হোম » উম্মাহ ও সংস্কার » আইনি সংস্কারের দাবি এবং শরিয়াহর ভুল ব...

আইনি সংস্কারের দাবি এবং শরিয়াহর ভুল ব্যাখ্যা

auth রিয়াদুল হাসান ১৬ জুন ২০২৬
৯ মিনিটে পড়ুন
feature

আমাদের মনে রাখতে হবে- ইসলাম বাদী ও বিবাদী উভয়ের জন্যই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। বিবাদী যদি মানবতার বিরুদ্ধে এত বড় অপরাধ করে থাকে, তবে তার জন্য আল্লাহর নির্ধারিত দুনিয়াবী শাস্তি যেমন ভয়াবহ, আখিরাতের শাস্তিও তেমনি ভয়ঙ্কর।

বাংলাদেশে যখনই শিশু ধর্ষণ, পাশবিক হত্যাকাণ্ড বা এই জাতীয় কোনো চরম অমানবিক ঘটনা ঘটে, তখনই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমাজের বিভিন্ন মহল থেকে ‘শরিয়াহ আইন’ প্রবর্তনের জোরালো দাবি ওঠে। একই সাথে শরিয়াহ আইনের স্বরূপ নিয়ে জাতির মধ্যে এক অদ্ভুত মেরুকরণ সৃষ্টি হয়।

শরিয়াহ আইনের দাবিদারদের অধিকাংশই মনে করে, শরিয়াহর একমাত্র কাজ হলো দৃশ্যমান কিছু দণ্ডবিধি (হুদুদ) কার্যকর করা যেমন অপরাধীকে কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে প্রকাশ্যে পাথর ছুঁড়ে মৃত্যুদণ্ড (রজম) দেওয়া বা অঙ্গচ্ছেদ করা। তারা মধ্যপ্রাচ্য বা আরব দেশগুলোর বাহ্যিক কিছু দণ্ডের উদাহরণ দেন। তাদের ধারণা কেবল এই শাস্তিগুলো হুবহু বাস্তবায়ন করলেই সমাজ থেকে রাতারাতি সব অপরাধ দূর হয়ে যাবে। অপরপক্ষে, প্রগতিশীলতার ছদ্মাবরণে একদল ইসলামবিদ্বেষী এই বিতর্ককে ইসলামের ওপর এক হাত নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা সুকৌশলে অপপ্রচার চালায় যে, ইসলাম একটি চরম ‘নারীবিদ্বেষী’ ধর্ম। তাদের দাবি- ইসলামের শরিয়াহ আইন নাকি ধর্ষণের শিকার নারী অর্থাৎ ভিক্টিমকেই উল্টো ব্যভিচারের অভিযোগে সাজা দেয়। তারা প্রচার করে যে, শরিয়াহ অনুযায়ী চারজন চাক্ষুষ সাক্ষী ছাড়া ধর্ষণের কোনো বিচার করা সম্ভব নয় এবং ভিক্টিম যদি চারজন সাক্ষী হাজির করতে না পারে, তবে সে নিজেই আইনি ফাঁদে ফেঁসে যাবে।

বস্তুত, তাদের এই বিভ্রান্তিকর দাবির পেছনে মূল কারণ হলো- বিভিন্ন ফিকাহ ও ফতোয়ার গ্রন্থে শরিয়াহবিদদের দেওয়া কিছু খণ্ডিত ব্যাখ্যা এবং প্রচলিত বিধিবদ্ধ ইসলামী আইনে অনেক ক্ষেত্রে ব্যভিচার ও ধর্ষণকে একই শাস্তির আওতায় (যিনার হদ হিসেবে) বিবেচনা করা। অথচ এই দুটি অপরাধের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্যভিচার সংঘটিত হয় নর-নারীর পারস্পরিক সম্মতিতে ও ইচ্ছাকৃতভাবে, যেখানে উভয় পক্ষই সমান অপরাধী। অপরদিকে, ধর্ষণ হয় সম্পূর্ণ বলপূর্বক যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি একান্তই মজলুম এবং ইসলামী আইনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী এই অপরাধে তার কোনো দায় থাকে না।

