সমাজে সওমের (রোজার) কী প্রভাব পড়ছে?
আল্লাহর রসুল বলেছেন, “এমন একটা সময় আসবে যখন রোযাদারদের রোযা থেকে ক্ষুধা ও পিপাসা ব্যতীত আর কিছু অর্জিত হবে না। আর অনেক মানুষ রাত জেগে নামাজ আদায় করবে, কিন্তু তাদের রাত জাগাই সার হবে (অর্থাৎ নামাজ কবুল হবে না) (ইবনে মাজাহ, আহমাদ, তাবারানী, দারিমি, মেশকাত)।” এই হাদীসে যাদের কথা বলা হচ্ছে তারা কিন্তু রোজার যথাযথ নিয়ম-কানুন পূর্ণ করে ক্ষুধা ও পিপাসার যন্ত্রণা সহ্য করেই রোজা রাখবে, তবু তাদের রোজা আল্লাহর দরবারে কবুল না হবার কারণ কী? এর কারণ আমাদের বাস্তব সমাজেই মিলবে।
আজকে আমরা যদি সত্যিকার রোজাদার হতাম, সংযমী হতাম, তাহলে একটা মুসলিমপ্রধান দেশে কীভাবে ১১ মাস খাদ্যদ্রব্যের দাম কম থাকে আর রোজার মাসে বাড়ে? রসুলাল্লাহ (সা.) এবং সাহাবী ও তাবে-তাবেয়ীনদের যুগে রমজান মাসে বাজার দর সবচেয়ে মন্দা যেত। পণ্যসামগ্রীর চাহিদা থাকতো সবচেয়ে কম। তাঁরা নিজের জন্য ভোগ্যপণ্য কেনাকাটা না করে ঘুরে ঘুরে গরীব দুঃখীদের দান সদকা করতেন। আর বর্তমানে রমজান মাস আসলেই চাল, ডাল, আটা, চিনি, লবণ, পেঁয়াজ, রসুন, তেল-এগুলোর মূল্য ধাঁই ধাঁই করে বেড়ে চলে। অর্থাৎ যা করা হচ্ছে তা প্রকৃত ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। সংযমের কোনো চিহ্নই থাকে না, বরং অন্য সময়ের চেয়ে খাওয়ার পরিমাণ ও ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ বলেছেন, “যারা কুফরী করেছে তারা ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থাকে এবং পশুর মত আহার করে। তাদের ঠিকানা হল জাহান্নাম (সূরা মোহাম্মদ ১২)।”
সওমের মাসে যদি সতিকার অর্থে সংযম থাকত, তবে মুসলিম বিশ্বে দারিদ্র্য থাকত না। এক মাসের সওমই সমাজকে অনেকাংশে স্বচ্ছল করতে যথেষ্ট ভ‚মিকা রাখতে পারত। যারা অবস্থাসম্পন্ন, তাঁরা যদি সত্যিকারভাবে সংযমী হতেন যে-এই একটি মাস আমরা লোকদেখানো সংযম নয়, বরং প্রকৃত সংযম করব; তাহলে যে ব্যয় সংকোচন তাঁরা করছেন, সেটি সমাজের অভাবী মানুষের কল্যাণে ব্যয় হতো। পনেরো কোটি জনসংখ্যার মধ্যে পাঁচ কোটি মানুষও যদি সওম (সংসংযম) পালন করে নিজের অতিরিক্ত ভোগ্যবস্তু অন্যকে দান করত, তবে জাতীয় সম্পদ এমনভাবে উপচে পড়ত যে নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যেত না। এটিই সওমের বাস্তব প্রতিফলন হওয়ার কথা ছিল। উদাহরণস্বরূপ, যদি অন্যান্য মাসে ভোজ্য তেলের লিটার থাকত ১০০ টাকা, তবে এই মাসে থাকার কথা ছিল ২০ টাকা। কারণ মানুষ নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করছে, চাহিদা থাকলেও সে ভোগ করছে না। সেই নিয়ন্ত্রণের প্রভাব তার শরীরের পাশাপাশি মনের ওপরও পড়বে, যাতে ব্যক্তি যেমন পরিশুদ্ধ হবে, তেমনি সমাজও সমৃদ্ধ হবে। অথচ প্রতি বছর মুসলিম বিশ্বে রোজা রাখা হচ্ছে কিন্তু আমাদের সমাজে অন্যায়-অবিচার ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ভয়ানক আকারে বেড়ে চলছে। এর অর্থ দাঁড়ায়-আমাদের সওম প্রকৃত অর্থে সওম হচ্ছে না।
আইয়্যামে জাহেলিয়াতের ভোগবাদী সমাজ ইসলামের ছায়াতলে আসার পর কেমন আমূল পরিবর্তিত হয়েছিল, সেটা এক বিস্ময়কর ইতিহাস। যে সমাজে নারীকে কেবল ভোগ্যবস্তু মনে করা হতো, সেই সমাজে এমন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে একজন যুবতী নারী একাকী সারা দেহে অলঙ্কার পরিহিত অবস্থায় শত শত মাইল পথ পরিভ্রমণ করত, কিন্তু তার মনে কোনো ক্ষতির আশঙ্কাও জাগ্রত হতো না। মানুষ নিজের উপার্জিত সম্পদ উট বোঝাই করে নিয়ে ঘুরে বেড়াত কিন্তু দান গ্রহণ করার মতো লোক খুঁজে পেত না। সামাজিক অপরাধ এত কমে গিয়েছিল যে আদালতগুলোতে মাসের পর মাস কোনো অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগ আসতো না। সেই সোনালি যুগের কথা এখন অনেকের কাছে গল্পের মতো লাগতে পারে।
