NEW জেলা অনুযায়ী সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬
হোম » রাষ্ট্রব্যবস্থা » রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার উদ্দ...
মানবিক মর্যাদা ও অভয় নিরাপত্তার গ্যারান্টি

রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য: দুটি ঘটনা

auth Deenul Haq ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৫ মিনিটে পড়ুন
feature

‘ইসলাম’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ শান্তি, যা ‘সালাম’ শব্দ থেকে উদ্ভূত। অন্যদিকে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত ধাতু ‘রাজ’ থেকে, যার অর্থ রাজ্য। যে ভূখণ্ড বা রাজ্যে আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক অনুসৃত পদ্ধতি বা সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে সুখ, শান্তি, ন্যায়বিচার, মানবতা, সাম্য ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটিই হলো ইসলামি রাষ্ট্র। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ সমান অধিকার ও ইনসাফ লাভ করবে। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানবজাতির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে (Cultural diversity) পুরোপুরি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ধর্ম, পোশাক, সংস্কৃতি, ভাষা কিংবা রুচি ও বিশ্বাস নিয়ে কোনো প্রকার জবরদস্তি বা বাড়াবাড়ি করার সুযোগ এখানে নেই।

প্রশ্ন উঠতে পারে, বর্তমানে যেসব দেশে ‘শরিয়াহ আইন’ কার্যকর আছে বা হয়েছিল, সেগুলোর সঙ্গে প্রকৃত ইসলামের রাষ্ট্রব্যবস্থার পার্থক্য কোথায়? এই পার্থক্য বোঝার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবন থেকে দুটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। এর একটি ইসলামের একদম প্রাথমিক যুগের এবং অন্যটি তাঁর জীবনের শেষ দিকের।

প্রথম ঘটনা: অভয় ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি

ঘটনাটি ইসলামের প্রাথমিক যুগের, যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণের ওপর মক্কার কাফেরদের অবর্ণনীয় নির্যাতন চলছিল। একদিন রাসূল (সা.) কাবা শরীফের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে সাহাবী খাব্বাব (রা.) এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! এই অত্যাচার-নিপীড়ন আর সহ্য হচ্ছে না। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন আমাদের বিরোধীরা সব যেন ধ্বংস হয়ে যায়।’

রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীর এই আরজি শুনে সোজা হয়ে বসলেন এবং গুরুত্বের সাথে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী বললে?’ খাব্বাব (রা.) তাঁর কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। কিন্তু রাসূল (সা.) ধ্বংসের দোয়া না করে বরং এক শান্তিময় ভবিষ্যতের চিত্র এঁকে বললেন: ‘শোন, শীঘ্রই সময় আসছে যখন কোনো যুবতী মেয়ে গায়ে গহনা পরে একা সা’না থেকে হাদরামাউত যাবে। তার মনে এক আল্লাহ এবং বন্য জন্তু ছাড়া আর কোন ভয় থাকবে না।’ [খাব্বাব (রা.) থেকে বোখারী ও মেশকাত]।

এই হাদিসটি থেকেই ইসলামের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়। রাসূল (সা.) উদাহরণের জন্য ‘নারীকে’ বেছে নিলেন, কারণ নারীর সম্পদ ছাড়াও সম্মান ও সম্ভ্রম হারানোর ভয় থাকে। তিনি ‘যুবতী’ এবং ‘অলঙ্কার পরিহিত’ হওয়ার কথা বললেন, যা দুর্বৃত্তদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়। অথচ তিনি বলছেন, অনুরূপ একজন নারী একা সাড়ে ছয়শ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেবে এবং তার মনে এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ভয় থাকবে না। অর্থাৎ, ইসলাম এমন এক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জান, মাল ও ইজ্জত হবে নিরাপদ। বর্তমানে তথাকথিত শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে অনেক স্থানে নারীর চলাচলের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়, যা প্রকৃতপক্ষে রাসূল (সা.)-এর প্রদর্শিত ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ মুমিনদের জন্য এমন এক নিরাপত্তা ও শাসনেরই ওয়াদা করেছেন: “সেখানে তিনি মো’মেনদেরকে শাসনকর্তৃত্ব (খেলাফত) দান করবেন, সেখানে আল্লাহর পছন্দের জীবনব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করবেন এবং তাদেরকে ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই নিরাপত্তা (আমান) দান করবেন।” (সুরা নুর ২৪:৫৫)।

