NEW জেলা অনুযায়ী সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬
হোম » সংগ্রাম » রাসূল (সা.)-এর হাতে গড়া সামরিক জাতির ...
শান্তিকামী এক দুর্ধর্ষ উম্মাহর উত্থান ও বিজয়গাথা

রাসূল (সা.)-এর হাতে গড়া সামরিক জাতির ইতিহাস

auth Deenul Haq ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৫ মিনিটে পড়ুন
feature

ইসলামের ইতিহাস পাঠকদের কাছে এটি সুবিদিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন একজন সফল সেনাপতি ও রাষ্ট্রনায়ক। মদিনার জীবনে মাত্র ১০ বছরে তিনি ছোট-বড় প্রায় ৭৮টি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে আরব উপদ্বীপের প্রায় সাড়ে ১২ লক্ষ বর্গমাইল এলাকা বিজিত হয়েছিল। তিনি যে জাতিটি তৈরি করেছিলেন, তা ছিল এক নির্ভীক ও দুর্ধর্ষ যোদ্ধা জাতি। তৎকালীন দুই বিশ্বশক্তি রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যকে তাঁরা তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং মাত্র ৬০-৭০ বছরের ব্যবধানে পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি ভূখণ্ডে ইসলামের বিজয় নিশান উড়িয়েছিলেন।

সেই জাতির সদস্যদের যখন জিজ্ঞেস করা হতো তোমরা কী চাও? তাঁরা বলতেন ক্ষুধা নিবারণের সামান্য অন্ন আর লজ্জা নিবারণের এক প্রস্থ কাপড় ছাড়া আমাদের আর কিছুই চাওয়ার নেই। আমরা তো কেবল আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করার জন্যই বেঁচে আছি। প্রশ্ন জাগে- কেন? রাসূল (সা.) কেন এমন একটি সামরিক জাতি গঠন করেছিলেন? কেন পবিত্র কুরআনের শত শত আয়াত এবং হাদিস ও সীরাত গ্রন্থের এক বিশাল অংশজুড়ে শুধু যুদ্ধের বর্ণনা ও রণকৌশল স্থান পেয়েছে? আজকের আলোচনায় আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।

বর্তমানে আমাদের সমাজে ইসলামের যে চর্চা- মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ কিংবা ওয়াজ মাহফিলে পরিলক্ষিত হয়- তা মূলত তিন শ্রেণির মানুষ তৈরি করছে। মাদ্রাসার মাধ্যমে তৈরি হচ্ছেন মুফতি-মাওলানা, দরবার ও মাজারের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে পীরের মুরিদ এবং ইসলামি রাজনীতির মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে এক বিশাল ভোটব্যাংক। কিন্তু রাসূল (সা.)-এর যুগের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই ইসলাম থেকে কেবল মুফতি, মুরিদ বা ভোটার তৈরি হতো না; বরং সেখান থেকে তৈরি হতো একেকজন অপরাজেয় সৈনিক। সাহাবায়ে কেরামের ইতিহাস পড়লে দেখা যায়- নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ, এমনকি শিশুরাও রাসূল (সা.)-এর পতাকাতলে রণাঙ্গনে ছুটে যেতেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, পুরো উম্মাহ ছিল একটি সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী।

এই বাহিনীর উদ্দেশ্য কী ছিল?
ইসলামবিদ্বেষীরা অপপ্রচার চালায় যে, রাসূল (সা.) নাকি পররাজ্য দখল ও সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য এই বাহিনী গড়েছিলেন (নাউজুবিল্লাহ)। অথচ প্রকৃত ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। লুণ্ঠনই যদি উদ্দেশ্য হতো, তবে ইন্তেকালের সময় রাসূল (সা.)-এর বিশাল রাজপ্রাসাদ ও ধনভাণ্ডার থাকার কথা ছিল। অথচ তাঁর ইন্তেকালের পর সামান্য কুটির থেকে যা পাওয়া গিয়েছিল, তা হলো-একটি চাটাই, খেজুরের ছালভর্তি একটি বালিশ, কয়েকটি মশক, ৯টি তরবারি, ৫টি বর্শা, একটি তীরকোষ, ৬টি ধনুক, ৭টি লৌহবর্ম, ৩টি যুদ্ধের জোব্বা, একটি কোমরবন্ধ, একটি ঢাল এবং ৩টি পতাকা (সূত্র: সীরাতুন্নবী-মাওলানা শিবলী নোমানী)। এ থেকেই স্পষ্ট হয়, পার্থিব ধন-সম্পদ অর্জন তাঁর লক্ষ্য ছিল না।

অনুরূপভাবে, আলী (রা.) যখন রাসূল (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা (রা.)-কে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন, তখন তাঁর সহায়-সম্বল বলতে ছিল মাত্র একটি ঘোড়া, একটি তলোয়ার ও একটি লোহার বর্ম। রাসূল (সা.) তাঁকে বর্মটি বিক্রি করে বিয়ের খরচ মেটাতে বললেও তলোয়ারটি বিক্রি করতে নিষেধ করেছিলেন; কারণ যুদ্ধের জন্য তলোয়ার ছিল অপরিহার্য। একজন শীর্ষ সেনাপতির ব্যক্তিগত সম্পদের এই দশা প্রমাণ করে যে, তাঁদের লক্ষ্য সাম্রাজ্যবাদী ছিল না।

