- মুহাম্মদ (স): মক্কার আল-আমিন
- সেই হেরা গুহায় এলো প্রথম বার্তা!
- এলো মুক্তির ডাক!
- মক্কায় সীমাহীন নির্যাতনেও অটল-অবিচল!
- শুরু হলো দীন প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রাম
- দীন কায়েমের ফলাফল কি হয়েছিল?
- দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লো উম্মতে মুহাম্মাদী
- অতঃপর ঘটে গেল দুর্ভাগ্যজনক অধঃপতন
- শুরু হলো শত্রুর আক্রমণ
- ফিরে এলো সেই জাহেলিয়াত
- জাতির মুক্তির উপায় কী?
- সত্যদীন প্রতিষ্ঠায় আমাদের আহ্বান
আরবের জাহেলি সমাজ। যে সমাজে ছিল না ঐক্য, শৃঙ্খলা, শান্তি, নিরাপত্তা। ছিল না মানবতা-মানবাধিকার। মানুষগুলো ছিল অভাব ও দারিদ্র্যে নিমজ্জিত। ছোট-বড় বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়ে তারা তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে এক গোত্র আরেক গোত্রের সঙ্গে যুদ্ধ, রক্তপাত করতো। চুরি-ডাকাতি, ব্যভিচার, মদ্যপান ছিল স্বাভাবিক ও সিদ্ধ বিষয়। সেই সমাজে নারীদের কোন নিরাপত্তা ছিল না, ইজ্জত-সম্মান ছিল না। তাদের মনে করা হতো ভোগের বস্তু। কন্যা শিশু জন্ম নিলে অনেক পিতা নবজাতক শিশুকে মাটি চাপা দিয়ে দিতো। সেখানে দাসব্যবসা প্রচলিত ছিল। হাটে বাজারে গরু বকরির মতো মানুষ (দাস) বিক্রি হতো। মদ্যপান ছিল তাদের নিত্য আহার্যের অংশ। দুনিয়ার এমন কোন অপরাধ নাই যা সেখানে প্রচলিত ছিল না। তারা ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে অসভ্য, অশিক্ষিত, বর্বর, পশ্চাৎপদ জাতি।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এমন একটা জাতি একজন মহামানবের আগমনে হঠাৎ করে বদলে গিয়েছিল। অল্প সময়ের ব্যবধানে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য, শিক্ষিত, শক্তিশালী, সম্মানিত জাতি হয়ে উঠেছিল। শৃঙ্খলায়, ঐক্যে, ভ্রাতৃত্বে, দয়ায়, মায়ায়, সামরিক শক্তিতে, প্রযুক্তিতে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারা হয়ে উঠেছিল বিশ্বের রোলমডেল। প্রশ্ন হচ্ছে কি এমন আদর্শ তারা পেয়েছিল যার শক্তিতে তারা এতটা বদলে গিয়েছিল? কোন্ পরশ পাথরের ছোঁয়ায় পৃথিবীর সবচেয়ে বর্বর মানুষগুলো ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষ হয়ে উঠেছিল? তার উত্তরটাই আজকের এই লেখার মধ্যে আমি তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আমি আশা করছি, পাঠকেরা মনোযোগ দিয়ে সম্পূর্ণ লেখাটি পড়বেন এবং ইতিহাসের এই অভাবনীয় ঘটনাকে মূল্যায়ন করবেন।
মুহাম্মদ (স): মক্কার আল-আমিন
আরবের জাহেলি সমাজে জন্ম নেয়া একজন মানুষ, যার নাম ছিল হযরত মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (স)। আরবের অভিজাত কুরাইশ বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পূর্বেই তিনি পিতাকে হারান। অল্প বয়সে মাকেও হারান। অতঃপর দাদা-চাচার কোলে বড় হন।
এতিম মুহাম্মদ (স) বালক বয়সে মাঠে বকরি চরাতেন। চাচা আবু তালিবের কাজে-কর্মে সহযোগিতা করতেন। বাইরে থেকে দেখতে আরবের আর দশজন বালক থেকে খুব বেশি আলাদা ছিলেন না তিনি। তবে তাঁর কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চিন্তাভাবনা ছিল অন্যদের থেকে ভিন্ন। সমাজের অবক্ষয়, অসঙ্গতি, অন্যায়, অবিচার, জুলুম তাকে ব্যথিত করতো।
