NEW জেলা অনুযায়ী সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬
হোম » তওহীদ » তওহীদভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইন-শৃঙ...

তওহীদভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রূপরেখা

auth Deenul Haq ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৫ মিনিটে পড়ুন
feature

আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধান যখন মানবসমাজে প্রকৃতরূপে কার্যকর হয়, তখন তার ফলাফল কেমন হয়-তা বুঝতে হলে আমাদের ইতিহাসের পাতায় চোখ ফেরাতে হবে। আধুনিক পাঠকদের জন্য এটি কল্পনা করা কঠিন হতে পারে যে, এমন একটি সমাজ সম্ভব যেখানে মানুষের ঘরে ঘরে অস্ত্র আছে অথচ কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই, আবার সেখানে কোনো প্রথাগত পুলিশ বাহিনী বা বিশাল কারাগারও নেই। অথচ সেই সমাজে অপরাধের হার প্রায় শূন্যের কোঠায়।

এটি কোনো কাল্পনিক উপকথা নয়, বরং মহানবী (সা.)-এর হাতে গড়া সেই আদর্শ সমাজের বাস্তব চিত্র। দীর্ঘ সময় ধরে সেই সমাজে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশের কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়নি। মানুষ মানবরচিত শাসনব্যবস্থা বর্জন করে স্রষ্টার দেওয়া ‘তওহীদভিত্তিক’ জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল বলেই এই অকল্পনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছিল। তখন সমাজের প্রতিটি মানুষ নিজেই ছিল একেকজন অতন্দ্র প্রহরী। অন্যায় দেখলে সবাই মিলে তার প্রতিবাদ করত। সামাজিক মূল্যবোধ এতটাই প্রখর ছিল যে, অপরাধী সমাজে আশ্রয় পেত না, বরং ধিকৃত হতো। এই সামাজিক চেতনার পাশাপাশি ছিল খোদায়ী আইনের কঠোর শাসন। স্রষ্টার কাছে জবাবদিহিতার ভয় মানুষের অন্তরে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, কেউ অপরাধ করলে নিজেই আদালতে এসে নিজের শাস্তি দাবি করত।

পবিত্র কোরআনে এই মহত্তম আদর্শের ইঙ্গিত দিয়ে বলা হয়েছে- “তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজে বাধা দেবে।” (সুরা ইমরান: ১১০)।

ঐতিহাসিক বিবর্তন ও সোনালী যুগের নিরাপত্তা

খলিফা ওমর (রা.)-এর আমলে রাষ্ট্রের আয়তন বিশালভাবে বৃদ্ধি পেলে প্রশাসনিক প্রয়োজনে ‘আশ-শুরতা’ নামে নিয়মিত পুলিশ বাহিনী গঠিত হয়। নাগরিকদের নিরাপত্তা, অপরাধ দমন, আদালতের রায় কার্যকর এবং রাষ্ট্রীয় স্থাপনা রক্ষা ছিল তাদের প্রধান দায়িত্ব। মধ্যযুগের সুলতানি আমলে এই পুলিশি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও জবাবদিহিতাপূর্ণ হয়ে ওঠে। তৎকালীন একটি তাৎপর্যপূর্ণ নিয়ম ছিল-চুরি বা ডাকাতির শিকার ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা বা প্রাদেশিক শাসকের। তারা যদি অপরাধীকে ধরতে ব্যর্থ হতো, তবে তাদের নিজেদের তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্তকে ক্ষতিপূরণ দিতে হতো।

শেরশাহ সুরির আমল ছিল আইন-শৃঙ্খলার এক অনন্য উদাহরণ। সে সময় সোনারগাঁও থেকে সিন্ধু পর্যন্ত দীর্ঘ দুই হাজার মাইল পথে বণিক ও সাধারণ মানুষ তাদের মূল্যবান মালামাল রাজপথে রেখে নির্ভয়ে ঘুমিয়ে থাকতে পারত। ইংরেজ ঐতিহাসিক হেনরি বেভারেজ ও অন্যান্য ইতিহাসবিদদের মতে, তখন একাকী কোনো নারী স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে শত শত মাইল পাড়ি দিলেও বন্য পশু ছাড়া আর কোনো ভয় তার মনে জাগত না। এটিই ছিল সেই পরিস্থিতি, যা রাসূল (সা.) তাঁর নবুয়তি জীবনে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।

