যস্ত হচ্ছে, যেখানে ধর্ম ও নৈতিকতা পুরোপুরি উপেক্ষিত। আর অন্যদল আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল ধর্মীয় আচার-সর্বস্ব তাত্ত্বিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ থাকছে। এই বিভক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা শিক্ষিতদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী ও বিদ্বেষপূর্ণ মানসিকতা তৈরি করছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া একদল বস্তুবাদী শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যেমন দুর্নীতি ও অনৈতিকতায় নিমজ্জিত হচ্ছে, তেমনি মাদ্রাসা শিক্ষিতরা আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার জ্ঞান থেকে বঞ্চিত থেকে কেবল ধর্মকেই জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করছেন।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল ঢেলে সাজাতে হবে। আংশিক সংস্কার নয়, বরং শিক্ষার ভিত্তি ও লক্ষ্য নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের প্রস্তাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় একমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখাটি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা: সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষার দেয়াল ভেঙে একটি একমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা প্রবর্তন করা হবে। যেখানে নীতি-নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটবে। এর লক্ষ্য হবে এমন নাগরিক তৈরি করা যারা একদিকে মো’মেন ও ধার্মিক হবে, অন্যদিকে হবে দেশপ্রেমিক, সৎ এবং ন্যায়পরায়ণ।
২. শিক্ষাবাণিজ্য বন্ধ করা: শিক্ষাকে কোনো বাণিজ্যিক পণ্য হতে দেওয়া হবে না। সবার জন্য সমান ও সাশ্রয়ী শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করবে এবং বিত্তবানদের এ খাতে দান করতে উদ্বুদ্ধ করা হবে।
৩. কর্মমুখী শিক্ষা: শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে আইসিটি, কারিগরি শিক্ষা, কৃষি ও পশুপালনের মতো আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এতে শিক্ষাজীবন শেষে কেউ বেকার থাকবে না এবং শিক্ষার্থীরা নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে।
৪. দ্বাদশবর্ষ শিক্ষা পরিকল্পনা: প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একটি অভিন্ন ও একমুখী পাঠ্যক্রম থাকবে। এতে শিক্ষার্থীরা জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি লাভ করবে এবং উচ্চশিক্ষায় তাদের পছন্দ অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন করতে পারবে।
৫. জাতীয় নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ: জাতীয় নিরাপত্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের সক্ষম করে তুলতে সাধারণ সামরিক প্রশিক্ষণ (ক্যাডেট) বাধ্যতামূলক করা হবে। এতে নাগরিকদের মধ্যে শৃঙ্খলা ও সাহসিকতা গড়ে উঠবে।
৬. সবার জন্য শিক্ষা: শিক্ষার কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা থাকবে না। শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম যেকোনো নাগরিক যেকোনো বয়সে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবেন।
৭. গবেষণা ও উদ্ভাবন: উচ্চশিক্ষায় গবেষণার সুযোগ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হবে। বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব তৈরির জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে, যাতে মেধা পাচার রোধ হয়।
৮. সঠিক ইতিহাস শিক্ষা: ঔপনিবেশিক শাসকদের তৈরি করা বিকৃত ইতিহাস বর্জন করে দেশ ও জাতির সংগ্রাম ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রকৃত ইতিহাস শেখানো হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে মানসিক দাসত্ব দূর হয়।
৯. পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষা: বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয় এবং প্রবীণরা অবহেলিত না হন।
১০. জীবনদক্ষতা প্রশিক্ষণ: প্রাথমিক চিকিৎসা, রান্না, ঘর গোছানো, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সচেতনতার মতো জীবনমুখী দক্ষতা প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শেখানো হবে যাতে তারা আত্মনির্ভরশীল হতে পারে।
১১. ভাষাগত দক্ষতা: মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্তত দুটি আন্তর্জাতিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন বাধ্যতামূলক করা হবে, যাতে আমাদের নাগরিকরা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে পারে।
১২. বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা: শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ ও আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি নিশ্চিত করা হবে, যাতে তারাও দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হতে পারে।
পরিশেষে, আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষা ও উন্নতির জন্য এই একমুখী ও নৈতিকতা সংবলিত কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষিত সমাজ যখন সৎ ও কর্মঠ হবে, তখনই রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধশালী ও নিরাপদ হবে।
