বর্তমান শতধাবিভক্ত, হানাহানিতে লিপ্ত এবং হাজারো রকমের আকিদায় বিভক্ত মুসলিম জাতির জন্য এটি জানা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে যে, তারা নিজেদেরকে যাঁর উম্মত বলে বিশ্বাস করেন, সেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল। এই উদ্দেশ্য যদি সুস্পষ্ট থাকে, তবে তাঁর হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, ধর্মব্যবব্যবসা কিংবা অপরাজনীতি করার কোনো সুযোগ থাকবে না। রাসূল (সা.) ও তাঁর সাহাবীদের সমগ্র জীবনের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও শাহাদাতের বিনিময়ে তিনি কী প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তা খণ্ডিতভাবে না দেখে সামগ্রিকভাবে এক দৃষ্টিতে দেখার নামই হলো ‘আকিদা’।
তিনি কি সাম্রাজ্য বিস্তার করতে এসেছিলেন? তিনি কি অন্য ধর্মের লোকদের জোর করে ধর্মান্তরিত করতে বা তাদের ধন-সম্পদ দখল করতে এসেছিলেন? (নাউযুবিল্লাহ!) গত কয়েক শতাব্দী ধরে ইসলামের শত্রুরা এসব ভিত্তিহীন অপপ্রচার চালিয়ে সমাজে ঘৃণা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা করে আসছে। অন্যদিকে, ধর্মের ধ্বজাধারী ও ধর্মব্যবসায়ীরা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে রাসূলের জীবনের অতি ব্যক্তিগত ও ক্ষুদ্র বিষয়গুলোকে মহাগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করে তাঁর আগমনের মূল উদ্দেশ্যকেই আড়াল করে ফেলেছেন। অথচ তাঁর আল্লাহ প্রদত্ত উপাধি ছিল ‘রহমাতাল্লিল আলামিন’-অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত বা আশীর্বাদস্বরূপ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের সকল মানুষকে একটি শোষণহীন, শান্তিময় ও নিরাপদ জীবন উপহার দেওয়াই ছিল তাঁর আগমনের মূল লক্ষ্য।
পবিত্র কোর’আনের অন্তত তিনটি আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে তাঁর রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্য ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন: “তিনি হেদায়াহ ও সত্যদীন সহকারে স্বীয় রসুল প্রেরণ করেছেন যেন তিনি একে অন্যান্য সকল জীবনব্যবস্থা, দীনের উপর বিজয়ী করেন।” (সুরা সফ ৯, সুরা তওবা ৩৩, সুরা ফাতাহ ২৮)।
সুতরাং বোঝা গেল, আল্লাহর প্রেরিত হেদায়াহ (সঠিক পথ) ও সত্যদীনকে সমগ্র মানবজাতির জীবনে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য। এই লক্ষ্যে তিনি সর্বপ্রথম মানুষকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু কাবাকেন্দ্রিক পুরোহিত ও ধর্মব্যবসায়ীদের অপপ্রচারের কারণে তিনি শুরুতেই প্রচণ্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হন।
একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা আবু তালিব তাঁকে ডেকে মক্কার নেতাদের পক্ষ থেকে তিনটি প্রস্তাব দেন: আরবের বাদশাহি, শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নারী অথবা সেরা চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা। এর বিনিময়ে তাঁকে তাঁর মিশন ত্যাগ করতে বলা হয় এবং না মানলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। জবাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) দৃপ্তকণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন: “চাচা, আপনি তাদের বলে দিবেন, তারা যদি আমার এক হাতে চন্দ্র আর আরেক হাতে সূর্যও এনে দেয় তবু আমি আমার এ পথ ছাড়ব না। হয় আল্লাহর বিজয় হবে নয় এ পথে মোহাম্মদ শেষ হয়ে যাবে।” (সিরাত ইবনে ইসহাক)।
এখানেই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি ক্ষমতা বা ভোগবিলাস চাননি; তিনি চেয়েছিলেন ‘আল্লাহর বিজয়’। কিন্তু আল্লাহর সেই বিজয় কীসে নিহিত?
একজন নির্যাতিত সাহাবী যখন কাফেরদের ধ্বংসের জন্য দোয়া করতে বললেন, তখন রাসূল (সা.) তা করেননি। কারণ তিনি মানুষকে ধ্বংস করতে আসেননি, বরং মুক্তি দিতে এসেছিলেন। তিনি জবাবে বললেন, “শোনো, সেদিন বেশি দূরে না, যেদিন একজন যুবতী সুন্দরী মেয়ে সারা গায়ে অলঙ্কার পরিহিত অবস্থায় সানা থেকে হাদরামাউত পর্যন্ত পথ রাতের অন্ধকারে হেঁটে যাবে। তার মনে আল্লাহ ও বন্যপ্রাণীর ভয় ছাড়া আর বিপদের আশঙ্কাও জাগ্রত হবে না।” অর্থাৎ আল্লাহর বিজয় মানে হলো এমন এক শান্তিময় ও নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও সুরক্ষিত থাকবে।
মক্কা বিজয়ের দিন তিনি তাঁর পরম শত্রুদেরও ক্ষমা করে দিলেন। এরপর তিনি হাবশি ক্রীতদাস বেলালকে (রা.) কাবার ছাদে উঠে আযান দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। সেই বেলাল, যিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের নির্যাতিত, নিপীড়িত ও দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ মানুষের প্রতীক। তাঁকে কাবার মতো পবিত্র স্থানের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠিয়ে রাসূল (সা.) প্রমাণ করে দিলেন যে, ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদা তার বংশ বা সম্পদে নয়, বরং তার মানবতা ও কর্মে।
বিদায় হজ্বের ভাষণে তিনি সকল প্রকার বর্ণ ও জাতিগত বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে দিয়ে ঘোষণা করলেন যে, श्रेष्ठত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো ‘তাকওয়া’। তিনি মনিবকে নির্দেশ দিলেন অধীনস্থদের সাথে समान व्यवहार করার জন্য। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজে এতটাই ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, মানুষ যাকাত দেওয়ার জন্য দরিদ্র খুঁজে পেত না, রাস্তায় পড়ে থাকা মূল্যবান জিনিসও কেউ স্পর্শ করত না এবং বছরের পর বছর আদালতে কোনো অপরাধ সংক্রান্ত মামলা আসত না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তাঁর রেখে যাওয়া পার্থিব সম্পদ ছিল: (১) ১টি চাটাই, (২) ১ টি বালিশ (খেজুরের ছাল দিয়ে ভর্তি) ও (৩) কয়েকটি মশক। এর পাশাপাশি তিনি রেখে যান সংগ্রামের উপকরণ: (১) ৯টি তরবারী, (২) ৫টি বর্শা, (৩) ১টি তীরকোষ, (৪) ৬টি ধনুক, (৫) ৭টি লৌহবর্ম, (৬) ৩টি যুদ্ধের জোব্বা, (৭) ১টি কোমরবন্ধ, (৮) ১টি ঢাল এবং (৯) ৩টি পতাকা। (তথ্যসূত্র:- সিরাতুন্নবী- মওলানা শিবলী নোমানী)।
তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদই প্রমাণ করে যে, তিনি দুনিয়ার কোনো স্বার্থের জন্য সংগ্রাম করেননি। মানুষের মুক্তি ও শান্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর এবং সকল নবী-রাসূলের আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য। এই সঠিক আকিদা বা উদ্দেশ্য যদি আজ আমাদের সামনে পরিষ্কার থাকে, তবে কেউ আর ইসলামের নামে সন্ত্রাস বা বিদ্বেষ ছড়াতে পারবে না।

