- ইসলাম কীভাবে মানবসমাজকে পরিবর্তন করে, তা ধাপে ধাপে নিচে তুলে ধরা হলো:
- ১. জাতি গঠন ও নেতৃত্ব:
- ২. চূড়ান্ত লক্ষ্য ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া:
- ৩. চরিত্র গঠন ও ইবাদতের প্রকৃত উদ্দেশ্য:
- ৪. প্রশিক্ষণের ফলাফল ও সোনালী ইতিহাস:
- বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আমাদের ভুল:
- কোর’আন কী ও এর উদ্দেশ্য কী:
- কোর’আন ও হাদিস: পার্থক্য ও কাজ
- সত্যদ্বীন প্রতিষ্ঠা:
যে কোনো কাজ করার আগে সেই কাজের উদ্দেশ্য জানা প্রয়োজন। যাত্রাপথে নিজের গন্তব্য সম্পর্কে না জানলে ঠিক জায়গাতে পৌঁছাবেন কী করে? তাহলে ইসলাম নামক যে দ্বীনটি মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর শেষ নবী, বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা.) এর মাধ্যমে প্রেরণ করলেন তার উদ্দেশ্য কী? কেন আল্লাহ আমাদেরকে এই দ্বীন দিলেন সেটা নিয়েই আজকের আলোচনা।
আল্লাহ যখন মানুষ সৃষ্টি করতে চাইলেন তখন মালায়েক বা ফেরেশতাদেরকে ডেকে বলেন, আমি পৃথিবীতে আমার খলিফা প্রেরণ করতে চাই। তখন মালায়েকগণ একটা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল- আল্লাহর এই নতুন সৃষ্টি (বনী আদম/মানুষ) পৃথিবীতে ফাসাদ (মারামারি, অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম) ও সাফাকুদ্দিমা (রক্তপাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, হত্যা-সন্ত্রাস) করবে। আল্লাহ মালায়েকদেরকে বলেছিলেন, “আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না।” (সুরা বাকারা-৩০)। তাহলে আল্লাহ কী জানতেন, যা মালায়েকরা জানত না? নিশ্চয় আল্লাহর নিকট এমন কিছু ছিল যা দিয়ে ঐ ফাসাদ ও সাফাকুদ্দিমা বন্ধ করা যাবে। হ্যাঁ, সেটারই ইঙ্গিত আল্লাহ একটু পরেই দিয়েছেন। কয়েকটা আয়াত পরেই আল্লাহ বলছেন, “আমি যুগে যুগে হেদায়াহ পাঠাব, যারা এই হেদায়ার অনুসরণ করবে তাদের কোনো ভয় নেই (দুনিয়াতে ফাসাদ ও সাফাকুদ্দিমার ভয় নেই), তাদের কোনো চিন্তা/দুশ্চিন্তা নেই (আখেরাতে জাহান্নামের দুশ্চিন্তা নেই)। (সুরা বাকারা-৩৮)। তাহলে দুনিয়া থেকে অন্যায়, অবিচার, অশান্তি, যুলুম, হানাহানি (ফাসাদ) এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত, হত্যা-সন্ত্রাস (সাফাকুদ্দিমা) দূর করার উপায় হলো হেদায়াহ, এটাই মালায়েকরা জানত না।
অন্য কয়েকটা আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “তিনি (আল্লাহ) তাঁর আপন রসুলকে প্রেরণ করেছেন হেদায়াহ ও সত্যদ্বীন দিয়ে যেন এটাকে অন্য সকল দ্বীনের উপর বিজয়ী করেন/ প্রতিষ্ঠা করেন।” (সুরা তওবা-৩৩, ফাতাহ-২৮, সফ-৯)। লক্ষ করুন, আল্লাহ তাঁর রসুলকে দু’টো জিনিস দিয়েছেন (হেদায়াহ ও সত্যদ্বীন) এবং একটি দায়িত্ব দিয়েছেন (ঐ দু’টো জিনিসকে সমগ্র পৃথিবীতে, অন্যান্য সকল দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠা করা)। এই তিনটি জিনিস নিয়েই ইসলাম। সমগ্র কোর’আনে এই তিনটি জিনিসই আছে, এর বাইরে কিছুই পাবেন না। কারণ আল্লাহ তাঁর রসুলকে এটাই দিয়েছেন। তাহলে বোঝা গেল- মহান আল্লাহ আমাদের এই মানবসমাজ থেকে ফাসাদ ও সাফাকুদ্দিমা দূর করার জন্যই নবী-রসুলদের মাধ্যমে ইসলাম পাঠিয়েছেন। এটা অবশ্য নবী-রসুলদের জীবনী থেকেও আমরা দেখতে পাই। সকল নবী-রসুল সংগ্রাম করে, লড়াই করে সমাজ থেকে অন্যায়, অবিচার, অশান্তি দূর করে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন।
আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে যখন সারা পৃথিবী অন্যায়, অবিচার ও অশান্তির আগুনে জ্বলছিল, বিশেষত আরব সমাজ যখন জাহেলিয়াতের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল তখন আল্লাহ মানব জাতিকে উদ্ধার করার জন্য শেষ নবী মোহাম্মদ (সা.)-কে সমগ্র পৃথিবীর জন্য প্রেরণ করেন। তাঁর নব্যুয়তের মাধ্যমেই আল্লাহর হুকুম-বিধান নাজিল হওয়া শুরু হয়। কিন্তু কেবল হুকুম নাজিল হলেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না, তা বাস্তবে প্রয়োগ করতে হয়।
ইসলাম কীভাবে মানবসমাজকে পরিবর্তন করে, তা ধাপে ধাপে নিচে তুলে ধরা হলো:
১. জাতি গঠন ও নেতৃত্ব:
মো’মেন জাতি: আল্লাহর বিধানগুলো মানা এবং সমাজে তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য একটি জাতির প্রয়োজন ছিল। রসুলাল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মক্কা ও তার আশেপাশের একদল মানুষ তওহীদের অঙ্গীকারে ঐক্যবদ্ধ হন। জীবন ও সম্পদের কোরবানি ও কঠিন পরীক্ষা দিয়ে যে মানুষগুলো রসুলাল্লাহর পাশে ছিলেন, তারাই এক সময় জাতি গঠনের জন্য, দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য মদিনায় হেজরত করেন। মদিনার আনসারগণ ও মক্কার মুহাজির মিলে ইস্পাতকঠিন এক ঐক্যবদ্ধ মো’মেন জাতি গড়ে তোলেন।
নেতৃত্ব: যেকোনো জাতি পরিচালনার জন্য একজন নেতার দরকার পড়ে। রসুল (সা.) হলেন মো’মেনদের সেই নেতা এবং তাঁর পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদীন এই দায়িত্ব পালন করেন। সমগ্র উম্মাহ/জাতি জানতেন যে, আল্লাহ এক, রসুল এক, কাবা এক, কোর’আন এক, কাজেই জাতির নেতা হবে একজন, জাতি হবে অখণ্ড। একদেহ-একপ্রাণ হয়ে সকলে এক নেতার আনুগত্য করেছেন, কেউ নেতার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা তোলেননি, মতভেদ করেননি।
২. চূড়ান্ত লক্ষ্য ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া:
লক্ষ্য নির্ধারণ: নেতা জাতিকে কোন দিকে পরিচালনা করবেন? আল্লাহ কোর’আনের তিনটি ভিন্ন সুরায় পরিষ্কারভাবে মো’মেনদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “তিনি তাঁর আপন রসুলকে প্রেরণ করেছেন হেদায়াহ ও সত্যদ্বীন দিয়ে, যেন এটাকে (ঐ হেদায়াহ ও সত্যদ্বীনকে) অন্যান্য সমস্ত দ্বীনের (জীবনব্যবস্থার) উপরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। (সুরা তওবা-৩৩, ফাতাহ-২৮, সফ-৯)। অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা দ্বীন কায়েম কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (সুরা শুরা-১৩)। অর্থাৎ এই উম্মার সামনে লক্ষ্য একটাই, আর সেটা হলো পৃথিবীতে বিরাজিত সকল দ্বীন বা জীবনব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দিয়ে আল্লাহর দেওয়া সত্যদ্বীনকে কায়েম করে সমাজে ন্যায়, সুবিচার, শান্তি নিশ্চিত করা।
প্রক্রিয়া: এত বড় লক্ষ্য কেবল সাধারণ প্রচার বা আধ্যাত্মিক সাধনা দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য আল্লাহ ‘জিহাদ ও কিতাল’ (সংগ্রাম ও সশস্ত্র লড়াই)-এর বিধান দিয়েছেন। কীভাবে তা করতে হবে, তা নবীজি (সা.) তাঁর জীবনের শেষ ১০ বছরে ১০৭টি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বাস্তবে দেখিয়ে গেছেন।
