গণতন্ত্র স্পষ্টত শিরক
আমরা সকলেই জানি যে, ‘শিরক’ একটি আরবি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ শরিক করা, অংশীদার মনে করা বা সমকক্ষ ভাবা। ইসলামে শিরক এমন এক জঘন্য অপরাধ যার কোনো ক্ষমা নেই। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে।” (সুরা নিসা: ৪৮)।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রসুলাল্লাহ (সা.)’-এই কালেমা পাঠের মাধ্যমে একজন মানুষ অঙ্গীকার করে যে, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনসহ জীবনের সর্বাঙ্গণে সে আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কারো হুকুম মানবে না। এই শর্ত যে প্রত্যাখ্যান করে সে কাফের, আর যে মুখে স্বীকার করেও অন্তরে অবিশ্বাস করে সে মুনাফিক। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর কিছু হুকুম মানে আর কিছু মানে না, অথবা আল্লাহর হুকুমের পাশাপাশি অন্য কারো তৈরি বিধান গ্রহণ করে, সে হলো ‘মোশরেক’। আল্লাহ বলেন, “তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করো এবং কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান করো? সুতরাং তোমাদের যারা এরূপ করে তাহাদের প্রতিফল পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা, অপমান এবং কেয়ামতের দিন কঠিনতম শাস্তি।” (সুরা বাকারা: ৮৫)।
গণতন্ত্রের মূলনীতি হলো-‘জনগণকে শাসন করবে জনগণ’। অন্যদিকে ইসলামের মূলনীতি হলো-‘জনগণকে শাসন করবে একমাত্র আল্লাহ’। গণতন্ত্রে আইন প্রণয়ন করেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতারা, আর ইসলামে আইন ও বিধানদাতা স্বয়ং আল্লাহ। যারা মুখে কালেমা পড়ে নিজেদের মুসলিম দাবি করে, অথচ আল্লাহর আইন প্রত্যাখ্যান করে গণতান্ত্রিক সিস্টেমে মানুষের তৈরি আইন কানুন মেনে নেয়, তারা স্পষ্টভাবেই আল্লাহকে অংশী বা শিরক করে। এই ব্যবস্থায় জীবনের বৃহত্তর ক্ষেত্রগুলোতে আল্লাহর হুকুম মানার কোনো সুযোগ থাকে না। যারা আল্লাহর বিধান না মেনে অধিকাংশ জনগণের তৈরি বিধানকেই ধ্রুব সত্য মনে করে, তাদের শপথবাক্য মূলত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ নয় বরং ‘লা ইলাহা ইল্লান্নাস’ (মানুষ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা নেই)।
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা: একটি ভুল প্রক্রিয়া
শত শত বছর ধরে ইসলামকে কেবল ‘ব্যক্তিগত ধর্ম’ হিসেবে চর্চা করার ফলে ইসলামের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি আজ বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে। বর্তমানে পশ্চিমা প্রভুদের রেখে যাওয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের মডেলে ইসলামকে খাপ খাওয়াতে একদল পণ্ডিত আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তাঁরা ‘গণতান্ত্রিক ইসলামি দল’ নামক এক আজব ধারণার জন্ম দিয়েছেন। তাঁদের দাবি-রাসূল (সা.) সারাজীবন রাজনীতি করেছেন, তাই নির্বাচনই হলো এ যুগের জেহাদ এবং ব্যালট পেপার হলো জান্নাতের টিকিট! তাঁরা ইসলামের ‘শুরা’ ব্যবস্থাকে বর্তমানের গণতন্ত্রের সাথে তুলনা করে একে বৈধতা দিতে চান।
প্রশ্ন হলো-রাসূল (সা.) কি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন? না। তিনি তৎকালীন আরবে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বিশ্বাসভাজন হওয়া সত্ত্বেও নেতা হওয়ার কোনো শর্টকাট পদ্ধতি বেছে নেননি। আবু জাহেলরা তাঁকে আরবের বাদশাহ হওয়ার প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি কৌশলের নামে কোনো ধোঁকাবাজির আশ্রয় না নিয়ে মানুষকে তওহীদের দিকে ডেকেছেন এবং একটি সুসংগঠিত ‘উম্মাহ’ বা জাতি তৈরি করেছেন। নবী-রাসূলগণ কেউই প্রচলিত গণতান্ত্রিক সিস্টেমে নির্বাচিত শাসক ছিলেন না।
ইসলামে নেতা নির্বাচন পদ্ধতি
