NEW জেলা অনুযায়ী সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬
হোম » রাষ্ট্রব্যবস্থা » মোরাল পুলিশিং ও মব কালচার: ইসলামের দৃ...
ধর্মের নামে মব জাস্টিস

মোরাল পুলিশিং ও মব কালচার: ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

auth Deenul Haq ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৫ মিনিটে পড়ুন
feature

‘মোরাল পুলিশিং’ বর্তমান সময়ের একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত শব্দ। সাম্প্রতিক সময়ে ‘মব কালচার’ বা গণপিটুনির মতো এটিও সমাজে এক ধরণের আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছে। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আমরা সামাজিক মূল্যবোধের এক নেতিবাচক রূপান্তর লক্ষ করছি। ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতা হ্রাস পাওয়ায় মব জাস্টিস ও মোরাল পুলিশিংয়ের মতো ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে রমজান মাস বা বিশেষ ধর্মীয় দিবসগুলোকে কেন্দ্র করে কিছু অতি-উৎসাহী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা সাধারণ মানুষকে হেনস্তা করার চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

মোরাল পুলিশিং কী?
সহজ কথায়, নিজের নীতি-নৈতিকতার ধারণা বা ধর্মীয় নিয়ম-নীতি অন্য কোনো ব্যক্তির ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাকেই ‘মোরাল পুলিশিং’ বলা হয়। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় আইন বহির্ভূতভাবে নিজস্ব চিন্তাভাবনা বা ধর্মীয় অনুশাসন পালনে অন্যকে বাধ্য করতে জবরদস্তিমূলক আচরণ বা শারীরিক-মানসিক চাপ প্রয়োগ করেন, তখনই তা মোরাল পুলিশিং হিসেবে গণ্য হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ধর্মীয় আবেগ থেকে করা হলেও ইসলাম ধর্মে জবরদস্তি বা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আধুনিক উদ্ভব
ইসলামের প্রাথমিক যুগে বা খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে বর্তমানের এই ‘মোরাল পুলিশিং’ বা বিচারহীন মব কালচারের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তখন মানুষ অপরাধ করলে অনুতপ্ত হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হতো অথবা সচেতন জনগণ অপরাধীকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় সোপর্দ করত। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ১৯৭৬ সালে সৌদি আরবে ‘সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ’ করার রাষ্ট্রীয় বিভাগ চালুর মাধ্যমে এর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে আফগানিস্তানে এবং ২০০৫ সালে ইরানে ‘গাশত-ই-এরশাদ’ বা নৈতিকতা রক্ষাকারী পুলিশ গঠিত হয়। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে এটি সরকারিভাবে পরিচালিত, কিন্তু বাংলাদেশসহ অনেক দেশে একশ্রেণির উগ্রবাদী মানুষ স্ব-উদ্যোগে আইন হাতে তুলে নিয়ে এই কাজ করছে, যা সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।

বিশ্বজুড়ে মোরাল পুলিশিংয়ের ভয়ংকর চিত্র
ইরানে ২০২২ সালে হিজাব সঠিকভাবে না পরার অভিযোগে মোরাল পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনি নামক এক তরুণীর মৃত্যু বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল। এর আগেও সেখানে জাহরা বানি ইয়াকুবের মতো অনেক নারী মোরাল পুলিশের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন। আফগানিস্তানেও তালেবান নীতি পুলিশের দ্বারা নারীদের শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও চলাফেরায় কঠোর বিধি-নিষেধ এবং অবাধ্যতার জন্য প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনা ঘটছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ভ্যালেন্টাইন ডে বা বিশেষ উৎসবে ‘সাংস্কৃতিক নৈতিকতা’ রক্ষার নামে সাধারণ মানুষকে হেনস্তা করার নজির রয়েছে।

বাংলাদেশে মোরাল পুলিশিংয়ের প্রভাব
বাংলাদেশেও সম্প্রতি এর প্রকোপ লক্ষ করা গেছে। রমজান মাসে অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে কেউ দিনের বেলা রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে তাকে মারধর বা কান ধরে ওঠবস করানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। লক্ষ্মীপুরে এক বৃদ্ধকে রেস্টুরেন্টে খাওয়ার অপরাধে অপদস্থ করা হয়, অথচ তিনি চিকিৎসকের পরামর্শে রোজা রাখা থেকে বিরত ছিলেন। এছাড়া মাজার, খানকাহ বা ভিন্ন মতাদর্শীদের ঘরবাড়িতে হামলার পেছনেও এই মোরাল পুলিশিং মানসিকতা কাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের উসকানিতে বা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে এসব নীতি-পুলিশি তৎপরতা চালানো হচ্ছে। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি: নেই কোনো জবরদস্তি
পবিত্র কোরআনের অমোঘ ঘোষণা— “লা ইকরাহা ফিদ্দীন” অর্থাৎ দীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই (সুরা বাকারা: ২৫৬)। ইসলাম মানুষকে ঈমানি চেতনা ও ভালোবাসার মাধ্যমে আল্লাহর পথে ডাকতে বলেছে, শক্তি প্রয়োগ করে নয়। ব্যক্তিগত ইবাদত বা ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে বাধ্য করার অধিকার স্বয়ং আল্লাহ তাঁর রাসূলকেও (সা.) দেননি। আল্লাহ বলেন, “হে মুহাম্মদ, আমি তোমাকে মানুষের নিয়ন্ত্রণকর্তা করে পাঠাইনি। আপনার একমাত্র কাজ আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া” (সুরা শুরা: ৪৮)। সুরা রা’দ-এর ৪০ নম্বর আয়াতেও একই কথা বলা হয়েছে।

