মানুষের জীবনের সর্বাঙ্গণে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ উঠলেই মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ভীত ও চিন্তিত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে যারা জাতীয় জীবনে আল্লাহর হুকুম-বিধানের প্রতিফলন চান না, তারা দীন প্রতিষ্ঠার যেকোনো প্রচেষ্টাকেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কাতারে ফেলে সাধারণ মানুষের কাছে হেয় করার অপচেষ্টা চালান। ইসলামে জেহাদ ও কেতালের যে তাৎপর্য রয়েছে, তাকেই তারা সন্ত্রাসের সমার্থক হিসেবে প্রচার করতে চান। অথচ জেহাদ ও সন্ত্রাস সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরীতমুখী দুটি বিষয়।
জেহাদ ও কেতালের সংজ্ঞা:
‘জেহাদ’ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে করা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা বা নিরন্তর সংগ্রাম। আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে মানুষকে মুখে বলা, লেখালেখি করা, বক্তৃতা দেওয়া বা যৌক্তিকভাবে সত্যকে বুঝিয়ে বলা-এ সবই জেহাদের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে ‘কেতাল’ একটি ভিন্ন শব্দ, যার অর্থ হলো সশস্ত্র যুদ্ধ। জেহাদ ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠী যে কেউ করতে পারে, কিন্তু কেতাল বা সশস্ত্র যুদ্ধ কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই সম্ভব।
দীন প্রতিষ্ঠার দোহাই দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, তবে তা হবে একটি মারাত্মক ভুল পদক্ষেপ। তাদের দায়িত্ব হলো মানুষকে যুক্তি দিয়ে, কোরআন-হাদিসের দলিল পেশ করে এ কথা বোঝানো যে-শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ হলো স্রষ্টার দেওয়া জীবনবিধান অনুসরণ করা। এটি জোর-জবরদস্তির বিষয় নয়; কারণ শক্তি প্রয়োগ করে মানুষের অন্তরে কোনো বিশ্বাস গেঁথে দেওয়া অসম্ভব।
হেযবুত তওহীদের নীতি ও রাসুল (সা.)-এর পদ্ধতি:
হেযবুত তওহীদ ঠিক এই কাজটিই করে যাচ্ছে-মানুষকে যুক্তি ও সত্য দিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দিকে আহ্বান জানাচ্ছে। বিকৃত ইসলামের কুফল থেকে সমাজকে রক্ষা করার একমাত্র পথ হলো ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরা। এই সত্য প্রচারের ক্ষেত্রে হেযবুত তওহীদ মহানবী (সা.)-এর মক্কী জীবনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। রাসুল (সা.) মক্কী জীবনের তেরটি বছর কেবল মানুষের কাছে ‘বালাগ’ বা আহ্বান পৌঁছে দিয়েছেন। সেই সময়ে তিনি ও তাঁর সাথীরা অবর্ণনীয় নির্যাতন, মিথ্যা অপবাদ ও লাঞ্ছনা সহ্য করেছেন, কিন্তু কখনোই সশস্ত্র প্রতিঘাত করেননি। হেযবুত তওহীদের সদস্যরাও গত ৩০ বছর ধরে তওহীদের ডাক দিয়ে যাচ্ছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তারা চরমভাবে নির্যাতিত হয়েছেন, অপবাদ সয়েছেন, এমনকি সংগঠনের পাঁচজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন (শহীদ হয়েছেন)।
রাষ্ট্র গঠন ও কেতালের প্রয়োজনীয়তা:
রাসুল (সা.)-এর মক্কী জীবন ছিল ধৈর্য ও আহ্বানের কাল। এরপর মদিনাবাসী যখন তওহীদের ডাক গ্রহণ করল এবং সেখানে রাষ্ট্র গঠিত হলো, তখন পরিস্থিতির প্রয়োজনে নীতি পরিবর্তিত হলো। একটি রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় নীতিতে চলতে পারে না। মদিনার রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাসুল (সা.)-কে তখন বিচারকের ভূমিকা পালন করতে হয়েছে, অপরাধীর দণ্ড দিতে হয়েছে এবং প্রশাসনিক কাঠামো (মসজিদ) গড়ে তুলতে হয়েছে। রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তখন সেনাবাহিনী, অস্ত্র ও যুদ্ধের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন দেখা দেয়। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাসুল (সা.) তখন প্রয়োজনীয় সামরিক পদক্ষেপ নেন এবং অপরাপর রাষ্ট্রনায়কদের মতোই দেশ ও জাতির নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুদ্ধ বা সন্ধি করেন।
সুতরাং, রসুলাল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুযায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পর্যায়ে সশস্ত্র যুদ্ধের (কেতাল) কোনো স্থান নেই। এই পর্যায়ে কাজ কেবল সত্যের আহ্বান বা বালাগ দেওয়া। অন্যদিকে, সশস্ত্র যুদ্ধ কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হতে পারে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের এই সশস্ত্র বাহিনীকে যদি কেউ বেআইনি বলে, তবে পৃথিবীর সব দেশের সামরিক বাহিনীই অবৈধ হয়ে পড়বে। কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত জেহাদ ও কেতালের বিধানগুলো মূলত রাষ্ট্রকেন্দ্রিক। বর্তমানে একদল বিভ্রান্ত মানুষ ইসলামের নামে বিভিন্ন ‘ফতোয়া’ দিয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে এবং এই সন্ত্রাসকে রসুলাল্লাহর সামরিক অভিযানের সঙ্গে তুলনা করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। অথচ এই স্বঘোষিত ‘মুফতি’ বা ‘চাপাতিধারী’রা না জাতি কর্তৃক মনোনীত বিচারক, না তারা রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্বশীল। যারা মাদ্রাসার কয়েকটি মাসলা-মাসায়েল শিখে নিজেদের ‘কাজী’ বা রাষ্ট্রশক্তির সমান্তরাল মনে করছে, তারা মূলত ইসলামের নামে সন্ত্রাসবাদকেই উসকে দিচ্ছে।
আমরা কোরআন-হাদিসের দলিল ও যুক্তির মাধ্যমে মানুষকে বোঝাতে চাই যে-অশান্ত এই পৃথিবীতে তওহীদ ভিত্তিক জীবনব্যবস্থা ছাড়া বিকল্প কোনো মুক্তির পথ নেই। এখানে বলপ্রয়োগের কোনো স্থান নেই, কারণ জবরদস্তি করে কাউকে বিশ্বাস করানো যায় না। মানুষ যদি এই আহ্বান গ্রহণ করে, তবে তারা ইহকাল ও পরকালে শান্তি ও গৌরবের অধিকারী হবে। আর যদি তারা মানুষের সার্বভৌমত্ব আঁকড়ে ধরে থাকে, তবে তার অনিবার্য পরিণতিও তাদের ভোগ করতে হবে। প্রচলিত ব্যবস্থার ধারক-বাহকরা যতই বিরোধিতা করুক না কেন, আল্লাহর সত্য দীনকে সমুন্নত করার এই আদর্শিক লড়াই আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে।

