মানবজাতির ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আল্লাহ প্রত্যেক নবী-রাসূলকে একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য দিয়ে পাঠিয়েছেন-তা হলো নিজ নিজ জাতির মধ্যে আল্লাহর তওহীদ এবং তাঁর দেওয়া জীবনব্যবস্থা বা ‘দীন’ প্রতিষ্ঠা করা। তবে আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পাঠানো হয়েছে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির ওপর এই সত্যদীনকে বিজয়ী করার মহান দায়িত্ব দিয়ে (সুরা ফাতাহ: ২৮, সুরা তওবা: ৩৩, সুরা সফ: ৯)। এই দায়িত্ব এতই বিশাল ছিল যে, একজনের পক্ষে এক জীবনে তা সম্পূর্ণ করা অসম্ভব। তাই তিনি ‘উম্মতে মোহাম্মদী’ নামক একটি বিপ্লবী জাতি সৃষ্টি করলেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মাহকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাঁর অবর্তমানে তাঁর আজীবনের সেই সংগ্রাম-অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করে যাবতীয় অন্যায় ও অশান্তি দূর করার দায়িত্ব-এই জাতির ওপরই বর্তাবে। তিনি এই সামগ্রিক সংগ্রামকেই তাঁর ‘সুন্নাহ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, “যে আমার এই সুন্নাহ ত্যাগ করবে, সে আমার কেউ নয়।” অর্থাৎ, যে জাতি সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই ছিল আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার লড়াই, সেই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হলে তারা আর ‘উম্মতে মোহাম্মদী’ নামের সার্থকতা ধরে রাখতে পারে না।
সিদ্দীকে আকবর (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখনই তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! এখন আমার কাজ কী?” জওয়াবে নবীজি (সা.) বলেছিলেন, “এখন থেকে আমার যে কাজ, তোমারও সেই কাজ।” সেই মুহূর্ত থেকে জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আবু বকর (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম নবীজির সেই সংগ্রামের একনিষ্ঠ সিপাহি হিসেবে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের সেই সাহায্য ছিল অকল্পনীয়-তাঁরা ঘরবাড়ি, সম্পত্তি, পরিবার ও স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন; অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের রক্ত ঢেলে দিয়ে প্রকৃত সুন্নাহর অনুসারী হিসেবে প্রমাণ দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর পরবর্তী ৬০-৭০ বছর এই উম্মাহর কার্যাবলিই প্রমাণ করে যে, তাঁরা তাঁর প্রকৃত সুন্নাহর মর্মার্থ কী বুঝেছিলেন। তাঁরা আরবের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে শান্তির বাণী ও আল্লাহর বিধান ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই সংগ্রাম কোনো রাজ্য জয়ের লালসায় ছিল না, কিংবা তলোয়ারের জোরে মানুষকে ধর্মান্তরিত করার জন্যও ছিল না। যদি পররাজ্য গ্রাস করা লক্ষ্য হতো, তবে তাঁরা আলেকজান্ডার বা চেঙ্গিস খানের মতো লুটেরা হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হতেন। আর যদি জবরদস্তি করে ধর্ম প্রচার করা হতো, তবে আরবের বাইরে বিশাল ভূখণ্ডে আজও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অস্তিত্ব থাকত না। তাঁদের সংগ্রামের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল-মানবজাতিকে মানুষের গোলামি থেকে মুক্ত করে স্রষ্টার সার্বভৌমত্বের অধীনে এনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
আজকের বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্কবাণী দিয়েছিলেন যে, এক সময় তাঁর উম্মাহ প্রতিটি পদক্ষেপে বনি ইসরাইলকে (অর্থাৎ বর্তমানের ইহুদি-খ্রিস্টান বা পাশ্চাত্য সভ্যতাকে) অনুকরণ করবে। বনি ইসরাইল বাহাত্তর ফেরকায় বিভক্ত হয়েছিল, আর তাঁর উম্মাহ বিভক্ত হবে তিয়াত্তর ফেরকায়। এর মধ্যে কেবল একটি দল হবে জান্নাতি, যারা নবীজি ও তাঁর সাহাবীদের আদর্শ বা সুন্নাহর ওপর অটল থাকবে।
আজকের মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও বিচারব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই পাশ্চাত্য সভ্যতাকেই অন্ধভাবে অনুকরণ করছি। যে উম্মাহর দায়িত্ব ছিল বাতিল জীবনব্যবস্থাকে অকেজো করে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করা, সেই উম্মাহই আজ বিজাতীয় শাসন ও আদর্শকে সাদরে গ্রহণ করেছে। নিজেদের ঐক্য বিসর্জন দিয়ে আমরা তিয়াত্তর নয়, তার চেয়েও বেশি উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) যে ঐক্য ও শৃঙ্খলার হুকুম দিয়েছিলেন, তা আজ আমাদের মাঝে অনুপস্থিত।
বর্তমানে আমরা ধর্মের বাহ্যিক লেবাস ও কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে ইসলামকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। চমৎকার সব মসজিদ নির্মাণ, নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান, খাবারের ছোটখাটো আদব পালন কিংবা তসবিহ-জিকিরের গোল বৈঠক করেই আমরা ভাবছি-আমরা বুঝি ‘পাক্কা’ উম্মতে মোহাম্মদী হয়ে গেছি। অথচ আজ এই জাতি বিশ্বজুড়ে লাঞ্ছিত, নিগৃহীত এবং উদ্বাস্তু। নিজেদের মধ্যকার ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা ও অনৈক্যে আমরা জর্জরিত। স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সেই মূল সুন্নাহ বাদ দিয়ে আমরা আজ স্বার্থপরের মতো জীবন অতিবাহিত করছি।
প্রকৃতপক্ষে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাক্ষাত-সঙ্গীরা (সাহাবায়ে কেরাম) যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিনই এই দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পূর্ণ শক্তিতে জারি ছিল। তাঁদের তিরোধানের পর যখনই এই কেন্দ্রীয় লক্ষ্যটি ত্যাগ করা হয়েছে, তখনই উম্মাহ তার প্রকৃত পরিচয় হারিয়েছে। তাই আজ যারা নিজেদের উম্মতে মোহাম্মদী মনে করে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছেন, তাদের ভাবার সময় এসেছে-বিশ্বজুড়ে অশান্তি দূর করার যে দায়িত্ব দিয়ে এই জাতি গঠিত হয়েছিল, সেই কাজের সাথে কি বর্তমান মুসলিম উম্মাহর কোনো সম্পর্ক আছে? লক্ষ্যচ্যুত এই জনগোষ্ঠী নিজেদের উম্মতে মোহাম্মদী ভেবে আসলে এক ভ্রমের স্বর্গে বাস করছে। প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী হতে হলে আমাদের পুনরায় সেই হারানো মিশন ও মহানবী (সা.)-এর চিরন্তন সুন্নাহ-অর্থাৎ তওহীদ ভিত্তিক সমাজ গঠনের সংগ্রামে ফিরে আসতে হবে।

