ইউরোপে ১৫শ ও ১৬শ শতাব্দীর রেনেসাঁ বা নবজাগরণ ছিল মূলত খ্রিষ্টধর্মের তৎকালীন গোঁড়ামি থেকে মানুষের চিন্তাকে মুক্ত করার একটি প্রয়াস। মধ্যযুগের খ্রিষ্টান ধর্মগুরুদের বিজ্ঞানবিরোধী অবস্থান এবং বিজ্ঞানীদের ওপর চালানো নিষ্ঠুর নির্যাতনের ফলে ইউরোপে ধর্মবিরোধী একটি স্থায়ী মানসিকতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে শিল্পবিপ্লবের ফলে উৎপাদিত পণ্যের বাজার সৃষ্টি ও সস্তা শ্রম সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ইউরোপ যখন বিশ্বব্যাপী উপনিবেশ স্থাপন করল, তখন তাদের সেই ধর্মহীন বা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা ও মানসিকতাও উপনিবেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল। এর ফলে সৃষ্টি হলো এমন একটি শিক্ষিত শ্রেণি, যারা পেশাগত জীবনে দক্ষ হলেও মানসিকভাবে পশ্চিমা প্রভুদের অনুসারী।
এই প্রক্রিয়ায় গত কয়েকশ বছর ধরে আমাদের মননে ধর্মবিদ্বেষ বা ধর্মহীনতাকে আধুনিকতার সমার্থক হিসেবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোতে ধর্মের আনুষ্ঠানিক কোনো কর্তৃত্ব না থাকলেও আধুনিক রাষ্ট্রনায়কদের প্রতিনিয়ত ধর্মীয় উগ্রবাদ বা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হয়। রাষ্ট্র যতই ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি করুক, ভোট ও ক্ষমতার সমীকরণে ধর্মই শেষ পর্যন্ত প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি নির্বাচনের সময় কট্টর ধর্মহীন নেতাদেরও ধার্মিক সাজতে দেখা যায়। প্রশ্ন হলো-ধর্ম যদি এতই ‘সেকেলে’ বা ‘অফিম’ হয়, তবে কেন এত চেষ্টা করেও একে মানুষের জীবন থেকে মুছে ফেলা গেল না? কেন মুক্তবুদ্ধির নামে ধর্মকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার পরও ধর্মই আমাদের জীবনের প্রধান আলোচিত বিষয় হয়ে রয়ে গেছে? বাস্তবতা হলো, মানুষকে ধর্মহীন করার চেষ্টা কোনোদিন সফল হয়নি এবং হবেও না। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে ধ্বংস না করে বরং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে মানবকল্যাণে ব্যবহার করা।
আকিদাহর সংশোধন: আমল কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত
যেহেতু এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্মপ্রাণ, তাই তাদের এই বিশ্বাসকে যেন কোনো স্বার্থান্বেষী মহল ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য ধর্মবিশ্বাসের মূল আকিদাহ বা ধারণাটি সংশোধন করা প্রয়োজন। আকিদাহ (Aqeedah) হলো কোনো বিষয় সম্পর্কে সঠিক ও সম্যক ধারণা। ঘড়ির কাজ সময় দেওয়া-এটি জানাই হলো ঘড়ি সম্পর্কে সঠিক আকিদাহ। একইভাবে আমাদের জানতে হবে কেন আমরা ইবাদত করি, নবী-রাসূলদের আগমনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী এবং সালাত-সওম-হজ কেন ফরজ করা হয়েছে। গত ১৩০০ বছরে এই মৌলিক ধারণাগুলো বিকৃত হয়ে যাওয়ার ফলেই মানুষের আমল আজ নিষ্ফল হয়ে পড়ছে। রাসূল (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এমন এক সময় আসবে যখন মানুষের রোজা কেবল উপবাসে আর নামাজ কেবল পরিশ্রমেই পর্যবসিত হবে। তাই ধর্মের সঠিক আকিদাহ প্রচার করাই এখন সময়ের দাবি।
ধর্ম ও ধার্মিকতার প্রকৃত সংজ্ঞা
‘ধর্ম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘ধারণ করা’। কোনো বস্তু বা প্রাণী যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, সেটিই তার ধর্ম। আগুনের ধর্ম পোড়ানো; পোড়ানোর ক্ষমতা হারালে আগুন তার ধর্ম হারায়। মানুষের ধর্ম কী? মানুষের ধর্ম হলো ‘মানবতা’। অর্থাৎ, একজন প্রকৃত ধার্মিক তিনিই, যিনি অন্যের দুঃখ-কষ্ট নিজের হৃদয়ে অনুভব করেন এবং তা দূর করতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালান। অথচ আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা হলো-সুনির্দিষ্ট লেবাস পরা বা কেবল শাস্ত্রীয় আচার পালন করাই ধার্মিকতা।
