NEW জেলা অনুযায়ী সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬
হোম » জীবনব্যবস্থা » ইসলাম বনাম গণতন্ত্র (পর্ব-১)
পাশ্চাত্য সিস্টেমের আদি-অন্ত ও শোষণের ইতিহাস

ইসলাম বনাম গণতন্ত্র (পর্ব-১)

auth Deenul Haq ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৬ মিনিটে পড়ুন
feature

মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকে হাজার হাজার, এমনকি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ধর্ম দিয়েই মানুষের জীবন পরিচালিত হয়েছে। আমাদের এই ভারতবর্ষে সুপ্রাচীন কাল থেকে রাজাগণ শাস্ত্রীয় বিধানেই রাজ্য পরিচালনা করেছেন। ইতিহাসে ফেরাউন কিংবা নমরুদের মতো অনেক স্বৈরশাসকের কথা পাওয়া যায়, যারা শাসনের বৈধতা পেতে ধর্মের অপব্যবহার করতেন। ধর্মের বিকৃতি ও শাসকদের সীমালঙ্ঘন থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁরা পথভ্রষ্ট আলেম সমাজ ও স্বৈরাচারী শাসকদের হাত থেকে মানুষকে উদ্ধার করে পুনরায় ঐশী বিধান বা ধর্মের ভিত্তিতে জনজীবন সুসংগঠিত করেছেন। প্রত্যেক নবী-রাসূলের মূল ভূমিকা ছিল এমনই।

সেই ধারাবাহিকতায় আরবের ঘোর অন্ধকার বা আইয়্যামে জাহিলিয়াতের যুগে আল্লাহ পাঠালেন ‘রহমাতাল্লিল আলামিন’ সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে। তাঁকে দেওয়া হলো একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যাতে তিনি একে অন্য সকল মানবরচিত ব্যবস্থার ওপর বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর নবুয়তি জীবনে অক্লান্ত পরিশ্রম ও সংগ্রামের (জেহাদ ও কেতাল) মাধ্যমে জাজিরাতুল আরবে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করে ন্যায়, শান্তি ও সুশাসন কায়েম করেছিলেন। তাঁর ওফাতের পর সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর হুকুম মোতাবেক রাসূলের (সা.) দেখানো পথে এই সত্য জীবনব্যবস্থা পরিচালনা করে অর্ধ-পৃথিবীকে শান্তির ছায়াতলে নিয়ে এসেছিলেন।

গণতন্ত্রের আদি-অন্ত
আমাদের গুরুত্বের সাথে তলিয়ে দেখা প্রয়োজন যে, বর্তমানে প্রচলিত এই ‘গণতন্ত্র’ সিস্টেমটি আসলে কোথা থেকে এলো, এর উৎপত্তি কোথায় এবং কীভাবে এটি বিশ্বজুড়ে বিস্তার লাভ করল। এই পদ্ধতি কি আল্লাহ প্রদত্ত, নাকি মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান থেকে তৈরি করা কোনো ব্যবস্থা?

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সে প্রথম গণতন্ত্র নিয়ে একটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়েছিল। তবে তা ছিল অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী এবং একটি ছোট শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে এথেন্সের নাগরিকরা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত। সেই প্রাচীন উদাহরণকে সামনে রেখেই আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে। মূলত ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশরা এই উপমহাদেশে গণতন্ত্রের আমদানি করে। ব্রিটিশরা এখানে এসে প্রথমে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ (ভাগ করো এবং শাসন করো) পদ্ধতিতে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে জাতির ঐক্যে ফাটল ধরায়।