হারিয়ে যাওয়া সেই লক্ষ্য কী?
তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল-সারা পৃথিবীতে আল্লাহর ‘দ্বীন-উল-হক’ বা সত্য জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনের তিনটি আয়াতে (তওবা: ৩৩, ফাতাহ: ২৮ ও সফ: ৯) ঘোষণা করেছেন: “আমি আমার রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছি, যেন তিনি একে অন্য সকল দ্বীন বা জীবনব্যবস্থার ওপর জয়যুক্ত করেন।” অর্থাৎ পৃথিবী থেকে সকল বাতিল মতবাদ ও মানব রচিত সিস্টেমকে পরাজিত করে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করাই ছিল রাসূলের মূল মিশন। এর মাধ্যমেই সম্ভব পৃথিবী থেকে অন্যায়-অবিচার নির্মূল করা, দুর্বলের ওপর সবলের জুলুম বন্ধ করা এবং মানবজাতিকে প্রকৃত শান্তি ও নিরাপত্তা দেওয়া।

রাসূল (সা.) জানতেন, এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হলে রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োজন। আর রাষ্ট্রশক্তি কেউ স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেয় না; তা জান-মালের কোরবানির মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। এজন্যই তাঁর প্রয়োজন ছিল এমন এক সামরিক জাতির, যারা মৃত্যুকে ভয় পায় না বরং শাহাদাতকেই জীবনের চরম সার্থকতা মনে করে। রাসূল (সা.) তাঁর নবুয়তি জীবনে যা কিছু করেছেন-সালাত, সওম, হজ, জাকাত-সবকিছুর পেছনেই ছিল একটি সামরিক ও বৈপ্লবিক লক্ষ্য (ব্যাটেল ওরিয়েন্টেড)। তিনি মাদ্রাসা বা খানকাহর আড়ালে নিষ্ক্রিয় পণ্ডিত বা মুরিদ তৈরি না করে রণাঙ্গনের বীর মুজাহিদ তৈরি করেছিলেন। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ ছিল- “ক্বিতাল (যুদ্ধ) চালিয়ে যাও যতক্ষণ না ফেতনা পুরোপুরি নির্মূল হয়।” (আনফাল: ৩৯)।

বর্তমান সামরিক জাতির অবস্থা
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজ সেই সামরিক জাতির অস্তিত্ব নেই। সাহাবায়ে কেরামের যুগের পর যখন দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম স্তিমিত হয়ে গেল, তখন উম্মাহর একাংশ কেবল কিতাবি আলোচনায় মগ্ন হলেন, আর অন্য অংশ তাসবিহ হাতে আধ্যাত্মিক সাধনায় লিপ্ত হলেন। ফলে জাতির ঐক্য চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। সুফি-দরবেশরা যখন ‘আত্মার বিরুদ্ধে জিহাদ’কে একমাত্র কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন এবং আলেমরা বাহাস-মুনাজারায় লিপ্ত হলেন, তখন বহিরাগত শত্রুরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে মুসলিম বিশ্বকে গ্রাস করে নিল।

বিগত ১৩০০ বছরের এই বিচ্যুতি আমাদের আজ এমন এক অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে যেখানে মুসলিম জাতি আজ বিশ্বজুড়ে লাঞ্ছিত, অপমানিত ও গণহত্যার শিকার। আমাদের ভূখণ্ড রক্ষায় আমরা আজ অক্ষম। মাথায় টুপি আর মুখে দাড়ি রেখে আমরা রাসূলের উম্মত হওয়ার দাবি করছি ঠিকই, কিন্তু তাঁর আসল মিশন-আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম-আমরা ত্যাগ করেছি।

পরিশেষে, যতদিন আমরা একজন নেতার অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাসূল (সা.)-এর সেই বৈপ্লবিক মিশন বাস্তবায়নে সচেষ্ট না হবো, ততদিন আমরা প্রকৃত ‘উম্মতে মোহাম্মদী’ হতে পারব না। কিয়ামতের দিন রাসূল (সা.) হয়তো আমাদের মতো নামাজি বা হাজিদের বলবেন- “আমি ও আমার সাহাবীরা যে জীবনব্যবস্থার জন্য রক্ত দিলাম, সেই সংগ্রামই যখন তোমরা ত্যাগ করেছ, তবে আমার সাথে তোমাদের আর কী সম্পর্ক?” সুতরাং, প্রকৃত মুক্তি ও সাফল্যের চাবিকাঠি নিহিত আছে সেই হারানো সামরিক চেতনা ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মধ্যে।

টপিক: ইসলামি ইতিহাসউম্মাহবিজয়বীরত্বরসুলের যুদ্ধ
লেখক পরিচিতি
Author

Deenul Haq

সম্পাদক
কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান প্রচার এবং দ্বীনি দাওয়াতের একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। আমাদের সাথে থাকুন আপনার ঈমানি যাত্রায়।
×
QR কোড স্ক্যান করুন