হোম » আকিদা » কোরআনের প্রতিশ্রুতি বনাম বর্তমান মুসল...
আমরা কি প্রকৃত মো’মেন?

কোরআনের প্রতিশ্রুতি বনাম বর্তমান মুসলিম বিশ্ব

auth রাকীব আল হাসান ১৫ জুন ২০২৬
৬ মিনিটে পড়ুন
feature

বর্তমান মুসলিম বিশ্বের এই করুণ পরিণতি কোনো নিয়তির নির্মম পরিহাস নয়, বরং তা আল্লাহর বিধান থেকে দূরে সরে যাওয়ারই অবশ্যম্ভাবী ফসল। আমরা নামের শেষে মুসলিম পদবি লাগিয়ে এবং জন্মসূত্রে মুসলিম হয়েই নিজেদের মো’মেন ভেবে আত্মতুষ্টিতে ভুগছি। অথচ মো’মেন হওয়া একটি অর্জন, যা নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও জীবন-সম্পদ দিয়ে জেহাদের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়।

ইতিহাস সাক্ষী, যে জাতি একসময় অর্ধপৃথিবী শাসন করেছে, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা ও মানবিকতার আলো দিয়ে বিশ্বকে আলোকিত করেছে, আজ সেই জাতির দিকে তাকালে কেবলই হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া, লাঞ্ছিত এবং অধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে মুসলিম। অথচ এই জাতির ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোর’আনজুড়েই রয়েছে মো’মেনদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর অগণিত সুস্পষ্ট ও সুনিশ্চিত প্রতিশ্রুতি। কোর’আনের পাতা উল্টালে মো’মেনদের বিজয়ের যে শাশ্বত ঘোষণা আমরা দেখতে পাই, তার সাথে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অবমাননাকর বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এই বৈপরীত্য আজ প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষের মনে একটি গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়- কোথায় হারিয়ে গেল সেই প্রতিশ্রুতি, নাকি আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের প্রকৃত পরিচয়?

মো’মেনদের সাথে আল্লাহর শাশ্বত প্রতিশ্রুতি:

পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মো’মেনদেরকে দুনিয়ার বুকে সম্মান, বিজয় ও নেতৃত্বের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সুরা নূরের ৫৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “যারা ঈমান আনে ও আমলে সালেহ করে (অর্থাৎ যারা মো’মেন) তাদের সাথে আল্লাহর ওয়াদা এই যে, তাদেরকে তিনি এই পৃথিবীতে খেলাফত বা শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন, যেমনটি তিনি পূর্ববর্তীদের দান করেছিলেন।” সুরা আল-ইমরানের ১৩৯ নম্বর আয়াতে তিনি বলেছেন, “তোমরা হীনবল হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা (প্রকৃত) মো’মেন হও।”

এছাড়াও সুরা মুহাম্মদের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নিজেকে মো’মেনদের ‘ওয়ালি’ বা অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সুরা সাফ-এর ১০-১২ আয়াতে আল্লাহ মো’মেনদের পাপমোচন, আসন্ন বিজয় এবং পরকালে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। যারা আল্লাহর পথে হিজরত করবে, সুরা নাহ’লের ৪১ নং আয়াতে- তাদের জন্য দুনিয়াতেই উত্তম আবাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও কোর’আনে রয়েছে। অর্থাৎ, একটি জাতির সার্বিক নিরাপত্তা, সম্মান, রাষ্ট্রক্ষমতা ও বিজয়ের সমস্ত গ্যারান্টি আল্লাহ মো’মেনদের দিয়েছেন।

বর্তমান বাস্তবতা: নিগৃহীত ও শতধা বিচ্ছিন্ন এক গোলাম জাতি আমরা কোরআনের এই প্রতিশ্রুতির বিপরীতে আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে এক ভয়ংকর চিত্র ফুটে ওঠে। সমগ্র পৃথিবীতে ‘মুসলিম’ দাবিদার এই জাতি আজ অন্য সকল জাতির কাছে সবচেয়ে বেশি মার খাচ্ছে, অপমানিত ও নিপীড়িত হচ্ছে।

