মো’মেনের লক্ষ্য অর্জনে সওমের ভূমিকা
সওম (রোজা) শব্দের অর্থ বিরত থাকা অর্থাৎ আত্মসংযম (Self Control)। রমজান মাসে মো’মেন সারাদিন সওম রাখবে অর্থাৎ পানাহার ও জৈবিক চাহিদা পূরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখবে এবং এর মাধ্যমে নিজের আত্মাকে শক্তিশালী করবে। সে অপচয় করবে না, মিথ্যা বলবে না এবং পশুর মতো কেবল উদরপূর্তি করবে না। সে হবে নিয়ন্ত্রিত, ত্যাগী, নিজের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গকারী এবং আল্লাহর হুকুম মানার ক্ষেত্রে সদাজাগ্রত। নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সে তার মন ও আত্মাকে সুদৃঢ় করবে। প্রশ্ন হতে পারে, মো’মেনের কেন মনের ওপর এমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন? এর উত্তর আল্লাহ দিয়েছেন- “যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সুরা বাকারা ১৮৩)।
তাকওয়া হলো অত্যন্ত সাবধানে ও সতর্কতার সাথে জীবনের পথ চলা। আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করা এবং যা তিনি নিষেধ করেছেন তা বর্জন করা। এটি করতে হলে প্রবৃত্তির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা আবশ্যক। যিনি এই তাকওয়া অবলম্বন করেন, তিনি হলেন ‘মুত্তাকী’। আল্লাহর দৃষ্টিতে মো’মেনের মর্যাদার একমাত্র মাপকাঠি হলো এই তাকওয়া। যিনি প্রতিটি কাজে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের বিচার-বিবেচনা করেন এবং বৈধ পথ অবলম্বন করেন, তিনিই মুত্তাকী। সুতরাং সওমের মূল উদ্দেশ্য হলো মো’মেনকে মুত্তাকী হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাকে তাকওয়া অর্জনে সহায়তা করা। এর মাধ্যমে মো’মেনের জীবনের চলার পথ হয় মার্জিত এবং তার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন সহজ হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই লক্ষ্য কী?
নবী করিম (সা.)-এর জীবনের লক্ষ্য ছিল-আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধান মোতাবেক মানবজাতিকে পরিচালিত করে সমাজে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। একারণেই এই দীনের নাম রাখা হয়েছে ‘ইসলাম’, যার অর্থ শান্তি। আল্লাহ বলেছেন, তিনি সঠিক পথনির্দেশ (হেদায়াহ) ও সত্যদীনসহ স্বীয় রসুল প্রেরণ করেছেন যেন রসুল (সা.) একে সকল দীনের উপর বিজয়ী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন (সুরা তওবা ৩৩, সুরা ফাতাহ ২৮, সুরা সফ ৯)। সেই সত্যদীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো প্রত্যেক মো’মেনের ওপর ফরজ বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। এটিই একজন মো’মেনের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
কিন্তু এই মহান লক্ষ্য অর্জন করতে হলে মো’মেনের চরিত্রে কিছু বিশেষ গুণ ও বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন। এই চারিত্রিক, মানসিক ও আত্মিক শক্তি অর্জনের জন্যই আল্লাহ ইবাদতের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রেখেছেন। সালাহ, সওম, হজ ও জাকাত-এগুলো মূলত প্রশিক্ষণের একেকটি মাধ্যম। এগুলোর মাধ্যমেই মো’মেনের চরিত্রে প্রয়োজনীয় গুণাবলি অর্জিত হয়, যা তাকে মানবসমাজ থেকে অন্যায় ও অশান্তি দূর করার যোগ্য করে তোলে।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যায়। একটি গাড়ির মূল উদ্দেশ্য হলো যাত্রী বহন করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া। এই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য গাড়িতে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ (Parts) থাকে। চাকা, পিস্টন, স্টিয়ারিং বা ইঞ্জিনের উদ্দেশ্য আলাদা আলাদা হলেও তাদের সবার সম্মিলিত গন্তব্য হলো গাড়িটির গতিশীলতা নিশ্চিত করা। গাড়িটি যদি অচল হয়ে গ্যারেজে পড়ে থাকে, তবে এর যন্ত্রাংশগুলো আলাদাভাবে যতই ভালো থাকুক না কেন, তা অর্থহীন। একইভাবে ইসলামের একটি সামগ্রিক উদ্দেশ্য আছে-তা হলো সমাজে শান্তি বজায় রাখা। মানবসমাজে যদি শান্তি ও ন্যায়বিচারই না থাকে, তবে ইসলামের ব্যক্তিগত আমলগুলো লক্ষ্যহীন হয়ে পড়ে।
গাড়ির যন্ত্রাংশের মতো ‘দীনুল হক’ বা ইসলামের প্রতিটি বিষয়ের ভিন্ন ভিন্ন প্রশিক্ষণের দিক আছে, কিন্তু মূল লক্ষ্য এক ও অভিন্ন। যেমন সালাতের উদ্দেশ্য হলো মো’মেনের চরিত্রে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও আনুগত্য সৃষ্টি করা; জাকাতের উদ্দেশ্য সমাজে অর্থের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং হজের উদ্দেশ্য হলো মুসলিম উম্মাহর জাতীয় বাৎসরিক সম্মেলন। একইভাবে সওম বা রোজাও মো’মেনের চরিত্রে একটি নির্দিষ্ট ও সুগভীর শিক্ষা দিয়ে থাকে। সওম কীভাবে মো’মেনকে পূর্ণতা দান করে, পরবর্তী লেখায় ইনশাআল্লাহ সে বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।