রাষ্ট্র বা রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগেই রাজপথের ম্যাপ ও ট্রাফিক আইন কার্যকর করার দাবি যেমন অবান্তর, আল্লাহর তওহীদভিত্তিক ‘দীন’ প্রতিষ্ঠা না করে কেবল ‘শরিয়াহ আইন’ চালুর দাবিও তেমনি অযৌক্তিক।
বর্তমানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোতে ব্যভিচার, নারী নির্যাতন বা হত্যার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে শরিয়াহ আইন কার্যকর করার দাবি প্রায়ই ওঠে। মূলত আইনের কঠোরতা প্রদর্শনের মাধ্যমেই অপরাধ দমন এই দাবির মূল উদ্দেশ্য। বর্তমানে আফগানিস্তান, সৌদি আরব ও ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে শরিয়াহ আইন আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে কার্যকর রয়েছে। তবে সেসব জায়গায় শরিয়াহ বলতে মূলত বিভিন্ন মাজহাবের ইমামদের আইনগত মতামতকে (Legal opinion) বোঝানো হয়। বিশ্বজুড়ে শরিয়াহ আইন সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ও ভীতিকর ধারণা প্রচলিত আছে। এর শাস্তির পদ্ধতিগুলোকে অনেক সময় অমানবিক বা মধ্যযুগীয় বলে অপপ্রচার চালানো হয়। এর বড় কারণ হলো-মুসলমানদের একটি বড় অংশের কাছে ‘দীন’ ও ‘শরিয়াহ’-এর পার্থক্য ও সম্পর্ক স্পষ্ট নয়।
শরিয়াহ শব্দের উৎপত্তি ও অর্থ
‘শরিয়াহ’ শব্দটি মূলত হিব্রু শব্দ ‘sara’ বা প্রাচীন আরবি শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘পথ’ বা ‘নির্ধারিত পথ’। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এর আদি অর্থ ছিল ‘জলের উৎসের পথ’। মরুভূমির শুষ্ক পরিবেশে পানির নালা ছিল প্রাণের আধার; যে নালা দিয়ে পানি পশুর পানের নির্দিষ্ট স্থানে প্রবাহিত হতো, তাকেই বলা হতো শরিয়াহ। স্রষ্টা প্রদত্ত জীবন পরিচালনার বিধানকেও এই ‘পানির পথের’ সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কৌতূহলজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল (চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী) অঞ্চলে পাহাড় থেকে নির্গত পানির ক্ষুদ্র নালাকে ‘ছড়া’ বা ‘ছড়ি’ (যেমন: খাগড়াছড়ি, মাগুরছড়া) বলা হয়, যা সেমেটিক ভাষার ‘শরাহ’ শব্দেরই অপভ্রংশ বলে অনুমান করা হয়।
পবিত্র কোরআনে ‘শরিয়াহ’ ও এর সমার্থক ‘শিরআহ’ শব্দ দুটি মাত্র একবার করে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্তত চারটি আয়াতে এই শব্দের বিভিন্ন রূপ দেখা যায়। সুরা শুরার ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন: “তিনি তোমাদের জন্যে দীনের ক্ষেত্রে সেই পথই (শারাআলাকুম) নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে… এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে-তোমরা দীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না।”
এখানে আল্লাহ ‘শরিয়াহ’ প্রদানের কথা যেমন বলেছেন, তেমনি ‘দীন’ প্রতিষ্ঠার নির্দেশও দিয়েছেন। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে শরিয়াহ ও দীন দুটি আলাদা বিষয়।
দীন ও শরিয়াহ: পার্থক্য ও সম্পর্ক
‘দীন’ অর্থ হলো সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা বা সিস্টেম (System of life)। ইসলামের শুরু হয় তওহীদ তথা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ঘোষণার মাধ্যমে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো হুকুমদাতাকে স্বীকার না করাই হলো দীনের ভিত্তি। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যে অর্থব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে-তার নামই দীন।
দীনের দুটি দিক রয়েছে: একটি জাগতিক (শরিয়ত), অন্যটি আধ্যাত্মিক (মারেফত)। দীনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানবজীবন থেকে অন্যায়-অবিচার দূর করে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। আর ‘শরিয়াহ’ হলো সেই দীনের অন্তর্ভুক্ত কিছু সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় বিধি-বিধান বা আইন।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যায়। ‘দীন’ যদি একটি রাজ্য হয়, তবে সেই রাজ্যের মানচিত্র ও ট্রাফিক আইনগুলো হলো ‘শরিয়াহ’। আর এই রাজ্যে চলার সময় সর্বদা এর মালিকের কথা স্মরণে রাখাই হলো ‘মারেফত’। সুরা শুরার সেই আয়াতে আল্লাহ নবীকে (সা.) বলেছেন আগে ‘দীন’ প্রতিষ্ঠা করতে, অর্থাৎ ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের রাজ্য কায়েম করতে। সেই রাজ্যে নাগরিকরা কীভাবে চলবে, তার বিধিবদ্ধ নিয়মই হলো শরিয়াহ।
কেন আগে দীন প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন?
বর্তমানে আমাদের দেশে আল্লাহর তওহীদভিত্তিক দীন প্রতিষ্ঠা না করেই কেবল শরিয়াহ আইন চালুর দাবি তোলা হয়। এটি অনেকটা কোনো ভূখণ্ড ছাড়াই কেবল ট্রাফিক আইন কার্যকর করার চেষ্টার মতো। আল্লাহ প্রথমে হেদায়াহ ও সত্যদীন দিয়ে রাসূলকে (সা.) পাঠিয়েছেন এটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য। দীন প্রতিষ্ঠার পরই আল্লাহর দেওয়া শরিয়াহ মোতাবেক ফায়সালা করার প্রশ্ন আসে।
দীন একটি বৃহৎ ধারণা। এর প্রাথমিক শর্ত হলো তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ একটি জাতি বা ‘উম্মাহ’ গঠন করা, যারা একজন নেতার (ইমাম) নির্দেশে পরিচালিত হবে। এই ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন ছাড়া শরিয়াহ প্রতিষ্ঠার দাবি অর্থহীন। যখন একটি জাতি গঠিত হবে এবং আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে, তখন অভ্যন্তরীণ সমস্যা মেটানোর জন্য যে আদালত স্থাপিত হবে, সেখানে বিচারক অপরাধীকে আল্লাহর দেওয়া দণ্ড প্রদান করবেন-আর সেটিই হবে শরিয়াহর প্রয়োগ।
যতদিন রাষ্ট্রব্যবস্থা পাশ্চাত্যের তৈরি বা মানবরচিত আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, সেখানে খণ্ডিতভাবে শরিয়াহ আইন চালু করার কোনো মানে নেই। এমনটি করা হলেও ইসলামের মূল উদ্দেশ্য-অর্থাৎ সামগ্রিক শান্তি ও ন্যায়বিচার-কখনও অর্জিত হবে না। সুতরাং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আগে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ ‘দীন’ প্রতিষ্ঠা করা, যার অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবেই ‘শরিয়াহ’ কার্যকর হবে।