মূলত, এই ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠী এবং একশ্রেণীর ফতোয়াবাজ সুরা আন-নূরের আয়াতগুলোর সম্পূর্ণ মনগড়া ও খণ্ডিত ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ব্যভিচারের (যিনা) শাস্তি ঘোষণা করে বলেছেন: ‘ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ- তাদের প্রত্যেককে একশত করে বেত্রাঘাত করো। আল্লাহর বিধান কার্যকর করতে গিয়ে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাকো…’ (সুরা আন-নূর, ২৪:২)।

“ব্যভিচার সংঘটিত হয় নর-নারীর পারস্পরিক সম্মতিতে ও ইচ্ছাকৃতভাবে, যেখানে উভয় পক্ষই সমান অপরাধী। অপরদিকে, ধর্ষণ হয় সম্পূর্ণ বলপূর্বক যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি একান্তই মজলুম এবং ইসলামী আইনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী এই অপরাধে তার কোনো দায় থাকে না। […] ধর্ষণের শিকার নারীর উপর হদ জারির দূরতম কোনো সম্ভাবনাও আল্লাহর দেওয়া শরিয়াহতে নেই।”

এই আয়াতে মহান আল্লাহ সুনির্দিষ্টভাবে পারস্পরিক সম্মতিতে সংঘটিত ‘ব্যভিচার’ বা যিনার দণ্ড নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু চরম বাস্তবতাবিবর্জিত কিছু শরিয়াহ আদালত ও ফতোয়াবাজেরা ‘ধর্ষণ’কেও এই আয়াতের অধীনে ব্যভিচার হিসেবে গণ্য করার এক মারাত্মক আইনি ভুল করে থাকে। তাদের এই ভ্রান্ত ফতোয়ার কারণেই অনেক শরিয়াহ আইন শাসিত দেশে ধর্ষিতাকেও উল্টো ব্যভিচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করে এই একশত বেত্রাঘাত করা হয় যা ইসলামের নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

একইসাথে তারা সুরা আন-নূরের ৪ নম্বর আয়াতটি টেনে এনে নিজেদের মনগড়া ভ্রান্ত ফতোয়াকে আরও বিভ্রান্তিকর করে তোলে; যেখানে বলা হয়েছে: “যারা সাধ্বী নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত না করে, তোমরা তাদেরকে আশিটি বেত লাগাও…” (সুরা আন-নূর, ২৪:৪)

স্পষ্টতই, এই আয়াতে মহান আল্লাহ ব্যভিচারের ‘অপবাদ’ (কাযফ) দেওয়ার শাস্তির বিষয়ে বলেছেন, ধর্ষণের বিচারের শর্ত হিসেবে নয়। যেহেতু ইসলামে ব্যভিচারের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর- একশত বেত্রাঘাত, যা কার্যকর করার সময় অপরাধীর মৃত্যুরও সম্ভাবনা থাকে- তাই কোনো নারীর চরিত্রে কেউ যেন মিথ্যা কলঙ্ক লেপন করতে না পারে, সেজন্যই আল্লাহ চারজন চাক্ষুষ পুরুষ সাক্ষীর এই অলঙ্ঘনীয় শর্ত দিয়েছেন। যদি কেউ চারজন পুরুষ সাক্ষী আনতে না পারে, তবে অপবাদ দানকারীকেই উল্টো আশিটি বেত্রাঘাতের মুখোমুখি হতে হবে। বিনা অপরাধে অন্যের দেওয়া অপবাদে কোনো নারী যেন শাস্তির মুখোমুখি না হন, মূলত নারীর সম্ভ্রম রক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই আল্লাহ এই কঠিন রক্ষাকবচ তৈরি করেছেন।