৩. চরিত্র গঠন ও ইবাদতের প্রকৃত উদ্দেশ্য:
বাতাসে ফুঁ দিয়ে কেরামতি দেখানো যায়, কিন্তু যুদ্ধ জয় করা যায় না। যেকোনো সংগ্রামে বিজয়ী হতে হলে একটি সুশৃঙ্খল যোদ্ধা চরিত্রের প্রয়োজন। যেকোনো সামরিক বাহিনীর মতো মো’মেন বাহিনীরও প্রধান তিনটি গুণ হলো- ঐক্য, শৃঙ্খলা ও আনুগত্য। চেইন অব কমান্ড যেন ভেঙে না পড়ে, সে জন্য কোর’আনে আল্লাহ, রসুল এবং কমান্ডারের আনুগত্য করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুরা নিসা-৫৯)। এই গুণগুলো মো’মেনদের চরিত্রে গেঁথে দেওয়ার জন্যই আল্লাহ ইবাদতের বিধান দিয়েছেন।
সালাত (নামাজ): সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ এবং জামাতে নামাজের দৃশ্যের মধ্যে অদ্ভুত মিল রয়েছে। সালাহ্ কোনো নিছক ধ্যান নয়; এটি হলো মো’মেনদের ঐক্য, শৃঙ্খলা ও আনুগত্য শিক্ষার প্র্যাকটিক্যাল প্রশিক্ষণ। জামাতবদ্ধ সালাহ্ আমাদেরকে ঐক্যের শিক্ষা দেয়। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-নিরক্ষর, সাদা-কালো পাশাপাশি দাঁড়ানো আমাদেরকে সাম্যের শিক্ষা দেয়। কাতার সোজা করার শৃঙ্খলা শেখায়। আর একজন এমামের তাকবিরের সাথে সাথে সকলে একসাথে তার অনুসরণ আমাদেরকে এক নেতার আনুগত্য করতে শেখায়। পাশাপাশি এটি আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণও বটে। কারণ যুদ্ধ জয় করতে কেবল শারীরিক প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়, আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণও বাধ্যতামূলক। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই সালাহ ফাহেশা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (আনকাবুত-৪৫)। এ আয়াত থেকেই বোঝা যায় যে, সালাত হলো চরিত্র নির্মাণের একটা প্রশিক্ষণ।সিয়াম (রোজা): গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, রোজা হলো মো’মেন বাহিনীর আত্মসংযমের প্রশিক্ষণ। যুদ্ধক্ষেত্র বা যেকোনো চরম পরিস্থিতিতে এই আত্মসংযম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
হজ: মুসলিমরা যেন সামাজিকভাবে একে অপরের খোঁজ-খবর নেয়, সহযোগিতা করে, জাতির এমামের চেইন অব কমান্ডে বাঁধা থাকে এজন্য পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে যাবার নিয়ম। পাঞ্জেগানা মসজিদ হলো মুসলিমদের ছোট্ট সমাবেশের একটা জায়গা। আর জামে মসজিদ হলো সাপ্তাহিক সমাবেশের জায়গা। এই সমাবেশটা হবে একটু বড়। এখানে বিচার-ফায়সালা, অর্থনৈতিক কাজ (যাকাত আদায় ও দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ), সামাজিক কাজ ইত্যাদি সম্পন্ন হবে। আর সমগ্র উম্মাহর বাৎসরিক মহাসম্মেলন হলো হজ। এটাও মুসলিমদের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক এক মহড়া ও প্রশিক্ষণ। সমগ্র উম্মাহর এক বিরাট অংশ সেখানে উপস্থিত হয়ে জাতিগত সঙ্কট নিয়ে কথা বলবে, সমাধান করবে। প্রকৃত হজ থাকলে এক হজেই রোহিঙ্গা সমস্যা, ফিলিস্তিন সমস্যা সব সমাধান হয়ে যেত।এমন অন্যান্য এবাদতও মূলত ঐ মোজাহেদের চরিত্র নির্মাণের প্রশিক্ষণ।
৪. প্রশিক্ষণের ফলাফল ও সোনালী ইতিহাস:
এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উম্মতে মোহাম্মদী বা মো’মেন জাতি এমন অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছিল যে, সংখ্যা এবং অস্ত্রশস্ত্র-সবদিক দিয়ে দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও তারা তৎকালীন দুই সুপারপাওয়ার রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেছিল।
তাদের সেই সংগ্রামের মাধ্যমে অর্ধ পৃথিবীতে এমন অবিস্মরণীয় শান্তি নেমে এসেছিল যে, মানুষ রাতে ঘরের দরজা বন্ধ করার প্রয়োজনবোধ করত না; আদালতে মাসের পর মাস কোনো অপরাধ সংক্রান্ত মামলা আসত না; নারীরা শত শত মাইল পথ সম্পূর্ণ নির্ভয়ে চলতে পারত।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আমাদের ভুল:
ইসলামকে কেন ‘পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা’ (Complete Code of Life) বলা হয়, তা এই ধারাবাহিকতা থেকেই স্পষ্ট। শান্তির জন্য বিধান লাগবে, বিধান মানার জন্য জাতি লাগবে, জাতির নেতা লাগবে, নেতার সামনে লক্ষ্য লাগবে, লক্ষ্য অর্জনের চরিত্র লাগবে এবং চরিত্র অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ লাগবে-সবকিছুই আল্লাহ দিয়ে দিয়েছেন।
কিন্তু বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হলো, আমরা না বোঝার কারণে পুরো ইসলামকেই কেবল ব্যক্তিগত উপাসনার বিষয়ে পরিণত করেছি। ঘরে বসে কোর’আন-হাদিস পড়ে, নামাজ-রোজা করে ব্যক্তিগত সওয়াব অর্জনকেই মূল লক্ষ্য বানিয়ে ফেলেছি। অথচ এর প্রকৃত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্য আমরা ভুলে গেছি। আর এ কারণেই আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অন্যায়-অবিচারের মহোৎসব চললেও আমরা কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়তে পারছি না।
কোর’আন কী ও এর উদ্দেশ্য কী:
ছোটবেলা থেকেই আমরা জেনে আসছি কোর’আন আল্লাহর বাণী আর হাদিস রসুলের (সা.) বাণী। কিন্তু এই কোর’আন ও হাদিস আসলে কী, কোনটার কী কাজ এবং কীভাবে তা প্রয়োগ করতে হয়, তা না জানলে এগুলো সঠিকভাবে মানা সম্ভব নয়। কোর’আন এবং হাদিস কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং এগুলো একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার ভিত্তি। মক্কায় ১৩ বছর দাওয়াত দেওয়ার পর যখন মদিনার বহু মানুষ তাওহীদে ঐক্যবদ্ধ হলো, তখন রসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করেন। সেখানে তিনি তাওহীদভিত্তিক একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলেন। মদিনায় মো’মেনদের নেতা হিসেবে সমাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিচারব্যবস্থা, সেনাবাহিনী এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট আইনের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন আল্লাহ প্রয়োজন অনুযায়ী একটার পর একটা বিধিবিধান নাজিল করতে থাকেন। মদিনায় ১০ বছর ধরে নাজিল হওয়া সেই হুকুম-বিধানের সংকলিত রূপই হলো পবিত্র কোর’আন। অর্থাৎ কোর’আন হলো মো’মেনদের রাষ্ট্র পরিচালনার সংবিধান।
কোর’আন ও হাদিস: পার্থক্য ও কাজ
কোর’আন কেবল ঘরে বসে খতম দেওয়ার কিতাব নয়। এটি হলো সেই সংবিধান বা জীবনবিধান- যা দিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, অর্থনীতি এবং আদালত পরিচালিত হবে। তাহলে হাদিস কী এবং কেন প্রয়োজন?
