NEW জেলা অনুযায়ী সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬
হোম » রাষ্ট্রব্যবস্থা » তওহীদভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র: উম্মতে ম...
আধুনিক প্রতিরক্ষা ও গণবাহিনীর রূপরেখা

তওহীদভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র: উম্মতে মোহাম্মদীর সামরিক কাঠামো

auth Deenul Haq ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৫ মিনিটে পড়ুন
feature

৬৪১ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমরা মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া জয় করার পর বিজিত কপটিক খ্রিষ্টানরা মুসলিম বাহিনীর সম্মানে একটি ভোজের আয়োজন করেন। ভোজে বিভিন্ন পদমর্যাদার সৈন্যদের জন্য আলাদা আলাদা আসন নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু যখন ভোজ শুরু হয়, তখন আপ্যায়নকারীরা আবিষ্কার করেন যে, মুসলিম সেনাপ্রধান আমর ইবনুল আস (রা.) এবং অন্যান্য অধিনায়করা সাধারণ সৈন্যদের সঙ্গে একত্রে বসে ভোজন করছেন। ইসলামের এই বিরল সাম্যনীতি দেখে তাঁরা মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়ে যান।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এই জীবনব্যবস্থার অনুসারীদেরকে আল্লাহ একটি ‘উম্মাহ’ বলে অভিহিত করেছেন। একটি জাতির সদস্যদের ব্যক্তিজীবনের আচার-আচরণ নিয়ে যেমন এই ব্যবস্থায় নির্দেশনা রয়েছে, তেমনি জাতির সামরিক বিষয় ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। ইসলামে নামাজ যেমন ফরজ, রোজা যেমন ফরজ, যুদ্ধও তেমন ফরজ। প্রশ্ন হচ্ছে-যুদ্ধের উদ্দেশ্য কী হবে? সেটিও পবিত্র কোর’আনে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে; আর তা হচ্ছে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

দুটো আয়াতের উদাহরণ দিয়ে উদ্দেশ্যটি বর্ণনা করছি। সুরা আনফালের ৩৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাও যে পর্যন্ত ফেতনা নির্মূল না হয়।’ এই আয়াত থেকে সুস্পষ্ট হয় যে ফেতনা, ফাসাদ, অন্যায়-অবিচার, যুদ্ধ ও রক্তপাত বন্ধ করার জন্য সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া আল্লাহর নীতি। আবার সুরা নিসার ৭৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কী হল যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করছ না নিপীড়িত নির্যাতিত (মুস্তাদ’আফিন) সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে, যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদিগকে এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর; এখানকার অধিবাসীরা যে, অত্যাচারী! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষালম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও।’

শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সকল উপায় ব্যর্থ হয়, তখন যুদ্ধ অবধারিত হয়ে যায়। এটি একটি চিরন্তন সত্য যা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও যৌক্তিক। তাই সুপ্রাচীনকাল থেকে প্রত্যেক জাতি ও সভ্যতায় সামরিক বাহিনীর ব্যবস্থা ছিল। বর্তমানে আমরা একে ‘প্রতিরক্ষা বাহিনী’ বলে থাকি। প্রচলিত পদ্ধতিতে সামরিক ও বেসামরিক এই দুটো স্পষ্ট ভাগ থাকলেও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে জাতিরক্ষার দায়িত্ব উম্মাহর প্রত্যেকের। রসুলাল্লাহর যুগে কেবল নির্দিষ্ট সংখ্যক কিছু ব্যক্তিকে যুদ্ধে পাঠানো হয়নি, বরং গোটা জাতিকেই তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যুদ্ধের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে হয়েছে। এমনকি নারী ও শিশু-কিশোররাও এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে; ঠিক যেভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আপামর জনতা প্রশিক্ষণ নিয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল।

ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশরা সামরিক শক্তিবলে এই উপমহাদেশ দখল করার পর এখানে এক প্রকার নিরস্ত্রীকরণ ও নিবীর্যকরণ (Disarmament and demoralization) প্রক্রিয়া চালু করেছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর তারা ব্যাপকভাবে নিরস্ত্রীকরণ কার্যক্রম শুরু করে। এদেশের মানুষ যেন কেবল ব্যক্তিগত জীবনের বাইরে জাতীয় চিন্তাভাবনায় না জড়ায়, সেজন্য তারা শিক্ষাব্যবস্থা ও ভাড়াটে আলেমদের মাধ্যমে মুসলিমদের সামরিক চেতনাকে লুপ্ত করে দেয়। ব্রিটিশরা ক্যান্টনমেন্ট স্থাপন করে সীমিত সংখ্যক ভারতীয়কে বেতনভুক্ত সৈন্যে পরিণত করেছিল, যা মূলত ব্রিটিশ শাসনকে সুসংহত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু ইসলামের সিস্টেম হলো সমগ্র জাতিকেই সামরিক প্রশিক্ষণ ও দেশরক্ষার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা। রসুলাল্লাহর যুগে এমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না যে জাতির একটি ক্ষুদ্র অংশ নিরাপত্তা দেবে আর বাকিরা নির্বিকার থাকবে। তিনি জাতির সকল সক্ষম সদস্যকে একটি ন্যূনতম সামরিক শৃঙ্খলা ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, যাকে আধুনিক যুগে ‘গণবাহিনী’ (Militia) বলা হয়।