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর আবু বকর (রা.) নিজে খলিফা হওয়ার জন্য কোনো ক্যাম্পেইন করেননি বা ভোট প্রার্থনা করেননি। তিনি কেবল চেয়েছিলেন নেতৃত্ব যেন মুহাজিরদের হাতে থাকে, কারণ তাঁরা রাসূলের আদর্শ সবচেয়ে বেশি ধারণ করতেন। ওমর (রা.) খলিফা হওয়ার প্রস্তাব পাওয়ার পর তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান এবং আবু বকরকে (রা.) নিজের চেয়ে যোগ্য মনে করে তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। ইসলামের সেই স্বর্ণযুগে যোগ্যতম ব্যক্তিটিও নেতা হতে ভয় পেতেন, আর বর্তমান গণতন্ত্রে অযোগ্য ব্যক্তিরাই নেতা হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।
আবু বকর (রা.) যখন ওমরকে (রা.) খলিফা হিসেবে মনোনীত করার চিন্তা করেন, তখন ওমর (রা.) নিজেই আপত্তি জানিয়েছিলেন। এমনকি তালহা (রা.) ওমরের কঠোর স্বভাবের কারণে তাঁর নিযুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। জনগণের সরাসরি ভোট হলে হয়তো রগচটা ওমর (রা.) নির্বাচিত হতেন না, কিন্তু আবু বকর (রা.) জানতেন ওমরের যোগ্যতার কথা। তাই তিনি সঠিক মানুষটিকেই নির্বাচিত করেছিলেন। নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলাম বলে-নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাই হলো নেতৃত্ব দানে অযোগ্যতার প্রমাণ। দার্শনিক প্লেটোও বলেছেন, “শাসনে অনিচ্ছুক শাসকই শ্রেষ্ঠ শাসক।”
ভোটের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা কি সম্ভব?
বর্তমানে ইসলামি দলগুলো পশ্চিমা ডেমোক্রেসি ব্যবহার করে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এটি অন্যের জমিতে নিজের বাড়ি বানানোর মতো একটি বোকামি। গত দুই শতাব্দীতে এই পদ্ধতিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রতিটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আলজেরিয়ায় ইসলামি সালভেশন ফ্রন্ট ৮০-৯০% সমর্থন পেয়েও সফল হতে পারেনি। তিউনিসিয়ায় আন্নাহাদা এবং মিশরে ইখওয়ানুল মুসলেমিন বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেও সামরিক অভ্যুত্থান ও নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে বিলীন হয়ে গেছে।
আল্লাহর রাসূল (সা.) যে প্রক্রিয়ায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেই পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে আল্লাহর দীন বিজয় লাভ করবে না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বড়জোর সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ যুক্ত করা যায়, কিন্তু আল্লাহর খোদায়ী শাসন জারি করা অসম্ভব। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া এই মহান বিপ্লব কখনোই সফল হবে না।
ইসলামি গণতন্ত্রের স্বরূপ
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিভিন্ন আদর্শের ওপর ভিত্তি করে বহুদলীয় রাজনীতি করার কোনো সুযোগ নেই। রাসূল (সা.) মদিনা সনদের মাধ্যমে সকল ধর্ম ও গোত্রকে এক জাতিভুক্ত করেছিলেন। ইসলামের লক্ষ্য হলো-সকল বিভেদের প্রাচীর ভেঙে মানুষকে এক উম্মাহ হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করা। ইসলামে জাতির ঐক্য বিনষ্টকারী রাজনৈতিক দলাদলি সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ চান মুমিনরা যেন সীসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকে। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন যারা সীসা গলানো প্রাচীরের মত সারিবদ্ধভাবে তাঁর পথে সংগ্রাম করে।” (সুরা সফ: ৪)। তিনি আরও বলেন, “তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (সুরা ইমরান: ১০৩)।
তওহীদভিত্তিক ঐক্য ও নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে রাষ্ট্রের উন্নয়নের স্বার্থে সামাজিক বা সাংস্কৃতিক সংগঠন থাকতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক দলাদলি কেবল ধ্বংসই বয়ে আনে। সুতরাং, বর্তমানের ‘গণতান্ত্রিক ইসলাম’ মূলত একটি ভ্রান্ত ধারণা; প্রকৃত মুক্তি কেবল রাসূলের দেখানো সেই অটুট ঐক্য ও তওহীদের পথেই নিহিত।