অনেকে কোর’আন ও হাদিসকে একই পর্যায়ের মনে করেন, যা সঠিক নয়। হাদিস সরাসরি আল্লাহর হুকুম নয়; বরং কোর’আনের বিধানগুলোকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে রসুল (সা.) এবং তাঁর সাহাবীরা যা করেছেন, বলেছেন বা যেসব কর্মনীতি অবলম্বন করেছেন- হাদিস হলো তার বিস্তারিত ঐতিহাসিক দলিল। আজকের যুগে কোর’আনের বিধান প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে রসুলের সেই প্র্যাকটিক্যাল কর্মনীতি বা সুন্নাহর অনুসরণ অপরিহার্য।
একটি বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য সর্বপ্রথম একজন ইঞ্জিনিয়ারকে দিয়ে নকশা বা ডিজাইন করাতে হয়, যেখানে ভবনের প্রতিটি খুঁটিনাটির বর্ণনা থাকে। কিন্তু শুধু নকশা তৈরি করলেই অটোমেটিক বিল্ডিং হয়ে যায় না। নকশাটি সামনে রেখে মিস্ত্রি দিয়ে নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে বাস্তবে কাজ করতে হয়। সারাজীবন শুধু নকশা মুখস্থ করলে যেমন ভবন দাঁড়াবে না, ঠিক তেমনি কোর’আন হলো আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের ‘নকশা’, আর সেই নকশাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ব্যবহারিক পদ্ধতি বা কনস্ট্রাকশন প্রক্রিয়া হলো ‘হাদিস’। কোর’আন ও হাদিস সবার জন্য নয়; এগুলো মূলত সেই সংগ্রামী মো’মেন জাতির জন্য, যারা আল্লাহকে একমাত্র বিধানদাতা হিসেবে মেনে নিয়ে তাঁর দেওয়া নকশাকে সমাজে বাস্তবায়ন করতে চায়।
কোর’আনের বিধান বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যখনই মো’মেনদের ওপর নির্যাতন আসবে, তখন তারা হাদিসের পাতায় খুঁজে পাবেন কীভাবে সাহাবীরা (যেমন: আম্মার, ইয়াসির, সুমাইয়া রা.) মক্কার কাফেরদের অত্যাচার সহ্য করেও মাথা নত করেননি। শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে বদর, ওহুদ বা খন্দকের যুদ্ধে সাহাবীদের লড়াইয়ের ইতিহাস মো’মেনদের শক্তি ও সাহস জোগাবে।
যারা জাতীয় জীবনে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেই নেই, তাদের কোর’আন মানি, হাদিস মানি না’ বা ‘হাদিস মানি, মাযহাব মানি না’- এই ধরনের তর্ক-বিতর্ক সম্পূর্ণ অর্থহীন। কারণ তারা কোর’আন ও হাদিসের মূল উদ্দেশ্যই অনুধাবন করতে পারেননি। প্রকৃত মো’মেন হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নামলে সমাজ পরিচালনায় কোর’আন, হাদিস, ইতিহাস এবং যোগ্য নেতৃত্ব- সবকিছুরই প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হবে। তা না হলে ঘরে বসে কেবল সুদের আয়াত মুখস্থ করলেও সমাজে সুদভিত্তিক অর্থনীতি চলতে থাকবে, আর কিসাসের আয়াত মুখস্থ করলেও আদালতে মানবসৃষ্ট আইনেই বিচার হতে থাকবে।