আবু যার গেফারি (রা.)-এর গেফার গোত্রের পেশাই ছিল ডাকাতি। সেই আবু যর (রা.) ইসলামের ছোঁয়ায় এমনভাবে বদলে গেলেন যে সত্যের পক্ষে তিনি আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন। তৎকালীন সমাজে রাস্তায় কেউ সম্পদ হারিয়ে ফেললে তা যথাস্থানেই ফেরত পাওয়া যেত। মানুষ সোনা-রূপার অলঙ্কারের দোকান খোলা রেখেই মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ত, কেউ চুরি করত না। মানুষ জীবন গেলেও মিথ্যা বলত না কিংবা ওজনে কম দিত না। এই যে অভূতপূর্ব শান্তিপূর্ণ অবস্থা কায়েম হয়েছিল, তা কেবল কঠোর আইন দিয়ে হয়নি। মানুষের আত্মায় পরিবর্তন না আনতে পারলে কেবল আইন দিয়ে নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করা যায় না। যে সমাজের মানুষ কিছুদিন আগেও ছিল চরম অসৎ, তাদের আত্মায় এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছিল সালাত ও সওমের মতো চারিত্রিক প্রশিক্ষণের প্রভাবে। সেই নামাজ-রোজা তো আজও কম হচ্ছে না, তবে এর ফল কেন দেখা যাচ্ছে না?
তার প্রধান কারণ হলো-সওম পালনের প্রথম শর্ত হচ্ছে ব্যক্তিকে ‘মো’মেন’ হতে হবে। কিন্তু বর্তমান জাতিটি প্রকৃত মো’মেন হিসেবে দণ্ডায়মান নয়। দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে তাকওয়া তথা সত্য-মিথ্যা ও ন্যায়-অন্যায়ের বোধ সৃষ্টি করা। আজকে আমাদের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ন্যায়-অন্যায়ের বাছবিচার করার বোধ প্রায় বিলুপ্ত। আমাদের এই বিষয়টি আজ গভীরভাবে ভাবতে হবে। বর্তমানে বিশ্বে আমরা ১৫০ কোটি মুসলমান। অথচ একের পর এক যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলিম দেশগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমরা দিন দিন জাঁকজমকপূর্ণ টাইলসের মসজিদ বানাচ্ছি, এসি লাগাচ্ছি, সোনার গম্বুজ গড়ছি; আমাদের রোজাদারের অভাব নেই, হাজীর সংখ্যা বাড়ছে, নামাজের কাতারও ভরপুর। কিন্তু আমাদের জাতীয় জীবনের লাঞ্ছনা ও অপমানই বলে দেয়-আমাদের এই আমলগুলো আল্লাহর দরবারে কতটুকু গৃহীত হচ্ছে।
সমাজে সওমের আরেকটি প্রভাব পড়ার কথা ছিল যে-মানুষ ক্ষুধার্তের কষ্ট অনুধাবন করবে। কিন্তু সেটি কি আদৌ হচ্ছে? যদি মানুষ প্রতিবেশীর ক্ষুধার কষ্ট উপলব্ধি করত এবং নিজের আহার তাকে দিত, তবে বোঝা যেত তার সওম কবুল হয়েছে। কিন্তু তেমন নিদর্শন আমাদের সমাজে বিরল। যে ব্যক্তি বছরের এগারো মাস ঘুষ খায়, সে যদি অন্তত এই মাসে সংযমী হতো, তবে সমাজে তার বিরাট প্রভাব পড়ত। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি এ মাসে অপরাধ আরও বাড়ে, খাদ্যে ভেজাল ও বিষ মেশানোর মাত্রা তীব্র হয়। ব্যবসায়ীরা এই মাসটিকে অতিরিক্ত মুনাফা লাভের মৌসুম হিসেবে বেছে নেয়। সংযমের বদলে চলে দামী পোশাক কেনার প্রতিযোগিতা। অথচ কথা ছিল-এই মাসে আমি নিজের ব্যয় কমিয়ে সেই অর্থ দিয়ে বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দেব, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন। যেখানে বিশ্বের অনেক প্রান্তে মুসলমানরা ক্ষুধার তাড়নায় লাঞ্ছিত জীবন কাটাচ্ছে, সেখানে অনেক মুসলিম দেশে চলছে ইফতার ও ঈদের নামে সম্পদের বিপুল অপচয়। সওম আজ আমাদের চরিত্রে কোনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। এভাবেই আল্লাহর রসুলের সেই ভবিষ্যদ্বাণী আজ পূর্ণতা পেয়েছে।