রাসূল (সা.)-এর সময় এক ব্যক্তি মদ্যপ অবস্থায় ইবনে উমরের (রা.) বাড়িতে আশ্রয় নিলে সাহাবীরা তাকে সরাসরি মারধর বা অপদস্থ না করে বরং আদালতের কথা ভেবেছিলেন। রাসূল (সা.) এমনকি অপরাধীর প্রতিও মানবিক হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। অথচ আজ একশ্রেণির মানুষ কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে হেনস্তা করছে, যা সম্পূর্ণ ইসলাম পরিপন্থী ও বেআইনি।

গণপিটুনি: একটি বিধ্বংসী সংস্কৃতি
মোরাল পুলিশিংয়ের চূড়ান্ত রূপ হলো গণপিটুনি বা মব লিঞ্চিং। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএস-এর তথ্যমতে, গত সাত মাসে দেশে অন্তত ১১৪টি গণপিটুনির ঘটনায় ১১৯ জন নিহত হয়েছেন। গত ১০ বছরে এই সংখ্যা প্রায় ৭৯২ জন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, গুজব এবং নিষ্ঠুর মনস্তত্ত্ব থেকে মানুষ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। সন্দেহবশত নির্দোষ মানুষকে পিটিয়ে মারা বা পুড়িয়ে মারা ইসলামের দৃষ্টিতে কবিরা গুনাহ। আল্লাহ বলেন, “যে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার প্রতিদান জাহান্নাম, সেখানে সে চিরস্থায়ী হবে” (সুরা নিসা: ৯৩)।

কর্তৃপক্ষ বনাম ব্যক্তি
ইসলামে অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ও নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের। কোনো সাধারণ নাগরিক বা উগ্র জনতা (তৌহিদী জনতা বা অন্য কোনো ব্যানারে) কাউকে শাস্তি দেওয়ার বা বিচার করার অধিকার রাখে না। রাসূল (সা.) মদিনায় যখন রাষ্ট্র কায়েম করেছিলেন, তখন অপরাধের বিচার হতো রাষ্ট্রীয় আইনে, কোনো ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছায় নয়। মোরাল পুলিশিংয়ের নামে মানুষকে পেটানো বা প্রকাশ্যে হেনস্তা করা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের আইনকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো।

বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের অভিমত
কোনো কাজ অনৈতিক মনে হলে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বড়জোর উপদেশ দেওয়া যেতে পারে। যদি কেউ রাষ্ট্রীয় আইনে অপরাধ করে থাকে, তবে তাকে ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ করা নাগরিক দায়িত্ব। কিন্তু ‘ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট’ ব্যবহার করে কাউকে শারীরিকভাবে আক্রমণ বা অপদস্থ করা কোনো ধর্মই সমর্থন করে না। এতে হিতে বিপরীত হয় এবং ধর্মের প্রতি মানুষের ঘৃণা তৈরি হয়।

সভ্য জাতি হিসেবে আমাদের বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। ধর্মের নামে উগ্রবাদ ও মোরাল পুলিশিং বন্ধ করা না গেলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ইসলাম শান্তির ধর্ম; এখানে অনুপ্রাণিত করার সুযোগ আছে, কিন্তু জবরদস্তির কোনো স্থান নেই। সচেতন নাগরিক ও রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই মব কালচার ও মোরাল পুলিশিংয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, যাতে কোনো নির্দোষ মানুষ হেনস্তার শিকার না হয়।

টপিক: ইসলামজবরদস্তিমব জাস্টিসমোরাল পুলিশিংসহিষ্ণুতা
লেখক পরিচিতি
Author

Deenul Haq

সম্পাদক
কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান প্রচার এবং দ্বীনি দাওয়াতের একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। আমাদের সাথে থাকুন আপনার ঈমানি যাত্রায়।
×
QR কোড স্ক্যান করুন