হোম » নারী » আর কত রামিসা ঘুমালে আমরা জাগব?

আর কত রামিসা ঘুমালে আমরা জাগব?

auth রিয়াদুল হাসান ১৬ জুন ২০২৬
৬ মিনিটে পড়ুন
feature

আজ সময় এসেছে নিজেকে প্রশ্ন করার। আর কত রামিসা মারা গেলে আমরা জাগব? আর কত মায়ের বুক খালি হলে আমরা বুঝব যে, মানুষের তৈরি এই ব্যর্থ ব্যবস্থা আমাদেরকে শান্তি দিতে পারবে না? আজকে রামিসার বাবাকে আমরা কান্না করতে দেখলাম। তিনি চিৎকার করে বলেছেন, “আমার মেয়ে আমাকে বাবা বলে কেন ডাকে না?” শহীদ সোলাইমান খোকনের বাবা গত দশ বছর এভাবেই কান্না করেছেন। আর কত কান্নার পরে আমরা এই সিস্টেম থেকে বেরিয়ে আসব?

গত কয়েক দিন ধরে দেশে একের পর এক ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে যে ঘটনাটি ঘটল- একটা আট বছরের বাচ্চা মেয়ে! তাকে ধর্ষণ করা হলো, হত্যা করা হলো, মাথা আলাদা করে দেওয়া হলো! খবরটা দেখার পর শরীর শিউরে উঠেছিল। একটা ছোট্ট শিশু, সে এখনো মায়ের কোল ছাড়েনি, বাবার হাত না ধরে রাস্তা পার হতে পারে না; সেই বাচ্চাটার সাথে এই আচরণ? সত্যিই কি আমরা মানুষের সমাজে বাস করছি?

এই তো কয়েক দিন আগেই মানিকগঞ্জে একজন গর্ভবতী নারীর পেটের সন্তান বের করে হত্যা করা হলো। তারও কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক শিশুকে ধর্ষণ করে গলায় পোঁচ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কয়েক দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে শেষ পর্যন্ত বাচ্চাটা মারা যায়। একটার পর একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। একটা লাশ দাফন করার আগে আরেকটা নতুন লাশ সামনে আসছে। যেন এখানে মানুষের জীবনের কোনো মূল্যই নেই। দিনকে দিন অপরাধ বাড়ছে, অপরাধের মাত্রা বাড়ছে, নৃশংসতা বাড়ছে। মানুষ সিনেমার জম্বির মতো আচরণ করছে। তবে আমরা যেটা বুঝি, এর একটা বড় কারণ হচ্ছে আমাদের প্রচলিত বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতা। আমাদের আদালত প্রাঙ্গণ, আমাদের পুলিশিং সিস্টেম, আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা- এই জায়গাগুলো কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত আমরা সবাই জানি। যার টাকা নেই, তার জন্য ন্যায়বিচারও নেই। যার পেশিশক্তি নেই, তার জন্য আইনের সুরক্ষাও নেই- যদিও তা আইনের বইতে আছে, সংবিধানেও আছে। কিন্তু আমি বলছি বাস্তবতার কথা। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, মামলার জট- এগুলোর কথা শুনে শুনে আমাদের কান পচে গেছে, কিন্তু সমাধান হয় না।

আমাদের বাস্তব জীবনের কথাটা বলি। ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে হেযবুত তওহীদের মাননীয় এমামের বাড়িতে স্মরণকালের এক পৈশাচিক হামলা হয়। সেখানে ২ জন মানুষকে দিনের আলোতে জবাই করে হত্যা করা হয়। হাজার হাজার মানুষ এই ঘটনার সাক্ষী। এই ঘটনা নিয়ে মামলা হয়েছে, মামলা-বাণিজ্য হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা হয়েছে। অনেক কিছুই হয়েছে; শুধু ঘটনার দশ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচারটাই হয়নি।

“যার টাকা নেই, তার জন্য ন্যায়বিচারও নেই। যার পেশিশক্তি নেই, তার জন্য আইনের সুরক্ষাও নেই- যদিও তা আইনের বইতে আছে, সংবিধানেও আছে। কিন্তু আমি বলছি বাস্তবতার কথা। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, মামলার জট- এগুলোর কথা শুনে শুনে আমাদের কান পচে গেছে, কিন্তু সমাধান হয় না।”

হেযবুত তওহীদের যে দুজন সদস্যকে সেদিন হত্যা করা হয়েছিল, তাদের একজনের নাম সোলাইমান খোকন। সেই খোকনের বাবা এই মাসেই মারা গেছেন। ২০১৬ সালে ছেলে শহীদ হয়েছিলেন, আজকে ১০ বছর পর ২০২৬ সালে বাবা মারা গেলেন। এই দশটা বছর তিনি পুত্রের ঘাতকদের বিচার হবে- এই আশায় বুক বেঁধে ছিলেন। কিন্তু আমাদের বিচারব্যবস্থা, আমাদের প্রশাসন তাকে এই ন্যায়বিচারটুকু পাইয়ে দিতে পারেনি। এমন ঘটনা একটা নয়; হাজার হাজার, লাখ লাখ পরিবারের সাথে ঘটে চলেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি এই ব্যর্থ ব্যবস্থা থেকে বের হব না? আমরা হেযবুত তওহীদ একটা কথা বারবার বলে যাচ্ছি- সেটা হচ্ছে প্রচলিত মানবরচিত ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান না করলে আমরা এই দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাব না। আমাদেরকে আল্লাহর দেওয়া সিস্টেমে ফিরে যেতে হবে। আমরা বলেছি, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা যখন এই জীবনব্যবস্থা প্র্যাকটিস করেছিলেন, তখন সমাজের প্রতিটি অঙ্গনে শান্তি, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মানুষ দরজা খুলে ঘুমাত, কোনো ঝুঁকি অনুভব করত না। অপরাধ নেমে গিয়েছিল শূন্যের কোঠায়।