সত্যদ্বীন প্রতিষ্ঠা:
আপনার হাতে একটা সংবিধান আছে কিন্তু রাষ্ট্র নেই, তাহলে ঐ সংবিধানের উদ্দেশ্য (শান্তিপূর্ণ ও উন্নত রাষ্ট্র গঠন) অর্জন হবে না। সংবিধান মানুষ পরে তৈরি করে, আগে যুদ্ধের মাধ্যমে অথবা অধিকাংশ জনগণের মতৈক্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত হয়। রাষ্ট্র গঠনের পরে সংবিধান কার্যকর হয়। সংবিধান কার্যকর হলে তখন তার ফল জনগণ লাভ করতে পারে। যেমন বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাস যুদ্ধ করে, লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ উৎসর্গ করেন, লক্ষ লক্ষ নারী তাদের সম্ভ্রম হারান। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন একটা রাষ্ট্র পাই। তখন এদেশের সরকার পার্লামেন্টে বসে সিদ্ধান্ত নেয় সংবিধান প্রণয়নের। ১৯৭২ সালে সংবিধান রচিত হয়। তাহলে ইসলামের বিধি-বিধান কোর’আনে আছে কিন্তু আগে একটা রাষ্ট্র লাগবে যেখানে অধিকাংশ মানুষ একমত হয়ে সরকার গঠন করেছে যে, আমরা আল্লাহর হুকুম-বিধান ছাড়া আর কারও হুকুম-বিধান মানব না। তখন ঐ রাষ্ট্রের সংবিধান হবে কোর’আন। তাহলে এটা কি এমনি এমনিই হয়ে যাবে? আমরা কি ১৯৭২ এর সংবিধান এমনি এমনিই পেয়েছি? না। এজন্য আল্লাহও এই দ্বীন প্রতিষ্ঠার নীতি বা পদ্ধতি ঘোষণা করে দিয়েছেন পবিত্র কোর’আনে।
সেটা হলো- জেহাদ ও কেতাল। যখনই কেউ ঈমান আনবে, তওহীদে ঐক্যবদ্ধ হবে তখনই তার উপর জেহাদ করা ফরজ হয়ে যাবে। জেহাদ না করলে সে মো’মেনই হতে পারবে না। (সুরা হুজুরাত-১৫)। জেহাদ মানে হলো- আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। এরপর আল্লাহ কেতালকেও (সশস্ত্র যুদ্ধ) ফরজ করে দিয়েছেন। (সুরা বাকারা-২১৬)। আল্লাহর রসুল নব্যুয়তের পর থেকে সারাটা জীবন জেহাদ ও কেতাল করে কাটিয়েছেন। মদিনায় হেজরতের পর মাত্র ১০ বছরে তিনি ১০৭টা অভিযান প্রেরণ করেছেন। আহত, রক্তাক্ত হয়েছেন। আসহাবগণ জীবন দিয়েছেন। তিনি ইন্তেকালের আগে তাঁর উম্মাহর উপর দায়িত্ব দিয়ে গেছেন সমগ্র পৃথিবীতে জেহাদ ও কেতালের মাধ্যমে আল্লাহর সত্যদ্বীন কায়েম করার। তাঁর নিজ হাতে গড়া আসহাবগণ পরবর্তী একশ’ বছরে অর্ধপৃথিবীতে জেহাদ ও কেতালের মাধ্যমে আল্লাহর সত্যদ্বীন কায়েম করে সমাজ থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, অশান্তি দূর করে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু সেই আসহাবগণের ইন্তেকালের পর এই উম্মাহর নেতৃত্বে এমন একদল মানুষ আসে যারা দ্বীন কায়েমের সংগ্রাম তথা জেহাদ-কেতাল ত্যাগ করে ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়। এই জাতির ওলামা