অথচ বলপূর্বক ‘ধর্ষণ’কে যখন সাধারণ ব্যভিচারের সমপর্যায়ে দাঁড় করানো হলো, তখন এক চরম বিচারহীনতার ট্র্যাজেডি তৈরি হলো। এখন ধর্ষণের শিকার একজন মজলুম নারীকে বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো চারজন পুরুষ সাক্ষী হাজির করতে বলা হচ্ছে- যা বাস্তবে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এখানেই শেষ নয়, ফতোয়া বিশেষজ্ঞরা আরও চুলচেরা গবেষণা করে শর্ত জুড়ে দিয়েছেন যে হদ ও কিসাসের (শাস্তিমূলক ফৌজদারি অপরাধ) ক্ষেত্রে কোনো নারীর সাক্ষ্যই গ্রহণযোগ্য নয়; যদিও পবিত্র কোরআনে এমন লিঙ্গভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা নেই। এরপর বলা হচ্ছে যে, সেই পুরুষ সাক্ষীদেরও আবার চরম পুণ্যবান, খাঁটি দ্বীনদার ও সমাজস্বীকৃত ন্যায়বিচারক (আদিল) হতে হবে। ফলশ্রুতিতে, কোরআনের যে আয়াতটি নাজিল হয়েছিল নারীকে মিথ্যা অপবাদ থেকে ‘সুরক্ষা’ দিতে, প্রতিক্রিয়াশীল ও সংকীর্ণ ফতোয়ার বেড়াজালে আটকে আজ সেই আয়াতটিকেই অস্ত্র বানিয়ে প্রচলিত তথাকথিত শরিয়াহ আইনে ধর্ষিতা নারীর ন্যায়বিচার লাভের পথ প্রায় চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

অপব্যাখ্যার অপনোদন:

বস্তুত ইসলামে পারস্পরিক সম্মতিতে হওয়া ব্যভিচার (যার শাস্তি ১০০ বেত) এবং বলপ্রয়োগ বা অস্ত্রের মুখে হওয়া ধর্ষণের আইনি পরিভাষা ও ট্রায়াল সম্পূর্ণ আলাদা। ধর্ষণ মূলত ‘ইকরাহ আল-যিনা’ (জোরপূর্বক ব্যভিচার) অথবা ‘হিরাবাহ’ (সশস্ত্র ডাকাতি ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অপরাধ)-এর আওতাভুক্ত। ইসলামের চিরন্তন নীতি হলো- এই দীনে কোনো জবরদস্তি নেই। এ নীতির আলোকে রসুলাল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুলত্রুটি, ভুলে যাওয়া বিষয় এবং যে বিষয়ে তাদের বাধ্য করা বা জোর করা হয়েছে (ইকরাহ), তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।” (ইবনে মাজাহ)। সুতরাং, ধর্ষণের শিকার নারীর উপর হদ জারির দূরতম কোনো সম্ভাবনাও আল্লাহর দেওয়া শরিয়াহতে নেই। গাজী শামসুর রহমান তাঁর লেখা বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ের ১৩শ ধারায় ধর্ষণকে ‘হিরাবাহ’ এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন, “‘হিরাবাহ্‌’ বলিতে সংঘবদ্ধ শক্তির জোরে আক্রমণ চালাইয়া আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাইয়া জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা বোঝায়। সম্পদ লুণ্ঠন, শ্লীলতাহানি, হত্যা ও রক্তপাত ইহার অন্তর্ভুক্ত।” ধর্ম ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর উসকানিতে আমাদের দেশে তথাকথিত ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে আকসার যে মব জাস্টিস বা মব সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে, তা ইসলামী শরীয়ার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘হিরাবাহ’ (ফাসাদ ফিল আরদ)-এর অন্তর্ভুক্ত।

