NEW জেলা অনুযায়ী সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬
হোম » আকিদা » শরিয়ত ও মারেফত: ইসলামের দেহ ও আত্মা

শরিয়ত ও মারেফত: ইসলামের দেহ ও আত্মা

auth Deenul Haq ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৪ মিনিটে পড়ুন
feature

মানুষ কেবল রক্ত-মাংসের তৈরি একটি দেহসর্বস্ব জীব নয়। তার যেমন একটি নশ্বর দেহ আছে, তেমনি আছে এক অবিনশ্বর আত্মা। দেহের যেমন জাগতিক চাহিদা রয়েছে, তেমনি আত্মারও রয়েছে আধ্যাত্মিক ক্ষুধা। দেহ ও আত্মার সমন্বয়েই একজন পরিপূর্ণ মানুষ। স্রষ্টা প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা ‘ইসলাম’ ঠিক এই আদর্শেই গঠিত-যেখানে শরিয়াহ (বিধিবিধান) এবং মারফত (আধ্যাত্মিকতা) এক নিখুঁত ভারসাম্যে অবস্থান করে। মানবরচিত শাসনব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে ইসলামের প্রধান পার্থক্য এখানেই যে, এতে আইন-কানুন, অর্থনীতি ও দণ্ডবিধির পাশাপাশি মানুষের আত্মিক প্রশান্তি ও নৈতিক উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ সমাধান রয়েছে।

তওহীদ ও আধ্যাত্মিকতার সূচনা

কালেমা তাইয়্যেবা বা তওহীদের ঘোষণার মাধ্যমেই একজন মো’মেনের হৃদয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের উপলব্ধি জাগ্রত হয়। সে কেবল মুখে নয়, বরং অন্তরের অন্তস্থল থেকে আল্লাহকে একমাত্র ‘ইলাহ’ বা বিধানদাতা হিসেবে মেনে নেয়। নিজের সমস্ত ভক্তি, ভালোবাসা ও আনুগত্য একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করাই হলো আধ্যাত্মিকতার প্রথম ধাপ। এরপর যখন সে প্রাত্যহিক জীবনে আল্লাহর দেওয়া আইন ও বিধানগুলো মেনে চলতে শুরু করে, তখনই তার মধ্যে ‘শরিয়াহ’র প্রতিফলন ঘটে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) শরিয়ত ও মারফতের এই অপূর্ব সমন্বয়ে এক বৈষম্যহীন ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম একদিকে যেমন আধ্যাত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ ছিলেন, অন্যদিকে তেমনি জাগতিকভাবে সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। এই ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান তাঁদের আরবের বর্বর জাতি থেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করেছিল। তাঁদের আত্মিক উন্নতি এতটাই প্রবল ছিল যে, কোনো অপরাধ করে ফেললে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা সত্ত্বেও তাঁরা আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয়ে অস্থির হয়ে পড়তেন এবং অনুতপ্ত হয়ে নিজেরাই বিচারকের সামনে গিয়ে দণ্ড প্রার্থনা করতেন। ইসলামের পরিভাষায় এই আত্মিক শক্তির নামই হলো ‘তাকওয়া’।

ভারসাম্যহীনতা ও বর্তমান সংকট

পরিতাপের বিষয় হলো, উম্মতে মোহাম্মদী যখন অনৈক্যে বিভক্ত হয়ে পড়ল, তখন ইসলামের এই সুসমন্বিত রূপটিও বিকৃত হয়ে গেল। বর্তমানে আমরা মুসলিম জাতির মধ্যে দুটি চরমপন্থী ধারা লক্ষ করি। একদল মাদ্রাসা-কেন্দ্রিক শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে শরিয়তের খুঁটিনাটি ও বাহ্যিক বিষয় নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে ব্যস্ত, কিন্তু জাতীয় জীবনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও হুকুম অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে তাদের কোনো উদ্বেগ নেই। অন্যদিকে, সুফিবাদী বা মারেফতি ঘরানার অন্য একটি দল কেবল আধ্যাত্মিক তরিকা ও তসবিহ-জিকির নিয়ে নির্জনতায় মগ্ন। মানবসমাজ যখন অন্যায়, অবিচার ও অশান্তির দাবানলে জ্বলছে, তখন তাঁরা নির্বিকার। এটি মূলত সেই ভারসাম্যহীন সুফিবাদ, যা পারস্য বিজয়ের পর বাহ্যিক প্রভাবে মুসলিম সমাজে বিস্তার লাভ করেছিল।