জাহেলি সমাজে বেড়ে উঠলেও তিনি কখনো মূর্তিপূজা মদ্যপান, চুরি-ব্যভিচারের মতো অশালীন কাজে লিপ্ত হন নি। ঘুণে ধরা সমাজের অসঙ্গতি ও অন্যায়গুলো তার কাছে স্পষ্ট ছিল, কিন্তু এসব থেকে মানুষকে মুক্তি দেবার কোনো পথ তার জানা ছিল না। যুবক বয়সে একবার এই লক্ষ্যে হিলফুল ফুযুল নামে একটি সংগঠন তিনি গড়ে তুলেছিলেন। খুব চেষ্টা করেছিলেন সমাজে একটা পরিবর্তন আনতে। কিন্তু সফল হতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তা বন্ধ করে দেন।
“ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তন, অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। মুক্তির জন্য প্রয়োজন গোটা সিস্টেমের আমূল পরিবর্তন, মূলনীতির পরিবর্তন, বৈপ্লবিক পরিবর্তন। যেটা রাসুলুল্লাহ (সা:) করে গিয়েছিলেন।”
এদিকে চাচার সংসারে ছিল অভাব অনটন। যে কারণে বাল্যকাল থেকেই চাচার ব্যবসায়িক কাজে সহযোগিতা করতেন তিনি। ফলে অল্প বয়সেই ব্যবসা-বাণিজ্যে হাতেখড়ি হয়। এবং একটা সময় সৎ, দক্ষ, নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল ব্যবসায়ী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
কেবল ব্যবসা বাণিজ্য নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও অসম্ভব সদাচারী, সাহসী, বিনয়ী, আমানতদার, সত্যবাদী ও সজ্জন হিসেবে গোটা মক্কায় পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। মক্কার লোকেরা তাঁর উপাধী দেয় আল-আমিন (বিশ্বাসী)। তাঁর এই সততা, বিশ্বস্ততা, আমানতদারিতায় মুগ্ধ হয়ে কোরায়েশদের ধনী ব্যবসায়ী খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা:) তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। তারা পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হোন। মুহাম্মদ (স:)-এর বয়স তখন ২৫ বছর, আর খাদিজা (রা:) ছিলেন ৪০।
এদিকে ব্যবসা, বাণিজ্য, সংসার- সবকিছু স্বাভাবিক গতিতে চললেও সমাজ ও মানুষকে নিয়ে যে চিন্তা-ভাবনা ও অস্থিরতা তাঁর মধ্যে ছিল, তা থেকে তিনি বের হতে পারেন নি। মাঝেমধ্যেই তিনি চলে যেতেন লোকালয় থেকে দূরে পাহাড়ি উপত্যকায়। হেরা পাহাড়ের নির্জন গুহায় বসে নীরবে তিনি চিন্তা-ভাবনা করতেন, ধ্যান করতেন। আর কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াতেন- কী কারণে মানুষের এই অবক্ষয়? কেন মানুষে মানুষে এত রক্তপাত, এত খুনোখুনি? কি করলে বন্ধ হবে এই অশান্তি?
এদিকে খাদিজা (রা) তাঁর স্বামীর চরিত্র, চিন্তাধারা, কাজকর্ম, সততা, বিশ্বস্ততা- সবকিছুতে মুগ্ধ ছিলেন। তিনি বুঝতেন, এই মানুষটি অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি চিন্তা করেন মানুষকে নিয়ে, সমাজকে নিয়ে। ঠিক অতীতের মহামানবরা যা করতেন। এই উপলব্ধি খাদিজার (রা) হৃদয়ে স্বামীর প্রতি অন্যরকম একটা শ্রদ্ধার জন্ম দেয়। এই যে মাঝেমধ্যেই তিনি ঘর-সংসার ছেড়ে হেরা গুহায় চলে যেতেন, একাকী ধ্যান করতেন, এসবকে তিনি পাগলামি মনে না করে বরং তাতে সহযোগিতা করেন। পাহাড়ের পাথুরে পথ বেয়ে তাঁর জন্য খাবার নিয়ে যেতেন!