পবিত্র কোর’আনের সুরা আল-মায়েদাহ-এর ৩৩ নম্বর আয়াতে হিরাবাহ-এর অপরাধীদের জন্য সুনির্দিষ্ট চার ধরনের কঠোর শাস্তির বিধান ঘোষণা করা হয়েছে। অপরাধের ধরন, মাত্রা ও ভয়াবহতার ওপর ভিত্তি করে বিচারক বা রাষ্ট্র এই শাস্তিগুলো প্রয়োগ করবেন। আল্লাহ বলেন, “যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ (হিরাবাহ) করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এটি দুনিয়ায় তাদের জন্য লাঞ্ছনা এবং আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।”

ইসলামী শরীয়াহর অন্যতম প্রধান ধারা (বিশেষত মালিকী ফিকহ ও আধুনিক আইনবিদদের মতে), বলপ্রয়োগ বা অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে সংঘটিত ধর্ষণকে ‘হিরাবাহ’ বা সমাজবিধ্বংসী, বিপর্যয় সৃষ্টিকারী অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। সুতরাং, হিরাবাহ-এর বিধান মোতাবেক ধর্ষককেও তার অপরাধের ধরণ ও ভয়াবহতা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড, জনসমক্ষে ক্রুশবিদ্ধকরণ, বিপরীত দিক থেকে হাত ও পা কেটে ফেলা অথবা সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডে দণ্ডিত করাই আল্লাহর নাজিলকৃত শরিয়াহ।

প্রগতিশীল মহল কিছু প্রচলিত ভ্রান্ত ফতোয়া দেখিয়ে দাবি করতে চায় যে, আল্লাহর আইন আধুনিক যুগে অনুপযোগী। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো- মানবরচিত ত্রুটিপূর্ণ আইন ও দীর্ঘসূত্রী বিচারব্যবস্থার কারণেই মানুষ আজ অবিচারের শিকার হচ্ছে, যার বড় প্রমাণ বাংলাদেশের আদালত। বিচার বিভাগীয় সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বর্তমানে ১ লাখ ৫১ হাজার ৩১৭টি মামলা নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় ঝুলছে, যার মধ্যে ৩০ হাজারেরই বয়স ৫ বছরের বেশি।

১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, একটি মামলার গড় নিষ্পত্তিকাল প্রায় ১,৩৭০ দিন (পৌনে চার বছর) এবং রায়ের জন্য গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ বদলাতে হয়। এত কিছুর পরও এই আইনে অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে চূড়ান্ত দণ্ডপ্রাপ্তির হার মাত্র ৩ শতাংশ; বাকি সিংহভাগ মামলাই প্রমাণের অভাবে টিকে থাকতে পারে না।

এই বিপুল মামলার নেপথ্যের সামাজিক চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। লিগ্যাল এইড ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পর্যালোচনা থেকে দেখা যায়, এসব মামলার একটি বড় অংশই পারিবারিক কলহ, জমিজমা বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে দায়ের করা ভুয়া অভিযোগ। এমনকি ‘ব্লাস্ট’-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মামলাই শেষ পর্যন্ত ভিত্তিহীন বা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। অ-জামিনযোগ্য এই আইনের অপপ্রয়োগের কারণে একদিকে যেমন বহু নিরপরাধ ব্যক্তি বিনাবিচারে সামাজিক ও মানসিকভাবে ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি ভুয়া মামলার পাহাড়ে চাপা পড়ে প্রকৃত নির্যাতনের শিকার মজলুম নারীরা চিরতরে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও গভীর হচ্ছে।

