সালাত বা নামাজ ইসলামের পাঁচটি বুনিয়াদী স্তম্ভের মধ্যে দ্বিতীয়। আল্লাহর সার্বভৌমত্বের (তওহীদ) ওপর বিশ্বাসের পর সালাতের স্থান। সালাতকে ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে বিবেচনা করে বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সালাত যাতে নির্ভুল ও কবুলযোগ্য হয়, সেজন্য ওজু, দোয়া ও মাসলা-মাসায়েল নিয়ে রচিত হয়েছে অগণিত গ্রন্থ। এমনকি নিয়মিত নামাজ পড়ার তাগিদ দিতে কাজ করছে বহু সংস্থা ও সংগঠন। কিন্তু এত আয়োজনের পরও একটি বড় দুর্ভাগ্য হলো-কেন এই সালাতের বিধান দেওয়া হলো, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য কী এবং সালাত আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কী শিক্ষা দেয়-সেই আকিদাহ বা মূল দর্শনটিই আজ আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে।
মহাবিশ্বের কোনো কিছুই আল্লাহ উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। তেমনি ইসলামেরও একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে-তা হলো মানবজীবন থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার ও অশান্তি দূর করে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। ইসলামের প্রতিটি আমল বা বিধান সেই মূল লক্ষ্য অর্জনের এক একটি মাধ্যম। তাহলে যে সালাতকে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ৮২ বারেরও বেশি উল্লেখ করেছেন, তা কি উদ্দেশ্যহীন হতে পারে? অবশ্যই নয়।
সালাতের উদ্দেশ্য কী?
রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি চমৎকার উপমার মাধ্যমে সালাতের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, “ইসলাম একটি ঘর, সালাত তার খুঁটি এবং জেহাদ (অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম) হলো তার ছাদ।” (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)। একটি ঘরের প্রধান উদ্দেশ্য হলো রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দেওয়া, যা নিশ্চিত করে ছাদ। আর সেই ছাদকে ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন হয় মজবুত খুঁটির। যদি ঘরে ছাদই না থাকে, তবে খুঁটি অর্থহীন; আবার খুঁটি না থাকলে ছাদ দেওয়া অসম্ভব। রাসূল (সা.) জেহাদকে ছাদের সাথে তুলনা করে বোঝালেন-ইসলামের চরম লক্ষ্য হলো সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। আর সালাত হলো সেই সংগ্রামের উপযোগী কর্মী তৈরির প্রশিক্ষণ বা খুঁটি। সালাত মো’মেনদের মানসিক, আধ্যাত্মিক ও শারীরিকভাবে এমনভাবে গড়ে তোলে যেন তারা মানবতার কল্যাণে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে একটি সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হয়।
সালাত যেভাবে চরিত্র গঠন করে:
১. ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ:
সালাত জাতিকে ঐক্যের শিক্ষা দেয়। ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে এসে একটি নির্দিষ্ট সময়ে, কাতারবদ্ধ হয়ে একই অভিমুখে (কাবার দিকে) দাঁড়ানোর মাধ্যমে মো’মেনদের মধ্যে লক্ষ্যের ঐক্য তৈরি হয়। ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাদা-কালো ভেদাভেদ ভুলে একই সারিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর ফলে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়। নামাজের এই কাতারকে বলা হয় ‘সফ’। আল্লাহ সুরা সফ-এ বলেছেন, “আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন যারা সীসাঢালা প্রাচীরের মতো সারিবদ্ধভাবে (সফ) তাঁর পথে সংগ্রাম করে।” (সুরা সফ: ৪)। সুতরাং, সালাতের এই ‘সফ’ কেবল মসজিদের ভেতরের আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি বাস্তব জীবনে মো’মেনদের অটুট ঐক্যের প্রতীক।