সেই হেরা গুহায় এলো প্রথম বার্তা!
মুহাম্মদ (স) তখন ৪০ বছরের পরিপূর্ণ যুবক। অন্যদিনের মতো সেই রাতেও তিনি ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। হঠাৎ উপস্থিত হলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। একজন ফেরেশতা আসলেন আর উচ্চারণ করলেন- পড়ুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।
মুহাম্মদ (স) এই অভাবনীয় ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। রাতের নির্জন পাহাড়ি গুহায় তিনি সম্পূর্ণ একা ছিলেন। এই ঘটনায় তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। ছুটে বাড়ি চলে আসলেন। কাঁপতে কাঁপতে স্ত্রীকে বললেন, আমাকে কম্বলে আবৃত করো। আমার ভয় করছে!
ঘটনা শোনার পর স্ত্রী তাঁকে আশ্বস্ত করলেন। পরিচিত বিজ্ঞজনদের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলেন। বিজ্ঞজনেরা বিস্তারিত শোনার পর মন্তব্য করলেন, এটা নবুওয়াতের ইঙ্গিত। তাঁর কাছে যিনি এসেছেন তিনি নিশ্চয়ই সেই স্বত্তা যিনি পূর্ববর্তী নবী রসুলদের নিকটেও আসতেন।
তাদের এই ধারণা সত্য হলো। পরবর্তীতে যখন পুনরায় সেই ফেরেশতা আসলেন, তখন মুহাম্মদ (স) নিশ্চিত হলেন- বিজ্ঞজনেরা যা বলেছেন তা সত্য। তিনি বুঝলেন- তিনি আল্লাহর মনোনীত রসুল। তিনি বুঝলেন- মুক্তি পথ চলে এসেছে, যে পথ তিনি এতকাল খুঁজে বেরিয়েছেন।
এলো মুক্তির ডাক!
হযরত মুহাম্মদ (স) প্রথমে কেবল নিজের পরিবার ও স্বজনদের মাঝে নতুন দীনের প্রচার শুরু করেন। এবং সেটা গোপনে। একটা সময় নির্দেশ এলো- এবার প্রকাশ্যে প্রচার করো। অতঃপর তিনি সাফা পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে প্রথমবারের মতো উচ্চারণ করলেন তওহীদের ডাক। মক্কাবাসীর উদ্দেশে তিনি বললেন- আমি তোমাদের কাছে এমন জিনিস নিয়ে এসেছি যা তোমাদের ইহকালের জন্য কল্যাণকর হবে এবং পরকালে তোমাদেরকে মুক্তি দিবে! “জি সেই জিনিস?” তিনি বললেন- “তোমরা বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (স)।”
এই যে কলেমার ডাক তিনি দিলেন, তওহীদের বাণী ঘোষণা করলেন, এটাই ছিল মানুষের মুক্তির মূলমন্ত্র। এটাই ছিল সকল সংকট সমাধানের মূলসূত্র। যার অর্থ ও তাৎপর্য এই- “আল্লাহ ছাড়া কোনো বিধানদাতা নেই, হুকুমদাতা নেই। আল্লাহ ছাড়া কারো হুকুম মানি না। আল্লাহই একমাত্র সার্বভৌমত্বের মালিক। তাঁর আনুগত্য ছাড়া আর কারো আনুগত্য করা যাবে না। তাঁর রাসুল হিসেবে মুহাম্মদ (স) তাঁর কাছ থেকে যে বিধান নিয়ে এসেছেন তা মেনে নাও, তবেই দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হবে।”
এই যে মক্কার জনগণ, যাদের সামনে রাসুলুল্লাহ (স) কলেমার ডাক তুলে ধরলেন, তারাও কিন্তু আল্লাহকে বিশ্বাস করতো। মিল্লাতে ইব্রাহিমের অনুসারী হিসেবে তারা নামাজ পড়তো, হজ করতো, রোজা রাখতো। সেই মানুষগুলোই রাসুলুল্লাহর এই ডাক শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো। তারা তাঁকে অপমান করলো, তাঁর উপর হামলা করলো, তাঁকে ও তাঁর সাহাবীদেরকে সীমাহীন নির্যাতন করলো। নবুওয়াত পাওয়ার পর প্রায় তের বছর তিনি মক্কায় ছিলেন। এই তেরটি বছর তারা তাঁর বিরুদ্ধে ক্রমাগত ষড়যন্ত্র করে গেল।
মক্কায় সীমাহীন নির্যাতনেও অটল-অবিচল!