ইবাদত: আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করা
মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর প্রতিনিধি (Representative) হিসেবে (সুরা বাকারা: ৩০)। ইবাদত মানে কেবল তসবিহ পাঠ নয়, বরং স্রষ্টা কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব পালন করা। সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে আল্লাহ যেভাবে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ রেখেছেন, এই পৃথিবীকেও সেভাবে শান্তিপূর্ণ রাখা মানুষের প্রধান ইবাদত। উদাহরণস্বরূপ, যদি ইবাদতে মগ্ন থাকা অবস্থায় পাশে কারো আর্তচিৎকার শোনা যায়, তবে নামাজ ছেড়ে সেই বিপন্ন মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়াই হলো প্রকৃত ইবাদত। সেই সাহায্য না করে উপাসনায় মগ্ন থাকা প্রকৃত ধর্মপ্রাণতা নয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ মুসা (আ.)-কে সালাত কায়েমের নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথে ফেরাউনের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন (সুরা ত্বা-হা: ১৪-২৪)। মুসা (আ.)-এর ইবাদত ছিল অত্যাচারিত বনি ইসরাইল জাতিকে ফেরাউনের দাসত্ব থেকে মুক্ত করা এবং তাদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ, নিপীড়িত জনতাকে জালেমের হাত থেকে মুক্ত করে শান্তি দেওয়াই হলো মানুষের মূল ইবাদত। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ‘রহমাতাল্লিল আলামিন’ নামের স্বার্থকতা এখানেই-তিনি মানুষের মর্যাদা কাবার ওপরে স্থান দিয়েছিলেন। অথচ আজ ধার্মিকতার দোহাই দিয়ে মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্বিকার থাকে, তখনই কার্ল মার্কসের সেই উক্তি ‘ধর্ম আফিম’-এর মতো শোনায়। আজ যা ইসলাম হিসেবে সমাজে চলছে, তা সেই প্রকৃত ইসলাম নয় যা তেরশ বছর আগে হারিয়ে গেছে।
নিরাপত্তা ও সামাজিক দায়িত্ব
ভোগবাদী জীবনব্যবস্থার প্রভাবে মানুষ আজ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক যে, চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখলেও প্রতিবাদ করতে চায় না; ভাবে এটি কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ। কিন্তু পুরো জাতি যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়, তবে কেবল বাহিনী দিয়ে শান্তি রক্ষা অসম্ভব। পবিত্র কোরআনের সুরা হুজরাতে (১৫ নং আয়াত) মুমিন হওয়ার শর্ত হিসেবে জীবন ও সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় অর্থাৎ মানবতার কল্যাণে উৎসর্গ করার কথা বলা হয়েছে। সমাজ হলো ঐক্য, শৃঙ্খলা ও ত্যাগের সমন্বিত রূপ। যে ব্যক্তি কেবল নিজের এবং নিজের পরিবারের চিন্তায় মগ্ন থেকে দেশ ও সমাজের অন্যায়ের প্রতি উদাসীন থাকে, তার ঈমান প্রশ্নবিদ্ধ।
মানুষকে বুঝতে হবে সে পশুর মতো কেবল নিজের জন্য বাঁচার জন্য আসেনি। তার জীবন তখনই সার্থক হবে যখন সে অন্যের জন্য বাঁচবে। আজ যখন বিশ্বজুড়ে অন্যায়, অশান্তি ও রক্তপাত চলছে, তখন আমাদের প্রিয় জন্মভূমিকে যাবতীয় সন্ত্রাস ও হানাহানি থেকে নিরাপদ রাখা আমাদের প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় কর্তব্য তথা জেহাদের অন্তর্ভুক্ত।
ধর্ম ও ধর্মীয় কর্তব্যকে যখন মানবতার সেবার এই মহান আঙ্গিকে তুলে ধরা হবে, তখন কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠী ধর্মবিশ্বাসকে হাইজ্যাক করে সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে পারবে না। বরং মানুষ নিজের ধর্মবিশ্বাস থেকেই সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করবে এবং প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অতন্দ্র প্রহরীর মতো জাগ্রত থাকবে। ধর্ম তখন রাষ্ট্রের জন্য কোনো সংকট হবে না, বরং হবে শান্তির এক শাশ্বত আশীর্বাদ।