কাশ্মিরের অবরুদ্ধ উপত্যকা, চীনের কাশগড় বা শিনজিয়াং প্রদেশের বন্দিশিবির, ফিলিস্তিনের রক্তাক্ত প্রান্তর, মিয়ানমারের রাখাইনে জাতিগত নিধন, বসনিয়া-চেচনিয়ার নির্মম গণহত্যা কিংবা কাম্পুচিয়ায় (কম্বোডিয়া) মুসলিমদের মুছে ফেলার ইতিহাস- সর্বত্রই যেন মুসলিমদের রক্ত আর কান্নার স্রোত। এই জাতির একটার পর একটা স্বাধীন ভূখণ্ড ইহুদি-খ্রিষ্টান ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর আগ্রাসনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, লিবিয়া, তিউনিশিয়া, ইয়েমেন এবং আফগানিস্তানের মতো সমৃদ্ধ জনপদগুলো আজ পরিণত হয়েছে মৃত্যু উপত্যকা ও ধ্বংসস্তূপে।

বহিঃশত্রুর আক্রমণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণভাবেও এরা আজ অন্তঃসারশূন্য। নিজেদের মধ্যে হানাহানি, ফেরকাভিত্তিক মারামারি আর রক্তপাতে এরা লিপ্ত। যে জাতির হওয়ার কথা ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদর্শ, তাদের সমাজ আজ চুরি, ডাকাতি, হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, মাদক, সুদ-ঘুষ আর চরম দুর্নীতিতে নিমজ্জিত।

প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার সংঘাত: যৌক্তিক বিশ্লেষণ

এখানেই আসে সবচেয়ে বড় যৌক্তিক ও বিশ্বাসগত প্রশ্ন। কোর’আনে মো’মেনদের জন্য বিজয়ের প্রতিশ্রুতি, আর বাস্তবে মুসলিমদের এই চরম পরাজয়- এই দুইয়ের সমন্বয় কীভাবে হবে? আল্লাহর প্রতিশ্রুতি কি তাহলে মিথ্যা? (নাউযুবিল্লাহ)। একজন বিশ্বাসী মাত্রই জানেন, আল্লাহ কখনোই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। কোর’আনে আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ওয়াদা খেলাফ করেন না।” (সুরা আল-ইমরান-৯, সুরা রাদ-৩১সহ আরও অনেক আয়াতে)। তাহলে সাধারণ যুক্তি ও সমীকরণ বলে- আল্লাহ প্রতিশ্রুতি যেহেতু সত্য, তার মানে আমরা যারা নিজেদের মো’মেন বলে দাবি করছি, আমাদের দাবিতেই গলদ রয়েছে। অর্থাৎ, কোর’আনের দৃষ্টিতে আমরা আসলে ‘মো’মেন’ নই।

আমরা মো’মেন নই কেন?

কোর’আনের আলোকে মুমিনের সংজ্ঞা:

আমরা কেন মো’মেন নই, তার উত্তর আল্লাহ নিজেই কোর’আনে দিয়ে দিয়েছেন। সুরা হুজুরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ প্রকৃত মুমিনের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বলেছেন: “মো’মেন তো কেবল তারাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি ঈমান এনেছে, এরপর কোনো সন্দেহ পোষণ করেনি এবং নিজেদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ (সর্বাত্মক প্রচেষ্টা) করেছে। এরাই হলো সত্যনিষ্ঠ।”

এখানে ‘আল্লাহর ওপর ঈমান’ বলতে কেবল তাঁকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মৌখিকভাবে স্বীকার করাকে বোঝায় না। বরং এখানে আল্লাহর ‘উলুহিয়্যাত’ বা ইলাহ হিসেবে তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যের ওপর ঈমান আনার কথা বলা হয়েছে। ইলাহ বা চূড়ান্ত বিধানদাতা কেবল আল্লাহ- রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা সবকিছু পরিচালিত হবে আল্লাহর হুকুমে এবং তাঁর রসুলের (সা.) সুন্নাহ বা কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী।

কিন্তু আজকের মুসলিম সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমরা ব্যক্তিগত জীবনে নামাজ-রোজা করলেও, আমাদের সমাজ, অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থা থেকে আল্লাহর হুকুম বা বিধানকে নির্বাসিত করেছি। আমরা আল্লাহর দেওয়া ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থাকে দূরে ঠেলে দিয়ে ইহুদি-খ্রিষ্টান ও পাশ্চাত্য সভ্যতার তৈরি করা বস্তুবাদী ও মানবসৃষ্ট জীবনব্যবস্থাকে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠা করেছি। সুদী অর্থনীতি, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজব্যবস্থা এবং অশ্লীল পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে সানন্দে আপন করে নিয়েছি। যেহেতু আমরা আল্লাহর উলুহিয়্যাতকে কার্যত অস্বীকার করে অন্য বিধানকে গ্রহণ করেছি এবং জান-মাল দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার বদলে দুনিয়ার মোহ ও ভোগবিলাসে মত্ত হয়েছি, সেহেতু কোর’আনের সংজ্ঞানুযায়ী আমরা আর ‘প্রকৃত মো’মেন’ নেই। আর আমরা যখন মো’মেন হওয়ার শর্তই পূরণ করতে পারিনি, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজয় ও খেলাফতের প্রতিশ্রুতি পূরণেরও আর কোনো যৌক্তিক কারণ অবশিষ্ট নেই।