শ্রেণি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ও যুদ্ধমুখী করার পরিবর্তে দ্বীনের অতি বিশ্লেষণ ও বাড়াবাড়ি করে জাতিকে বহু ভাগে ভাগ করে ফেলেন। জাতি শিয়া-সুন্নি, হানাফি-হাম্বলি-শাফেয়ি-মালেকি ইত্যাদি মাজহাব, ফেরকা, দল-উপদলে বিভক্ত হয়। এর ফলে জাতি দুর্বল হয়ে অন্যান্য জাতির হাতে পরাজিত হতে থাকে। প্রথমে ক্রুসেডারদের আক্রমণ, এরপর মোঙ্গলদের আক্রমণের শিকার হয়। মোঙ্গলরা মুসলিমদের বিরাট এলাকা দখল করে নেয়। সবশেষে ইউরোপীয়রা ঔপনিবেশিক যুগে পুরো মুসলিম বিশ্বকে দখল করে। মুসলিমদের দেশে তারা প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের তৈরি করা আইন, বিধান; নিজেদের তৈরি করা সুদভিত্তিক অর্থনীতি। তখনও আমাদের ওলামাগণ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যর্থ হন, বরং তাদের ছোটখাট বিষয় নিয়ে অতি বিশ্লেষণ ও বাড়াবাড়ির ফলেই জাতি আরও শত সহস্রভাবে বিভক্ত হতেই থাকে। বিভক্তির ফলে দুর্বল এই জাতি আর ইউরোপীয় শক্তির কাছে টিকতে পারে না। কাজেই বাধ্য হয়ে তাদের আইন-হুকুম-বিধান আমরা মেনে নিই। কিন্তু আল্লাহর আইন-হুকুম-বিধান বাদ দিয়ে আল্লাহর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞাকে অগ্রাহ্য করে সুদভিত্তিক অর্থনীতি মেনে নিয়ে আমরা যে মো’মেন, মুসলিমের খাতা থেকেই বাদ পড়ে গেছি সেটা আমাদের আলেম সমাজ বুঝতে পারলেন না, অথবা সাহস করে তা মুখ ফুটে বলতে পারলেন না। আল্লাহ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন- “যারা আমার নাজেল করা বিধান দিয়ে বিচার-ফায়সালা করে না তারাই কাফের, জালেম, ফাসেক।” (সুরা মায়েদা-৪৪, ৪৫, ৪৭)। তাহলে আল্লাহর নাজেল করা বিধান বাদ দিয়ে ব্রিটিশদের তৈরি করা আইন-হুকুম-বিধান মেনে নিয়ে আমরা কীভাবে নিজেদেরকে মুসলিম পরিচয় দিচ্ছি? এই লেখা পড়েও যদি কারও বিবেকের দুয়ারে তালা ঝুলতে থাকে তাহলে আর আমাদের কিছুই করার নেই। নিশ্চই হাশরের দিন আমরা আল্লাহর নিকট সাফ থাকব। আর যাদের বিবেকের দুয়ারে কড়া নাড়তে পেরেছি, যাদের কর্ণকূহরে আমাদের এই বার্তা পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি- তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- আলহামদুলিল্লাহ, আমরা আবার সেই হেদায়ার সন্ধান পেয়েছি, আমরা আবার মুক্তির পথ পেয়েছি। সেই মুক্তির পথ, সেই হেদায়াহর পথ, তওহীদের পথ হলো- হেযবুত তওহীদ আন্দোলন। আমরা আবার সেই কলেমার উপর, তওহীদের উপর ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানাচ্ছি। আসুন ঐক্যবদ্ধ হই। সংগ্রাম করে, জেহাদ করে আবার আল্লাহ ও তাঁর রসুলের (সা.) দেওয়া সত্যদ্বীন কায়েম করি।