অতঃপর ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহসহ বিভিন্ন স্বাধীনতা আন্দোলনের মুখে যখন তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ল, তখন ভারতীয়দের দাবি আদায়ের ‘সিস্টেম’ শেখানোর নাম করে ব্রিটিশরা রাজনৈতিক দল গঠনের পরামর্শ দেয়। অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম নামক জনৈক ব্রিটিশ রাজনীতিবিদের উদ্যোগে ১৮৮৫ সালে ভারতের প্রথম রাজনৈতিক দল ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে মুসলিমদের স্বার্থ সংরক্ষণের দোহাই দিয়ে ১৯০৬ সালে ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সহযোগিতায় গঠিত হয় ‘মুসলিম লীগ’। এর মাধ্যমেই এই উপমহাদেশের জাতিটি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই প্রধান ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে চলে যায়, তখন তাদের সযত্নে গড়ে তোলা সেই অনুগত রাজনৈতিক দলগুলোর হাতেই রাষ্ট্র পরিচালনার ভার দিয়ে যায়। ভারতে কংগ্রেস এবং পাকিস্তানে মুসলিম লীগ সরকার গঠন করে। অর্থাৎ ব্রিটিশদের মাধ্যমে আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে এমন এক সিস্টেম পেলাম, যা জাতিকে শত শত দলে বিভক্ত করে ফেলে। এটি মহান আল্লাহ কিংবা রাসূলের (সা.) দেওয়া কোনো পদ্ধতি নয়।

অফ দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর মুসলিম লীগের প্রতি মানুষের আশা ছিল যে, তারা অন্তত এখানে ইসলামি জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু তারা তা করেনি; বরং ব্রিটিশদের দিয়ে যাওয়া সেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বিচারিক কাঠামোই চালু রাখল। ইসলামের পরিবর্তে তারা গণতন্ত্রের ওপর আস্থা রাখল। পরবর্তীতে নানামুখী বৈষম্যের শিকার হয়ে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশেও সেই ব্রিটিশ আমলের ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাই বলবৎ রাখা হলো। ফলস্বরূপ, গত কয়েক দশকের ইতিহাস কেবল হানাহানি, রক্তপাত, দলাদলি ও চরম অনৈক্যের ইতিহাস। গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর চিরকালীন দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষের জীবন আজ অতিষ্ঠ। জনগণের ক্ষমতায়নের কথা বলে তাদের যে চরম দুর্ভোগের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা কারো কাছে নেই। আমাদের হীনম্মন্যতা আমাদের অনেক ভুগিয়েছে, অনেক রক্ত ঝরিয়েছে; তবুও আমরা অদৃশ্য এক শিকলে গণতন্ত্রের দাসে পরিণত হয়ে আছি।

ভোটের মাধ্যমে কি যোগ্য নেতৃত্ব সম্ভব?
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটের মাধ্যমে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন করা অধিকাংশ সময় অসম্ভব। একজন অশিক্ষিত ব্যক্তির ভোট আর একজন পরম জ্ঞানীর ভোটের মূল্য এখানে সমান। গণতন্ত্রের মূল শর্তই হলো-জনগোষ্ঠীকে শতভাগ সুশিক্ষিত ও সচেতন হতে হবে। কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতন্ত্র অনেক ক্ষেত্রে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে রাজনীতি পেশায় পরিণত হয়েছে এবং দুর্নীতি ক্ষমতাসীনদের অঘোষিত অধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় চলে মনোনয়ন বাণিজ্য। ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করেন। ভোটারদের একাংশও নগদ অর্থের বিনিময়ে প্রার্থী নির্বাচন করেন। যেখানে শাসক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটার পর্যন্ত সবাই ব্যক্তিস্বার্থ ছাড়া কিছু বোঝেন না, সেখানে সৎ ও যোগ্য শাসক নির্বাচন কেবল অলীক কল্পনা মাত্র। এই সিস্টেমটাই এমন যে, ধূর্ত, প্রতারক ও দুর্নীতিবাজরাই নেতৃত্বের অগ্রভাগে চলে আসে। ফলে সজ্জন ও নীতিবান ব্যক্তিরা এই নোংরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকাই শ্রেয় মনে করেন।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য রিপাবলিক’ গ্রন্থে লিখেছেন- “গণতন্ত্র হলো মূর্খ এবং অযোগ্যদের শাসনব্যবস্থা।” এর কারণ হিসেবে তিনি মনে করতেন, সমাজের অধিকাংশ মানুষই অদূরদর্শী ও হুজুগে চলে, তাই তাদের ভোটে যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচিত হতে পারে না। প্লেটোর এই আক্ষেপের প্রমাণ এথেন্সবাসী দিয়েছিল তাঁরই গুরু মহামতি সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে। সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল সরাসরি ভোটের মাধ্যমে। ৫০০ জন বিচারকের মধ্যে সক্রেটিসের বিপক্ষে ২৮০টি ভোট পড়ায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। অথচ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ২৪১৫ বছর পর গ্রিসের একটি আদালত রায় দেয় যে, সক্রেটিস আসলে নির্দোষ ছিলেন।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা বনাম সত্য
অধিকাংশ মানুষ কোনো অন্যায়কে ‘ন্যায়’ বললেই তা ন্যায় হয়ে যায় না। সত্য কখনো সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। পৃথিবীর সকল মানুষও যদি বলে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, তবুও তা সত্য হবে না। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে অধিকাংশ লোকের কথা অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন; কারণ অধিকাংশ মানুষের সঠিক আকল বা বিবেকবুদ্ধি নেই। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনের কিছু আয়াত নিচে দেওয়া হলো:

১। অধিকাংশই বিশ্বাস করে না। (সুরা আল বাক্বারাহ, ১০০)
২। মানুষের মধ্যে অধিকাংশই নাফরমান। (সুরা আল মায়েদা, ৪৯)
৩। তাদের অধিকাংশেরই বিবেক বুদ্ধি নেই। (সুরা আল মায়েদাহ, ১০৩)
৪। কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না। (সুরা আল আনআম, ৩৭)
৫। কিন্তু তাদের অধিকাংশই মূর্খ। (সুরা আল আনআম, ১১১)
৬। আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না। (সুরা আল আ’রাফ, ১৭)

এমনকি আধুনিক গণতন্ত্রের ‘মডেল’ হিসেবে পরিচিত আমেরিকাতেও আমরা এই সিস্টেমের অসাড়তা দেখতে পাই। খোদ আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা ও সাজা থাকা সত্ত্বেও তিনি নির্বাচিত হতে পারেন। যে সিস্টেমে অমানবিক, সাম্রাজ্যবাদী ও বিতর্কিত ব্যক্তিরা শাসক হিসেবে নির্বাচিত হয়, তা কখনোই নির্ভুল ও সর্বজনীন হতে পারে না।

গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতাসমূহ:
১. সংখ্যাগরিষ্ঠের নামে সংখ্যালঘুর ওপর আধিপত্য: বহুদলীয় গণতন্ত্রে অনেক সময় একটি দল ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েও সরকার গঠন করে, যার ফলে ৬০ শতাংশ মানুষের মতামত উপেক্ষিত থেকে যায়।
২. হুজুগে জনতার শাসন (Mob Rule): জনগণ প্রায়শই আবেগ ও হুজুগ দ্বারা পরিচালিত হয়, ফলে গণতন্ত্র যেকোনো সময় মব রুলে পরিণত হতে পারে, যেখানে সংখ্যাগুরুরা সংখ্যালঘুদের অধিকার দমন করে।
৩. স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য (Short-Term Focus): নির্বাচিত সরকারগুলো পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভের চিন্তায় সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য স্বল্পমেয়াদী নীতি গ্রহণ করে, ফলে জাতির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৪. জনপ্রিয়তাই একমাত্র মাপকাঠি: রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা নয়, বরং জনপ্রিয়তাই এখানে বড় বিষয়। ফলে সেলিব্রিটি বা অদক্ষ ব্যক্তিরা কেবল জনপ্রিয়তার জোরে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চলে আসেন।
৫. জটিল আমলাতন্ত্র: সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির হওয়ায় জরুরি জাতীয় সমস্যা সমাধানে বিলম্ব ঘটে।
৬. অপপ্রচার ও ইঞ্জিনিয়ারিং: ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ব্যবহার করে জনমতকে ভুল পথে পরিচালিত করা সম্ভব হয়।

পরিশেষে, গণতন্ত্র বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রচলিত থাকলেও এর পদ্ধতিগত ত্রুটি ও নৈতিক ব্যর্থতা একে ক্রমশ অজনপ্রিয় করে তুলছে। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন এমন এক ব্যবস্থা, যা কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ওপর নয় বরং স্রষ্টা প্রদত্ত শাশ্বত ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

টপিক: ইতিহাসগণতন্ত্রদলাদলিপশ্চিমা সভ্যতাব্রিটিশ শাসন
লেখক পরিচিতি
Author

Deenul Haq

সম্পাদক
কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান প্রচার এবং দ্বীনি দাওয়াতের একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। আমাদের সাথে থাকুন আপনার ঈমানি যাত্রায়।
×
QR কোড স্ক্যান করুন