NEW জেলা অনুযায়ী সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬
হোম » সওম » সওম (রোজা) কী, সওম কার জন্য?

সওম (রোজা) কী, সওম কার জন্য?

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাত ০৩.৩৬ ৫ মিনিটে পড়ুন Deenul Haq
feature

সওমের গূঢ় উদ্দেশ্য জানার আগে আমাদের এটি জেনে নেওয়া প্রয়োজন যে, পবিত্র কোর’আনে উল্লেখিত ‘সওম’ শব্দটি আমাদের সমাজে ‘রোজা’ শব্দে পরিণত হলো কীভাবে? বর্তমান এই উপমহাদেশে আমরা সওম বা সিয়ামের বদলে ‘রোজা’ শব্দটিতে এতই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, ‘সওম’ বললে অনেকে এর প্রকৃত অর্থই বুঝতে পারেন না। মূলত পবিত্র কোর’আনে ‘রোজা’ শব্দটির কোনো অস্তিত্ব নেই; কারণ কোর’আন অবতীর্ণ হয়েছে আরবি ভাষায়, আর রোজা হলো একটি ফার্সি শব্দ। কেবল নামাজ বা রোজাই নয়, খোদা, বেহেশত, দোজখ, ফেরেশতা, মুসলমান, পয়গম্বর-এমন অনেক ফার্সি শব্দ আমরা ব্যবহার করি যা মূলে কোর’আনিক শব্দ নয়। মুসলিম বিশ্বের মধ্যে কেবল ইরান এবং এই উপমহাদেশেই এসব শব্দের ব্যাপক প্রচলন দেখা যায়।

এর কারণ হলো ঐতিহাসিক। প্রাচীন পারস্য বা ইরান একসময় অগ্নি-উপাসকদের দেশ ছিল। তৎকালীন অন্যতম বিশ্বশক্তি এই ইরান যখন ক্ষুদ্র উম্মতে মোহাম্মদীর কাছে সামরিকভাবে পরাজিত হলো, তখন প্রায় পুরো জাতিটিই অল্প সময়ের মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করে। তবে এই গণ-ধর্মান্তরের ফলে তাদের পূর্বতন ধর্মীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অনেক অনুষঙ্গও ইসলামের ভেতর প্রবেশ করে। ইরানিরা তাদের অগ্নি-উপাসনার উপাসনা পদ্ধতিকে ‘নামাজ’ বলত; ফলে তারা সালাহ্-কে ‘নামাজ’ বলতে শুরু করল। তাদের ধর্মে উপবাস পালনের রীতি ছিল, তাই তারা সওমকে ফার্সি ভাষায় ‘রোজা’ বলতে লাগল। এভাবেই জান্নাতকে বেহেশত, জাহান্নামকে দোজখ এবং আল্লাহকে খোদা নামে ভাষান্তর করা হলো। পরবর্তীতে মুসলিম শাসকরা যখন ইরান হয়ে এই উপমহাদেশে প্রবেশ করেন, তখন প্রশাসনিক ভাষা ফার্সি হওয়ার কারণে এই শব্দগুলো আমাদের ভাষায় স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়। অর্থাৎ আরবের অকৃত্রিম ইসলাম পারস্যের মধ্য দিয়ে আসার পথে সেখানকার কৃষ্টি ও ভাষার রঙে রঙিন হয়ে এসেছে।

সওমের নিয়ম-নীতি ও পদ্ধতি

সওম পালনের সঠিক পদ্ধতি ও এর প্রেক্ষাপট বুঝতে পবিত্র কোর’আনের কয়েকটি আয়াতের সরল অনুবাদই যথেষ্ট:

১. “হে মো’মেনগণ! তোমাদের উপর সওম ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সুরা বাকারা ১৮৩)। অর্থাৎ সওমের মূল লক্ষ্য হলো মুমিনের মধ্যে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে সতর্কতার সাথে চলার চারিত্রিক গুণ বা তাকওয়া সৃষ্টি করা।

২. “গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুস্থ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে।” (সুরা বাকারা ১৮৪)। অসুস্থ ও ভ্রমণরত অবস্থায় সওম রাখার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে, তবে পরবর্তীতে তা পূরণ করতে হবে।

৩. “রোজার রাতে তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করা তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ। আল্লাহ অবগত রয়েছেন যে, তোমরা আত্মপ্রতারণা করছিলে, সুতরাং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন এবং তোমাদের অব্যাহতি দিয়েছেন। অতঃপর তোমরা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর এবং যা কিছু তোমাদের জন্য আল্লাহ দান করেছেন, তা আহরণ কর। আর পানাহার কর যতক্ষণ না কালো রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। অতঃপর রোজা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত। আর যতক্ষণ তোমরা এতেকাফ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান কর, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সাথে মিশো না। এই হলো আল্লাহ কর্তৃক বেঁধে দেয়া সীমানা। অতএব, এর কাছেও যেও না। এমনিভাবে বর্ণনা করেন আল্লাহ নিজের আয়াত সমূহ মানুষের জন্য, যাতে তারা বাঁচতে পারে।” (সুরা বাকারা ১৮৭)। এখানে সওম অবস্থায় দিনের বেলায় জৈবিক চাহিদা ও পানাহার থেকে বিরত থাকার সুনির্দিষ্ট সীমারেখা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) সওমের গুরুত্ব ও এর নৈতিক দিক নিয়ে বলেছেন, “কেউ যদি রোজা রেখেও মিথ্যা কথা বলা ও খারাপ কাজ পরিত্যাগ না করে তবে তার শুধু পানাহার ত্যাগ করা (অর্থাৎ উপবাস ও তৃষ্ণার্ত থাকা) আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” (বুখারী)। এছাড়া তিনি রমজান মাসে পরোপকার ও রোজাদারকে ইফতার করানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন, যা গুনাহ মাফ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