তৎকালীন কোরায়েশরা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও তারা ওই সমাজে আল্লাহর হুকুমের পরিবর্তে মানুষের তৈরি হুকুম, গায়রুল্লাহর তৈরি বিধান কায়েম করে রেখেছিল। বেশ কিছু সিন্ডিকেট তারা দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। তাদের প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস ও রাজনীতি, এই দুইটা জিনিস পাশাপাশি হাত ধরে সমাজটাকে তখন শোষণ করে যাচ্ছিল। আবু জাহেল, উতবা, উমাইয়া, আবু সুফিয়ান, ওয়ালিদের মতো ব্যক্তিরা ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দিতো। ধর্মের নামে ব্যবসা, অনাচার, নানা ধরনের অদ্ভুত প্রথা জারি রেখে তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করে রেখেছিল। তারা কোনোভাবেই চায় নি তাদের এই সিন্ডিকেট ভেঙে পড়ুক। তারা সম্মিলিতভাবে রাসূলুল্লাহকে প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নিলো। পথেঘাটে তাঁর উপর হামলা করলো। কিন্তু তিনি পর্বতের অটল রইলেন। তাঁর সাহাবীদেরকেও অটল থাকার অনুপ্রেরণা দিলেন। শেষ পর্যন্ত কোরায়েশ নেতারা তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলো। কিন্তু আল্লাহ তাঁর রাসুলকে নিরাপদে সরিয়ে নিলেন। তিনি মদিনায় হিজরত করলেন। মক্কার যে অল্পকিছু মানুষ তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিলেন, তাঁরাও মদিনায় চলে গেলেন। আনসার সাহাবীরা তাঁদেরকে আশ্রয় দিলেন। প্রতিষ্ঠিত হলো নতুন ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র।
শুরু হলো দীন প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রাম
মদিনায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (স) তার পরবর্তী মিশন শুরু করলেন। তিনি তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি জানতেন তাঁকে পাঠানো হয়েছে লড়াই-সংগ্রাম করে আল্লাহর দীনকে সারা পৃথিবীতে বিজয়ী করার জন্য। (সুরা ফাতাহ: ৮, সুরা সফ: ৯, সুরা তওবা: ৩৩)।
সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি সামরিক অভিযান শুরু করলেন। একে একে বদর, উহুদ, খন্দকের মতো ইতিহাস বদলে দেয়া যুদ্ধ সংঘটিত হলো। মাত্র ১০ বছরে তিনি ছোট-বড় মিলিয়ে ১০৭টা যুদ্ধ ও অভিযান পরিচালনা করলেন। দীন প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামে শত শত সাহাবী শহীদ হলেন। তাঁরা রক্ত দিলেন, জীবন দিলেন, বাড়িঘরের মায়া ত্যাগ করে জেহাদের ময়দানে পড়ে রইলেন, পেটে পাথর বাঁধলেন। রাসূল (সা:) নিজেও আহত হলেন, রক্তাক্ত হলেন। তাদের এই কোরবানি, এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে মাত্র ১০ বছরে জাজিরাতুল আরবে সাড়ে বারো লক্ষ বর্গমাইল এলাকায় আল্লাহর দীন কায়েম হলো।
দীন কায়েমের ফলাফল কি হয়েছিল?