বাংলাদেশে গত ২০ মাসে ১,৮৯০ শিশু বলাৎকার ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৬৪৩ শিশু প্রাণ হারিয়েছে (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন)। এর মধ্যে গত চার মাসে ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং খুন হয়েছে ১৭ জন (সূত্র: বিবিসি)। সাম্প্রতিক সময়ে রামিসার ঘটনা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে এবং কন্যা সন্তানের বাবা-মাদেরকে ট্রমার দিকে ঠেলে দিয়েছে। রামিসার মতো একটি সাত বছরের কন্যাসন্তান, এমনকি চার বছরের অবুঝ শিশুদেরকে যখন পাশবিকভাবে ধর্ষণ করা হয়, তখন তাদের ক্ষেত্রে কি সাধারণ ব্যভিচারের আইন প্রযোজ্য হওয়া যুক্তিসঙ্গত? অবশ্যই নয়। সুতরাং আল্লাহর বিধান এমন অযৌক্তিক আইন থাকা অসম্ভব। বস্তুত আল্লাহর শরীয়াহ মোতাবেক এসব ঘটনা সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি তথা ‘হিরাবাহ’-এর আওতাভুক্ত। কেননা এ অপরাধ সমাজ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ। কারণ, এই ধর্ষকেরা কেবল একজন ব্যক্তির ক্ষতি করছে না, বরং তারা পুরো সমাজের শান্তি, নিরাপত্তা এবং জনজীবনকে জিম্মি করে ফেলছে। মালিকী মাযহাবের বিখ্যাত ফকীহ ইবনুল আরাবী (রহ.) এ বিষয়ে খুব স্পষ্ট করে বলেছেন: “ধর্ষণ বা জোরপূর্বক শ্লীলতাহানি হলো হিরাবাহ-এর সবচেয়ে মারাত্মক রূপ। কারণ ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করা হলে তা ফেরত পাওয়া সম্ভব, কিন্তু একজন মানুষের ইজ্জত বা সম্ভ্রমহানি করা হলে তা আর কখনো ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।”

একটি অপরাধের ভয়াবহতার বিভিন্ন মাত্রা থাকে। যেমন- যদি ধর্ষণের পর সেই শিশু বা নারীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, তবে সেখানে স্বভাবতই ‘জানের বদলে জান’- এই বিধান প্রযোজ্য হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “কুতিবা ‘আলাইকুমুল কিসাসু ফিল কাতলা” (সুরা বাকারা ১৭৮)। ‘কিসাস’ অর্থ সমপরিমাণ প্রতিশোধ। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ আরও স্পষ্ট করেছেন: “আমি তাদের জন্য তাওরাতে বিধান দিয়েছিলাম যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং জখমসমূহের বদলে সমপরিমাণ জখম (কিসাস)। অতঃপর যে তা ক্ষমা করে দেবে তা তার জন্য কাফফারা (পাপমোচন) হয়ে যাবে। আর আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সেই অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না, তারাই জালিম (সীমালঙ্ঘনকারী)।” (সুরা মায়েদাহ ৪৫)। কিসাসের নীতি মোতাবেক এই নরপিশাচ ধর্ষক ও খুনি অবশ্যই প্রতিটি আঘাতের বদলে সমপরিমাণ আঘাত পাবে। তাহলেই সেটা হবে ন্যায়বিচার।

অথচ এই অকাট্য বিধানের পরও একদল ইসলামবিদ্বেষী এবং একশ্রেণীর তথাকথিত মুফতি অবলীলায় দাবি করতে চান যে- চারজন পুরুষ সাক্ষী হাজির না করতে পারলে নাকি শরীয়াহ আইনে ধর্ষণের বিচারই হবে না! প্রশ্ন জাগে, ইসলামের আইন কি অপরাধীর অপরাধ আড়াল করার বা গোনাহ ঢাকার আইন? আফসোসের বিষয় হলো, অনেক আলেমও এই আধুনিক ও যৌক্তিক প্রশ্নগুলোর সঠিক ফিকহী জবাব সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারেন না।

আমাদের মনে রাখতে হবে- ইসলাম বাদী ও বিবাদী উভয়ের জন্যই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। বিবাদী যদি মানবতার বিরুদ্ধে এত বড় অপরাধ করে থাকে, তবে তার জন্য আল্লাহর নির্ধারিত দুনিয়াবী শাস্তি যেমন ভয়াবহ, আখিরাতের শাস্তিও তেমনি ভয়ঙ্কর।

টপিক: অপরাধন্যায়বিচারশরীয়াহ
×
QR কোড স্ক্যান করুন