“আজকে শিশু রামিসাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, যদি ইসলামের কিসাসের বিধান থাকত, ঠিক একইভাবে অপরাধীর শাস্তি কার্যকর করা হতো। … আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি, রামিসার হত্যাকারীর মতো ভয়ানক অপরাধীদের মধ্য থেকে দুই-চারজন অপরাধীকে যদি এই শাস্তিটা প্রদান করা হয়, এ ধরনের অপরাধ নব্বই শতাংশ কমে যাবে।”

আইয়্যামে জাহেলিয়াতের আরবও ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। সেখানে নারীরা নিরাপদ ছিল না, অন্যায়-অবিচার ছিল সর্বত্র। কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন আল্লাহর দেওয়া দীন প্রতিষ্ঠা করলেন, তখন সেই সমাজ বদলে গেল। এমন নিরাপদ সমাজ তৈরি হলো যেখানে একজন নারী দিনের পর দিন একা সফর করলেও ভয় পেত না। ধর্ষণ তো দূরের কথা, নারীদের উত্ত্যক্ত করার সাহসও কেউ করত না।

আজ আমরা সেই দীন থেকে দূরে সরে গেছি। ইসলামকে শুধু নামাজ-রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছি। অথচ ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়; ইসলাম রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, বিচার, সংস্কৃতি- জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। যখন রাষ্ট্র আল্লাহর দেওয়া নীতিমালার বাইরে পরিচালিত হয়, তখন সমাজে অবিচার বাড়বেই।

আজ সময় এসেছে নিজেকে প্রশ্ন করার। আর কত রামিসা মারা গেলে আমরা জাগব? আর কত মায়ের বুক খালি হলে আমরা বুঝব যে, মানুষের তৈরি এই ব্যর্থ ব্যবস্থা আমাদেরকে শান্তি দিতে পারবে না? আজকে রামিসার বাবাকে আমরা কান্না করতে দেখলাম। তিনি চিৎকার করে বলেছেন, “আমার মেয়ে আমাকে বাবা বলে কেন ডাকে না?” শহীদ সোলাইমান খোকনের বাবা গত দশ বছর এভাবেই কান্না করেছেন। আর কত কান্নার পরে আমরা এই সিস্টেম থেকে বেরিয়ে আসব?

আজকে যদি আল্লাহর দেওয়া দীন প্রতিষ্ঠিত থাকত, তাহলে অপরাধ করে কেউ পার পেত না; সেই সুযোগটাই থাকত না। প্রত্যেকটা অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতো। অপরাধী যেই হোক, যত অর্থশক্তি কিংবা পেশিশক্তির অধিকারীই হোক, কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হতো না। আজকে শিশু রামিসাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, যদি ইসলামের কিসাসের বিধান থাকত, ঠিক একইভাবে অপরাধীর শাস্তি কার্যকর করা হতো। অর্থাৎ, রামিসার মাথা আলাদা করে দেওয়া হয়েছে; যে কাজটা করেছে, কিসাসের বিধান অনুযায়ী তার মাথাও আলাদা করা হতো। কথাটা শুনতে খারাপ লাগতে পারে, আমাদের অতিসুশীল ব্যক্তিরা আপত্তি করে বলতে পারেন, “কী সাংঘাতিক! কী নির্মম শাস্তি!”

কিন্তু আমরা বলতে চাই যে, না; এটা নির্মমতা নয়, এটা আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক বিধান। যে যতটুকু অপরাধ করবে, তাকে ততটুকু শাস্তি দেওয়া হবে। আল্লাহ পাক এ ক্ষেত্রে কঠোরতা দেখিয়েছেন এই কারণে যে, একটামাত্র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পর যেন সমাজ থেকে এ ধরনের অপরাধ চিরতরে নির্মূল হয়ে যায়। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি, রামিসার হত্যাকারীর মতো ভয়ানক অপরাধীদের মধ্য থেকে দুই-চারজন অপরাধীকে যদি এই শাস্তিটা প্রদান করা হয়, এ ধরনের অপরাধ নব্বই শতাংশ কমে যাবে।

কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র কি তা করবে? করবে না। কারণ তারা ব্রিটিশদের আইনকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আইন মনে করে, আর আল্লাহর বিধানকে মনে করে নিষ্ঠুরতা। অথচ এই রাষ্ট্রযন্ত্রে যারা বসে আছেন, তাদের অধিকাংশই পরিচয়ে মুসলিম। তারা নামাজ পড়েন, কোরআন তিলাওয়াত করেন, হজ করেন। আল্লাহ পাকের দেওয়া এসব বিধানকে তারা আখেরাতে মুক্তির পথ হিসেবে বিশ্বাস করেন; কিন্তু ইহকালীন মুক্তির পথ তারা মনে করেন পশ্চিমাদের দেওয়া বিধানকে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আল্লাহর সত্য দীনকে উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন এবং এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠার শক্তি দিন যেখানে কোনো নারী ধর্ষিতা হবে না, কোনো পিতা-মাতাকে সন্তানের মরদেহ বুকে জড়িয়ে কাঁদতে হবে না। আমিন।

টপিক: ধর্ষণন্যায়বিচারবিচারব্যবস্থা
×
QR কোড স্ক্যান করুন