বর্তমানে সামরিক ব্যবস্থাপনা বহুলাংশে প্রযুক্তিনির্ভর এবং অত্যাধুনিক। তাই বাছাই করা একটি নিয়মিত বাহিনী থাকতে হবে যারা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের জ্ঞান হাসিল করবে এবং সামরিক নেতৃত্ব দেবে। তবে সমগ্র জাতির সক্ষম নারী ও পুরুষকেও মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ তথা সামরিক শৃঙ্খলা, যোগাযোগ প্রযুক্তি, অস্ত্রচালনা ও আত্মরক্ষার কৌশলে প্রশিক্ষিত হতে হবে। তারা বহিঃশত্রুর হাত থেকে নিজ জাতিকে রক্ষা করার পাশাপাশি বিশ্বের যেখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে, সেখানেই শান্তি প্রতিষ্ঠার ভূমিকা রাখবে। আজ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে যা করা হচ্ছে, তা আদতে একটি ঐশী দায়িত্ব। কারণ আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি হেদায়াহ ও সত্যদীন সহকারে আমার রসুলকে প্রেরণ করেছি যেন তিনি অন্যান্য সকল দীনের (জীবনবিধান) উপর একে বিজয়ী করেন।’ (সুরা ফাতাহ ৪৮:২৮, সুরা সফ ৬১:৯, সুরা তওবা ৯:৩৩)।

এই শান্তি মিশন কেবল জাতিসংঘের অধীনে নয়, বরং স্বতন্ত্র উদ্যোগেও হতে পারে। এই কাজে যারা জীবন উৎসর্গ করবেন, ইসলামে তাঁদেরকেই ‘শহীদ’ বলা হয়েছে এবং তাঁদের মৃত বলতে নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে তাঁরা জীবিত এবং রিজিকপ্রাপ্ত। ইসলামি রাষ্ট্র এই শহীদদের পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তবে মনে রাখতে হবে, সামরিক কর্মকাণ্ড কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত নয়, এটি সম্পূর্ণভাবে সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার তার প্রতিবেশী দেশ সুইজারল্যান্ডকে আক্রমণ না করার অন্যতম কারণ ছিল তাদের ‘মিলিশিয়া সিস্টেম’। তারা সাধারণ নাগরিকদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে এমন এক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল যা বিদেশি শক্তির জন্য ছিল হুমকিস্বরূপ। বর্তমানে ইসরায়েল, ফিনল্যান্ড, তুরস্ক, নরওয়ে, সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো এই সশস্ত্র নাগরিক ব্যবস্থার জন্য পরিচিত। এই আদর্শিক ও সামরিক শৃঙ্খলা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় অত্যন্ত জরুরি।

ইসলামি রাষ্ট্র ও তার প্রতিরক্ষা কৌশল নিম্নরূপ হতে পারে:
১. নাগরিকদের বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ: সকল নাগরিককে বাধ্যতামূলক সামরিক শৃঙ্খলার আওতায় আনা হবে। একটি নিয়মিত বিশেষজ্ঞ বাহিনীর পাশাপাশি সক্ষম সকল নারী-পুরুষকে দেশপ্রেম ও ঈমানি চেতনায় অনুপ্রাণিত করে মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
২. আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় ভূমিকা: প্রতিরক্ষা বাহিনী নিজ জাতির নিরাপত্তার পাশাপাশি বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের পক্ষে শান্তি প্রতিষ্ঠার ভূমিকা রাখবে। প্রয়োজনে স্বতন্ত্র উদ্যোগে আন্তর্জাতিক শান্তি মিশনে অংশগ্রহণ করবে।
৩. সামরিক কর্মকাণ্ড সার্বভৌমত্বের অধীন: সামরিক বাহিনীর যাবতীয় কার্যক্রম সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে এবং সেনাপ্রধান সরাসরি রাষ্ট্রপ্রধানের অধীনে থাকবেন। কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তি অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার পাবে না।
৪. যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও ক্ষতিপূরণ: সামরিক বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বা ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রাপ্ত অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হবে।
৫. শ্রেণি বৈষম্য হ্রাস: অফিসার ও সাধারণ সেনাদের মধ্যে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য দূর করা হবে। অফিসাররা যোগ্যতার ভিত্তিতে বেশি বেতন পেলেও সাধারণ সৈন্যদের জন্য একটি ন্যায্য ও সম্মানজনক ব্যবস্থা থাকবে। প্রতিটি সৈনিকের পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী রেশন ও ভাতার ব্যবস্থা করা হবে, যাতে সামরিক বাহিনীতে কোনো অসন্তোষের সৃষ্টি না হয়।

টপিক: উম্মাহগণবাহিনীজিহাদট্রেনিংপ্রতিরক্ষা
লেখক পরিচিতি
Author

Deenul Haq

সম্পাদক
কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান প্রচার এবং দ্বীনি দাওয়াতের একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। আমাদের সাথে থাকুন আপনার ঈমানি যাত্রায়।
×
QR কোড স্ক্যান করুন