এর ফলাফলটা ছিল অভাবনীয়। জাহেলি সমাজ বদলে যেয়ে আলোকিত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলো। যেখানে কোন ঐক্য ছিল না সেখানে একটা ঐক্যবদ্ধ জাতি হলো। যেখানে কোনো বিচারব্যবস্থা ছিল না সেখানে ন্যায়বিচারের উপর আদালত কায়েম হলো। যেখানে কোন সংগঠিত সেনাবাহিনী ছিল না সেখানে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য অনুপ্রাণিত, জীবন উৎসর্গকারী, প্রচণ্ড গতিশীল, দুঃসাহসী এক সেনাবাহিনী তৈরি হলো। যে বাহিনীর সদস্যদের পেটে ভাত না থাকলেও কোমরে তলোয়ার ছিল।
এদিকে অভাব-দারিদ্র্য দূর হয়ে গেল। যারা ক্ষুধার জ্বালায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতো, সেই মানুষগুলি উটের পিঠে বোঝাই করে খাবার নিয়ে ঘুরতো, অথচ তা গ্রহণ করার মতো কেউ ছিল না। যাকাত ব্যবস্থা, উশর, খারাজ, ফাইসহ দানের আরো বহুবিধ ব্যবস্থা চালু হলো। ফলে অর্থ-সম্পদ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জিভূত না হয়ে জনগণের মধ্যে সঞ্চালিত হতে লাগলো। বৈষম্য কমে আসলো, অর্থনীতি সুসংহত হলো।
মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা কায়েম হলো, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হলো, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো। মেয়ে শিশুদেরকে জীবন্ত কবর দেয়ার বদলে তাদের অধিকার, সম্মান, স্বাধীনতা বুঝিয়ে দেয়া হলো। তারা শালীন পোশাক পরে জুমার নামাজে, ঈদের নামাজে, হজের ময়দানে, বাজারে, হাসপাতালে- এক কথায় সকল ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করলো। এমনকি সেনাবাহিনীতেও তারা যুক্ত হলো। পিতা, স্বামী ও ভাইয়ে সম্পত্তিতে তাদের অধিকার প্রদান করা হলো।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা আসলো আরবদের আধ্যাত্মিক জগতে। যারা মৃত্যুর পরে আর কোনো কিছু আছে বিশ্বাস করতো না, তারা কেয়ামত, আখিরাত, হাশর, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদিতে বিশ্বাস স্থাপন করলো। অপরাধ করলে কেউ দেখুক বা না দেখুক, আল্লাহ দেখবেন; আল্লাহর কাছে এর জবাব দিতে হবে; হাশরের দিন এর বিচার হবে- এই বিশ্বাসগুলো তাদেরকে ভেতর থেকে বদলে দিল। এক সময় যারা ছিল চরম অপরাধী, তারা ধীরে ধীরে ভালো মানুষে রূপান্তরিত হলো। এক সময় যেখানে চুরি-ডাকাতি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা, সেখানে কোথাও কিছু হারিয়ে গেলেও তা খোয়া যেত না। স্বর্ণকার দোকান খোলা রেখে মসজিদে চলে যেত, দোকান বন্ধ করারও প্রয়োজন অনুভব করতো না। এক কথায় সমাজ থেকে অপরাধ লুপ্ত হয়ে গেল। কদাচিৎ যদি কেউ কোনো অপরাধ করতো, নিজে আদালতে এসে বলতো- আমি অপরাধ করেছি, আমাকে শাস্তি দিন!