প্রকৃত মারেফত ও জেহাদের গুরুত্ব

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রদর্শিত পথে প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা বা মারেফত মানে হলো-জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর উপস্থিতিকে অনুভব করা। আল্লাহ আমার সবকিছু দেখছেন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর সামনে আমাকে প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে-এই সচেতনতার নামই হলো ‘জিকির’ বা আল্লাহর স্মরণ। নিজেকে যাবতীয় অন্যায় থেকে দূরে রাখার পাশাপাশি নিজের জীবন, সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের মায়া ত্যাগ করে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত থাকাই হলো প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা।

একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী মুসলিম জাতির চরিত্র থেকে সংগ্রামী চেতনা মুছে ফেলার জন্য ‘আত্মার বিরুদ্ধে সংগ্রামই বড় জেহাদ’-এমন অনেক উক্তিকে রাসূলের হাদিস হিসেবে প্রচার করেছে। অথচ হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানির মতো প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণ একে হাদিস হিসেবেই স্বীকার করেননি। বরং পবিত্র কোরআনের সুরা ফোরকানের ৫২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, সত্য অস্বীকারকারী ও জালেমদের বিরুদ্ধে কঠোর ও চূড়ান্ত সংগ্রাম (জেহাদ) চালিয়ে যাওয়াই হলো ‘জেহাদে আকবর’ বা বড় জেহাদ।

বর্তমান সময়ের দাবি

আজ বিশ্বজুড়ে মানবতা চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানুষ কেবল আইনের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। এমন সংকটে প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা ও শরিয়াহর সমন্বয় অনিবার্য। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা তুলে ধরা, যা মানুষকে একদিকে করবে আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ ও পরম আস্থাবান মো’মেন; অন্যদিকে তাকে গড়ে তুলবে সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এক নির্ভীক যোদ্ধা হিসেবে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, এই বাংলা ভূখণ্ডে ইসলাম প্রচারের জন্য যে মহান সুফি-সাধক ও পীর-দরবেশগণ এসেছিলেন-যেমন শাহজালাল (রহ.), শাহ পরান (রহ.), শাহ মাখদুম (রহ.), বাবা আদম কাশ্মীরি (রহ.) প্রমুখ-তাঁরা কেবল আধ্যাত্মিক জগতেই কামেল ছিলেন না, বরং তাঁরা ছিলেন জালেমের বিরুদ্ধে রণজয়ী যোদ্ধা। আধ্যাত্মিকতা ও সংগ্রামের এই নিখুঁত ভারসাম্যই হলো ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য। পক্ষান্তরে, সমাজের অবক্ষয় ও মানুষের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি উদাসীন থেকে যারা কেবল নির্জন সাধনা বেছে নিয়েছেন, তাঁরা কখনো স্রষ্টার প্রকৃত সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন করতে পারবেন না। প্রকৃত মুক্তি নিহিত আছে ইসলামের দেহ ও আত্মা অর্থাৎ শরিয়ত ও মারফতের সার্থক মেলবন্ধনের মধ্যে।

টপিক: আধ্যাত্মিকতাতাকওয়াভারসাম্যমারেফতশরিয়ত
লেখক পরিচিতি
Author

Deenul Haq

সম্পাদক
কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান প্রচার এবং দ্বীনি দাওয়াতের একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। আমাদের সাথে থাকুন আপনার ঈমানি যাত্রায়।
×
QR কোড স্ক্যান করুন