আমরা যদি মো’মেন না হই তাহলে আমরা কী?

মহান আল্লাহ বলেছেন, “তিনি (আল্লাহ) তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ কাফের, কেউ মো’মেন।” অর্থাৎ আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষ ২ প্রকার- মো’মেন ও কাফের। তাহলে কোর’আনের এই ভাষ্য অনুযায়ী আপনি যদি আল্লাহর দেওয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী মো’মেন না হন তাহলে অবশ্যই আপনি কাফের। তাছাড়া আল্লাহ কাফেরের সংজ্ঞাও পবিত্র কোর’আনে সুস্পষ্টভাবেই দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “যারা আল্লাহর নাজেল করা বিধান মোতাবেক বিচার-ফায়সালা করে না তারা কাফের।” (সুরা মায়েদা-৪৪)। আল্লাহর দেওয়া এই সংজ্ঞা মোতাবেক যারা আল্লাহর হুকুম-বিধান, আইন-কানুন বাদ দিয়ে মানুষের তৈরি করা জীবনব্যবস্থা মেনে নেবে তারা কাফের। সুতরাং উভয় দিক থেকেই এটা প্রমাণিত হলো যে, আমরা মো’মেন নেই, আর মো’মেন নেই মানেই হলো আমরা কাফের।

তাহলে এখন আমাদের করণীয় কী?

বর্তমান মুসলিম বিশ্বের এই করুণ পরিণতি কোনো নিয়তির নির্মম পরিহাস নয়, বরং তা আল্লাহর বিধান থেকে দূরে সরে যাওয়ারই অবশ্যম্ভাবী ফসল। আমরা নামের শেষে মুসলিম পদবি লাগিয়ে এবং জন্মসূত্রে মুসলিম হয়েই নিজেদের মো’মেন ভেবে আত্মতুষ্টিতে ভুগছি। অথচ মো’মেন হওয়া একটি অর্জন, যা নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও জীবন-সম্পদ দিয়ে জেহাদের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়। যতদিন পর্যন্ত এই জাতি বিজাতীয়দের তৈরি করা ভ্রান্ত জীবনব্যবস্থা পরিহার করে পুনরায় আল্লাহকে চূড়ান্ত বিধানদাতা হিসেবে গ্রহণ না করবে এবং রসুলের (সা.) প্রদর্শিত কর্মনীতির ওপর ভিত্তি করে জান ও মাল দিয়ে সংগ্রাম না করবে, ততদিন এই অবমাননা ও লাঞ্ছনা থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি আজও অটুট রয়েছে, কেবল অপেক্ষা সেই প্রতিশ্রুত প্রকৃত মো’মেনদের। এই মহাসত্যটা কেউ তুলে ধরছে না, বরং আমাদের ওলামা শ্রেণি আমাদেরকে মো’মেন-মুসলিমের সার্টিফিকেট ধরিয়ে দিয়ে অর্থ উপার্জন করে খাচ্ছে। তাহলে আমরা এই মহাসত্য কোথায় পেলাম? এই মহাসত্য তুলে ধরেছেন হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাতা এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। মহান আল্লাহ তাঁকে এই মহাসত্য বুঝিয়েছেন। তিনি পৃথিবী থেকে চলে যাবার পর এই আন্দোলনের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করছেন মাননীয় এমামের হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। তাঁর পক্ষ থেকে আমরা মানুষকে এই তওহীদের দিকে আহ্বান করছি। তওহীদের এই ডাকে যাদের হৃদয়তন্ত্রিতে ঝংকার উঠবে, হেদায়াতের জন্য মন আকুল হবে তাদের প্রতি হেযবুত তওহীদের পক্ষ থেকে আমাদের এই ঐক্যের পথে আহ্বান।

×
QR কোড স্ক্যান করুন