২. শৃঙ্খলাবোধ:
সালাতের প্রতিটি ধাপে রয়েছে কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলা। ওজু থেকে শুরু করে রুকু-সেজদা এবং ইমামের অনুসরণ-সবকিছুই একটি সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলায় আবদ্ধ। নির্দিষ্ট সময়ে জামাতে শরিক হওয়া, ধনুকের ছিলার মতো কাতার সোজা রাখা, মেরুদণ্ড সোজা রাখা এবং ইমামের কমান্ডের আগে বা পরে না যাওয়া-এসবই একজন মো’মেনকে সুশৃঙ্খল নাগরিকে পরিণত করে। এই শৃঙ্খলাবদ্ধ চরিত্রই জাতিকে জাতীয় দুর্যোগ ও যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়তে শেখায়।
৩. আনুগত্যের প্রশিক্ষণ:
জামাতে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে ইমামের আনুগত্য অপরিহার্য। ইমামের তকবিরের সাথে সাথেই রুকু-সেজদা করতে হয়; তাঁর অবাধ্য হলে সালাত হয় না। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে এই যে শর্তহীন আনুগত্যের মহড়া, তা মো’মেনদের চরিত্রে নেতৃত্বের প্রতি অনুগত হওয়ার গুণ তৈরি করে। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে নেতৃত্বের সংকট ও বিশৃঙ্খলার মূল কারণ হলো আমরা নামাজের এই আনুগত্যের শিক্ষা মসজিদের বাইরে ধারণ করতে পারছি না। সালাতের প্রকৃত আকিদাহ জানা থাকলে মানুষ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনেও ন্যায়সঙ্গত নেতৃত্বের প্রতি এমন প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রদর্শন করত।
৪. শারীরিক সক্ষমতা ও কর্মতৎপরতা:
সালাত কেবল আত্মিক নয়, শারীরিক সুস্থতারও সহায়ক। রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ মোতাবেক যথাযথভাবে রুকু, সেজদা ও অঙ্গ সঞ্চালন করলে তা শরীরের জন্য ব্যায়ামের মতো কাজ করে। তবে আল্লাহ মুনাফিকদের সালাতের সমালোচনা করে বলেছেন, তারা ‘কুসালা’ বা অলসভাবে ও শৈথিল্যের সাথে সালাতে দাঁড়ায় (সুরা নিসা: ১৪২)। বর্তমান মুসলিম জাতির সালাত অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রাণহীন ও ঢিলেঢালা রূপ নিয়েছে। প্রকৃত সালাত মো’মেনদের সজাগ, কর্মতৎপর ও শারীরিকভাবে সক্ষম করে তোলে।
৫. আত্মিক সংশোধন বা ইসলাহ:
সালাত বা ‘সালাহ’ শব্দটি এসেছে ‘আসলাহা’ থেকে, যার অর্থ সংশোধন বা সংস্কার। মো’মেন যখন সালাতে দাঁড়ায়, সে নিজেকে আল্লাহর সামনে তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র হিসেবে সমর্পণ করে। রুকু ও সেজদার মাধ্যমে সে নিজের অহংকার বিসর্জন দেয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর বিশালত্বের সামনে মাথা নত করতে শেখে, সে বাস্তব জীবনে কখনও উদ্ধত বা স্বৈরাচারী হতে পারে না। সে তার ভুলত্রুটির জন্য লজ্জিত হয় এবং প্রতিটি ওয়াক্তে নিজেকে সংশোধন করার শপথ নেয়। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সুরা আনকাবুত: ৪৫)।
সালাতের সামগ্রিক উদ্দেশ্য হলো একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল, সাহসী ও আপসহীন চরিত্রে গড়ে তোলা। বর্তমান বিশ্বজুড়ে যখন অন্যায়, জুলুম ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত, তখন আমাদের প্রয়োজন সেই বিপ্লবী সালাত-যা ১৭ কোটি মানুষকে সীসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। সালাতসহ ইসলামের প্রতিটি বিধানের এই সঠিক উদ্দেশ্য ও আকিদাহ যদি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, তবে তারা নিজেদের ঈমানি চেতনা থেকেই দেশ ও মানবতার শত্রু এবং যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। সালাত কেবল উপাসনা নয়, এটি একটি শান্তিময় বিশ্ব গড়ার বাস্তব নকশা।