বর্তমান সংকট ও পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি

আজকের চিত্র ঠিক তার উল্টো। আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত ও বিশাল পুলিশ বাহিনী থাকা সত্ত্বেও সমাজে শান্তি সুদূরপরাহত। বর্তমান সমাজে পুলিশের অবস্থান নানা কারণে বিতর্কিত ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী। প্রবাদ তৈরি হয়েছে- ‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা।’ রক্ষক হয়েও পুলিশের একটি অংশ আজ ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি, ঘুষ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয়গুলো জনগণের আস্থা শূন্যের কোঠায় নিয়ে গেছে। সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ যোগ দিলেও প্রচলিত ‘মানবরচিত সিস্টেম’-এর চাপে অনেক সময় তারা আর সৎ থাকতে পারেন না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, দুর্নীতির তালিকায় পুলিশের শীর্ষস্থান দখল এই বাহিনীর নৈতিক অবক্ষয়ের একটি নগ্ন দলিল।

ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও সিস্টেমের ত্রুটি

এই হতাশাজনক পরিস্থিতির মূলে রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা। ১৭৯২ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস যে পুলিশ প্রবিধান প্রবর্তন করেন, সেখানে দারোগাদের লুণ্ঠিত মাল উদ্ধারের ওপর ১০% কমিশন দেওয়ার নিয়ম ছিল। এই আর্থিক লোভের নীতি থেকেই ঘুষের সংস্কৃতির সূচনা হয়। ১৮৬১ সালের ব্রিটিশ পুলিশ আইনটি মূলত তৈরি করা হয়েছিল স্বাধীনতাকামী আন্দোলনকারীদের দমন করার জন্য। সেই দমনমূলক চরিত্রের উত্তরাধিকার আজও আধুনিক পুলিশ বাহিনী বয়ে বেড়াচ্ছে। ফলে পুলিশ ও জনগণের সম্পর্ক বন্ধুত্বের না হয়ে বৈরিতার রূপ নিয়েছে।

প্রস্তাবিত সংস্কার ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপসমূহ

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রকৃত জনবান্ধব ও কার্যকর সংস্থায় রূপান্তর করতে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:

১. জনগণের সেবার মূলনীতি: পুলিশের প্রধান কাজ হবে ‘সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা প্রদান’। অপরাধীকে শাস্তি দেওয়াই শেষ কথা নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও বিপদে পাশে দাঁড়ানোই হবে বাহিনীর মূল দর্শন।
২. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তি: পুলিশ হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। তদন্ত প্রতিবেদনে মিথ্যা তথ্য প্রদান বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কাউকে হয়রানি করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর দণ্ডের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৩. পেশাদারিত্ব ও ধর্মীয় স্বাধীনতা: পুলিশ কেবল ফৌজদারি অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কে কতটা ধর্ম পালন করল বা না করল-তাতে পুলিশের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না। পেশাদারিত্বই হবে একমাত্র পরিচয়।
৪. সন্দেহপ্রসূত হয়রানি বন্ধ: কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী (সুরা হুজরাত: ১২) কেবল অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেপ্তার বা নির্যাতন করা যাবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া রিমান্ডের নামে নির্যাতন মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
৫. নারী পুলিশের ক্ষমতায়ন: নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে নারী পুলিশের সংখ্যা বাড়াতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা সহজে আইনি সহায়তা পায়।
৬. স্বচ্ছতা ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা: বাহিনীর দুর্নীতি রোধে নিয়মিত অভ্যন্তরীণ অডিট ও তদন্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে কোনো কর্মকর্তা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে না থাকতে পারেন।
৭. নৈতিক ও আধুনিক প্রশিক্ষণ: সদস্যদের কেবল পেশাগত প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, বরং আধ্যাত্মিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে যেন তারা স্রষ্টার কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের প্রতি মানবিক আচরণের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মর্যাদা তখনই পুনরুদ্ধার হবে, যখন সমাজ পুনরায় স্রষ্টার দেওয়া চিরন্তন আকিদাহ ও নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। মানবরচিত বৈষম্যমূলক আইনের পরিবর্তে তওহীদভিত্তিক ইনসাফ কায়েম হলে পুলিশ বাহিনীর আর জুলুমকারী হওয়ার প্রয়োজন পড়বে না, বরং তারা হবে মজলুমের প্রকৃত বন্ধু ও সমাজের নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী।

টপিক: ইনসাফতওহীদনিরাপত্তাপুলিশ বাহিনীমানবাধিকার
লেখক পরিচিতি
Author

Deenul Haq

সম্পাদক
কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান প্রচার এবং দ্বীনি দাওয়াতের একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। আমাদের সাথে থাকুন আপনার ঈমানি যাত্রায়।
×
QR কোড স্ক্যান করুন