সওমের আকিদাহ ও উদ্দেশ্য

তাকওয়া অর্জন:

ইসলামের প্রতিটি হুকুমের একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে। যেমন একটি গাড়ির প্রতিটি যন্ত্রাংশের আলাদা আলাদা কাজ থাকলেও সবার সম্মিলিত উদ্দেশ্য হলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত নিশ্চিত করা। ঠিক তেমনিভাবে নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতেরও পৃথক উদ্দেশ্য আছে, যা মূলত ইসলামের সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখে। সওমের ক্ষেত্রে সেই উদ্দেশ্যটি হলো-তাকওয়া অর্জন।

তাকওয়া মানে হলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা মেনে জীবন পরিচালনা করা। প্রবৃত্তি বা নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এটি অর্জন অসম্ভব। সওম বা রোজা মুমিনকে মুত্তাকি তথা সতর্ক পথচারী হিসেবে গড়ে তোলে।

সওম কার জন্য?

কোর’আনে সওমের নির্দেশ শুরু হয়েছে “হে মো’মেনগণ” সম্বোধনের মাধ্যমে। অর্থাৎ এটি মুমিনদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ। কোর’আনের সংজ্ঞা অনুযায়ী মুমিন তারাই যারা আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে মেনে নিয়ে সম্পদ ও জীবন দিয়ে তাঁর রাস্তায় জেহাদ বা সর্বাত্মক সংগ্রাম করে (সুরা হুজরাত ১৫)। যারা এই সংগ্রামের ব্রত গ্রহণ করেছে, তাদের আত্মিক ও চারিত্রিক শক্তি বৃদ্ধি করতেই সওমের বিধান দেওয়া হয়েছে।

মুমিনের লক্ষ্য অর্জনে সওমের ভূমিকা

সওম শব্দের আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা বা আত্মসংযম। রমজান মাসে মুমিন পানাহার ও জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত থেকে তার আত্মাকে শক্তিশালী করে। সে মিথ্যা, অপচয় ও পশুত্বের স্বভাব বর্জন করে ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়। আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর জীবনের লক্ষ্য ছিল আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সমাজে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। প্রত্যেক মুমিনের লক্ষ্যও তাই হওয়া উচিত। এই মহান বিপ্লব সফল করতে হলে মুমিনের চরিত্রে কিছু বিশেষ গুণাবলি প্রয়োজন, যা অর্জনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হলো সালাহ, সওম ও হজ।

একটি গাড়ির ইঞ্জিন যেমন শক্তি উৎপাদন করে কিন্তু স্টিয়ারিং ছাড়া তা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না, তেমনি ইবাদতগুলো যদি সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার সেই মূল লক্ষ্যের সাথে যুক্ত না থাকে, তবে তা পণ্ডশ্রমে পরিণত হয়। সওম মুমিনকে ত্যাগের শিক্ষা দেয়। এটি ভোগবাদী মানসিকতার লাগাম টেনে ধরে আত্মাকে নিয়ন্ত্রিত করে। এই ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণ যখন মুমিনের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়, তখন সে সমাজ ও মানবতার জন্য নিজের জান-মাল উৎসর্গ করতে দ্বিধাবোধ করে না। ফলে এমন একটি সমাজ গড়ে ওঠে যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে আগ্রহী হয়।

বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে রমজান মাস এলে ইফতার ও সেহরির হুলুস্থুল আয়োজন এবং তাত্ত্বিক আলোচনার জোয়ার দেখা যায়। কিন্তু সওমের প্রকৃত উদ্দেশ্য-তাকওয়া-আমাদের সমাজে কতটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। যদি সওম পালন করার পরও আমাদের চরিত্রে পরিবর্তন না আসে, সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার দূর না হয় এবং আমরা যদি আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ না নিই, তবে আমাদের রোজা কেবল উপবাস ও পিপাসার কষ্টে পর্যবসিত হবে। সুতরাং সওমের সঠিক আকিদাহ বুঝে একে একটি আদর্শিক প্রশিক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করাই হবে আমাদের প্রকৃত সফলতা।

লেখক পরিচিতি
Deenul Haq

Deenul Haq

কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান প্রচার এবং দ্বীনি দাওয়াতের একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। আমাদের সাথে থাকুন আপনার ঈমানি যাত্রায়।
×
QR কোড স্ক্যান করুন