পরিবারে শান্তি কায়েম হলো, সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হলো। রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলো। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলো। বিদায় হজের ভাষণে রাসূলে পাক (সা:) মানবজাতির মুক্তির মহাসনদ ঘোষণা করলেন।
দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লো উম্মতে মুহাম্মাদী
রাসুলুল্লাহ (স)-এর জীবদ্দশাতেই গোটা জাজিরাতুল আরবে এই অভাবনীয় পরিবর্তন চলে আসলো। তবে তিনি জানতেন, তাঁর এক জীবনে সারা পৃথিবীতে দীন কায়েম করা সম্ভব নয়। তাই তিনি একটি জাতি গঠন করলেন, যার নাম উম্মতে মুহাম্মাদী। এই জাতিকে তিনি সেভাবেই প্রশিক্ষিত করে তুললেন, যেন তারা তাঁর অবর্তমানে দীন প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যায়।
অতঃপর একদিন ডাক আসলো। রাসুলুল্লাহ (সা:) চলে গেলেন আল্লাহ পাকের সান্নিধ্যে। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁরই হাতে গড়া উম্মাহ বেরিয়ে পড়ল দুনিয়ার বুকে। তারা বাড়িঘর ত্যাগ করে, স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের মায়া ত্যাগ করে পরবর্তী ষাট-সত্তর বছর লাগাতার লড়াই করে গেলেন।
রাসুলুল্লাহ (সা:) এর নবুওয়াত পাওয়ার পর থেকে ধরলে সময়ের হিসাবটা মোটামুটি ১০০ বছর। এই ১০০ বছর জাতি তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে অটল ছিল। তারা আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করার জন্য অবিরাম সংগ্রাম করে গেল। তারা বহুগুণ শক্তিশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। তৎকালীন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় দুই শক্তি পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যকে তারা একসাথে (at a time) আক্রমণ করলেন। তারা নতুন ইসলামী বিপ্লবের সামনে তাসের ঘরের মতো উড়ে গেল। একদিকে কারাকোরাম পর্বতমালা, অন্যদিকে আটলান্টিকের তীর, একদিকে আফ্রিকার বিরাট অংশ, অন্যদিকে এশিয়ার বৃহত্তর অংশ, সব মিলিয়ে তৎকালীন পরিচিত বিশ্বের অর্ধেকটার বেশি তারা জয় করে নিলেন।
তাদের এই সংগ্রামের ফলে ফলে অর্ধদুনিয়াতে আল্লাহর দ্বীন কায়েম হলো। ন্যায় বিচার, সুশাসন জারি হলো। মানবাধিকার, মানবতা প্রতিষ্ঠা হলো। জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল। যার ধারাবাহিকতা একসময় মুসলিমরা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, সামরিক শক্তিতে, নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিতে নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে লাগলো। তারা হয়ে গেল দুনিয়ার সভ্যতা-ভব্যতার শিক্ষক।
অতঃপর ঘটে গেল দুর্ভাগ্যজনক অধঃপতন
একসময় রাসূলুল্লাহর (স) সেই মহান সাহাবীরা একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। পরবর্তী সত্যনিষ্ঠ উম্মাহও বিদায় নিলেন। কেটে গেল প্রায় এক শতাব্দী সময়কাল। এরপর একে একে ঘটতে লাগলো মহা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। উম্মাহ তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের কথা ধীরে ধীরে ভুলে যেতে লাগলো। ‘উম্মতে মুহাম্মাদী নামক এই জাতিটাকে তৈরিই করা হয়েছে সংগ্রাম করে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য’ এই লক্ষ্যটাই তারা ভুলে গেল। সাহাবীদের পবিত্র রক্তের বিনিময়ে যে মাটিটুকু জাতির পায়ের নিচে এসেছিল, পরবর্তী উম্মাহ মহা আনন্দে সেটাকে সাম্রাজ্য মনে করে ভোগ করতে শুরু করলো। তাদের শাসকেরা দীন প্রতিষ্ঠার লড়াইকে সাম্রাজ্য বিস্তারের লড়াই হিসেবে নিয়ে নিলো। সুলতানরা বিশাল বিশাল হেরেমখানা তৈরি করলো। সুবিশাল চোখ ধাঁধানো প্রাসাদ তারা তৈরি করলো। এক অকল্পনীয় ভোগ-বিলাসিতা, আরাম-আয়েশে ডুবে গেল তারা।