দ্বিতীয় ঘটনা: মানবিক মর্যাদা ও সাম্যের ঘোষণা

অষ্টম হিজরীর মক্কা বিজয়ের দিন। রাসূলুল্লাহ (সা.) আজ মক্কার অবিসংবাদিত নেতা। সেদিন তিনি হাবশি ক্রীতদাস বেলালকে (রা.) বললেন কাবার ছাদে উঠে আযান দিতে। ইতিহাস বলছে, তখন বেলালের (রা.) ঊর্ধ্বাঙ্গে কোনো রাজকীয় পোশাক ছিল না, ছিল না কোনো পাগড়ি। কেবল লজ্জাস্থান ঢাকার মতো এক টুকরো কাপড় কোমরে প্যাঁচানো ছিল। সেই নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি বেলালকে (রা.) রাসূল (সা.) কাবার ছাদের মতো সুউচ্চ ও পবিত্র স্থানে তুলে দিলেন।

সেদিন আল্লাহর সার্বভৌমত্বের আযান ধ্বনিত হলো বেলালের কণ্ঠে। রাসূল (সা.) কোনো প্রভাবশালী কোরাইশ সাহাবীকে বেছে না নিয়ে বেলালকে (রা.) কেন বেছে নিলেন? এর মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীকে এই শিক্ষা দিয়ে গেলেন যে, আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদা তার বংশগৌরব বা বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়, বরং তার চরিত্র ও কর্মে। মুমিনের সম্মান আল্লাহর কাছে কাবারও ঊর্ধ্বে-এই মহান সত্যটি তিনি সেদিন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ইসলাম: শান্তির এক সুরক্ষিত আবাস

এই দুটি ঘটনা থেকে ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে ‘শান্তি ও মানবাধিকার’ ফুটে ওঠে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য: ‘রসুলাল্লাহ (সা.) বলেছেন- ইসলাম একটি ঘর, সালাত (নামাজ) তার খুঁটি এবং জেহাদ হলো ছাদ [হাদিস- মুয়ায (রা.) থেকে আহমদ, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ, মেশকাত]।’ ঘর যেমন মানুষকে রোদ-বৃষ্টি ও চোর-ডাকাত থেকে সুরক্ষা দেয়, ইসলামও তেমনি একটি নিরাপদ ঘরের মতো মানবজাতিকে জুলুম ও বঞ্চনা থেকে নিরাপত্তা দেয়। এই ঘর নির্মাণের পদ্ধতিও তিনি শিখিয়ে গেছেন তাঁর বৈপ্লবিক জীবনের মাধ্যমে।

ইসলাম যে সভ্যতা কায়েম করতে চায়, তাতে মানুষের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি হবে এমন: আমরা সবাই এক স্রষ্টার সৃষ্টি, এক পিতামাতা আদম-হাওয়ার সন্তান। আমাদের অধিকার সমান এবং আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক হবে ভ্রাতৃত্বের। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বলেছেন: ‘হে মানব! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচত হতে পারো। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই অধিক মর্যাদাবান যে অধিক মুত্তাকি।’ (সুরা হুজরাত ৪৯:১৩, সুরা নিসা ৪:১)।

বিদায় হজ্বের ঐতিহাসিক ভাষণে রাসূল (সা.) এই সাম্যের আদর্শকে চিরস্থায়ী রূপ দিয়ে বলেন: ‘আজকের এই দিন ও এই মাস যেমন পবিত্র; তোমাদের জান-মাল কিয়ামত পর্যন্ত তেমনই পবিত্র। হে লোকসকল! জেনে রেখো, তোমাদের রব একজন এবং তোমাদের পিতাও একজন। জেনে রেখো, অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং আরবের ওপরও অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোর ওপর সাদার এবং সাদার ওপর কালোরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র ভিত্তি তাকওয়া।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৪৮৯)।

তিনি আরও বলেছেন: ‘সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর পরিবার। অতএব আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় সেই ব্যক্তি যে তার সৃষ্টির প্রতি উত্তম আচরণ করে।’ (হাদিস: বায়হাকি, মেশকাত)।

কাজেই ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের মধ্যে বিভাজন কেবল দুই প্রকার-সত্যের অনুসারী (মুমিন) ও মিথ্যার অনুগামী (কাফের)। এর বাইরে জাতীয়তা, বর্ণ, শ্রেণি বা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে বৈষম্য সৃষ্টির কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। রাষ্ট্রীয় জীবনে এই শাশ্বত দর্শন প্রতিষ্ঠা করাই ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মূল লক্ষ্য।

টপিক: নিরাপত্তাবেলাল (রা.)মক্কা বিজয়মানবিক মর্যাদাশান্তি
লেখক পরিচিতি
Author

Deenul Haq

সম্পাদক
কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান প্রচার এবং দ্বীনি দাওয়াতের একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। আমাদের সাথে থাকুন আপনার ঈমানি যাত্রায়।
×
QR কোড স্ক্যান করুন