কথা ছিল পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাকি পৃথিবীতে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করবে। এই পর্যায়ে এসে সেই কাজ পরিত্যক্ত হয়ে গেল। জাতি সেই জিহাদ বাদ দিলো। উম্মাহর ঐক্য ধ্বংস হয়ে গেল, শৃঙ্খলা হারিয়ে গেল, নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য চলে গেল। তারা অনর্থক অপ্রয়োজনীয় ছোটখাটো মাসলা-মাসায়েল নিয়ে মারামারি করতে শুরু করলো। নিজেদের মধ্যে তর্ক-বাহাসে জড়িয়ে নিজেরা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেল।
এদিকে একদল লোক পারস্য থেকে বিকৃত অধ্যাত্মবাদ, সুফিবাদ জাতির মধ্যে প্রবেশ করে জাতিকে অন্তর্মুখী, ঘরমুখী করে দিল এবং তাদেরকে জেহাদের ময়দানের পরিবর্তে খানকার ভিতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে তসবি জপতে শেখালো। প্রচণ্ড দুর্দান্ত, দুর্দমনীয়, অনমনীয় জাতিটা একটা সময় স্থবির হয়ে গেল।
শুরু হলো শত্রুর আক্রমণ
এদিকে শত্রুরা কিন্তু বসে ছিল না। মুসলিমরা যখন স্থবির হয়ে গেল তখন শত্রুরা সম্মিলিতভাবে তাদেরকে ধ্বংস করার জন্য পাল্টা আক্রমণ চালালো। সর্বপ্রথম বৃহত্তর পরিসরে আক্রমণটা চালালো হালাকু খান অর্থাৎ মোঙ্গলরা, পরে ক্রুসেডাররা এবং সর্বশেষ ব্রিটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। তারা পুরা মুসলিম বেল্টটাকে টুকরা টুকরা করে নিজেদের দাস বানিয়ে নিলো। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধরে চললো এই আগ্রাসন।
অথচ ওই সময় মুসলিমরা সংখ্যায় ছিল কোটি কোটি। তাদের মধ্যে অনেক পীর-মাশায়েক, বহু ওলি-আউলিয়া, গাউস-কুতুব ছিলেন। বড় বড় ফকিহ, পন্ডিত, লেখক, মুফাসসির, মুফতি ছিলেন। তাদের আমলে ঘাটতি ছিল না। রোজা, নামাজ, হজ্ব সহ অন্যান্য আমল তখনো চলছিল, এমনকি আগের চেয়ে বেশি চলছিল। শুধু একটা জিনিস হারিয়ে গেল- লড়াই করে আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করার সংগ্রাম। ফলে ইউরোপীয় শক্তির আক্রমণে সম্পূর্ণ জাতিটা বিধ্বস্ত হয়ে গেল এবং তাদের গোলামে পর্যবসিত হলো।
ফিরে এলো সেই জাহেলিয়াত
ইউরোপীয় শক্তিগুলো এই উপমহাদেশসহ মুসলিম বেল্টগুলো দখল করে নেয়ার পর তাদের তৈরি শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনৈতিক সিস্টেম, বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি, সামরিক-বেসামরিক সিস্টেম, আমলাতন্ত্র, বাণিজ্য ব্যবস্থা- এককথায় তাদের সভ্যতা আমাদের উপর চাপিয়ে দিলো। যেখানে আমাদের সমস্ত সিস্টেমের মূলে ছিল একটি কথা- ‘আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো হুকুম মানি না’, সেখানে কায়েম হলো ব্রিটিশ বা ইউরোপীয়দের হুকুম।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী পরিস্থিতিতে বৃটিশরা চলে গেল, উপমহাদেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু তারা রেখে গেল তাদের প্রণীত সিস্টেম- মানুষের তৈরি জীবনব্যবস্থা। তারও ২৩ বছর পরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা পেলাম স্বাধীন বাংলাদেশ। তার পরে পেরিয়ে গেল আরো ৫৫ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে অনেকগুলি অভ্যুত্থান হলো, বিপ্লব হলো, একের পর এক সরকারের পরিবর্তন হলো। কিন্তু সেই সিস্টেমের পরিবর্তন আর হলো না!
এর ফলাফল হলো ভয়ংকর। অন্যায়, অবিচার, জুলুম, রক্তপাত, খুন, ধর্ষণের মতো অপরাধগুলো প্রকট আকার ধারণ করলো। ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, বাক-স্বাধীনতা বলে কিছু রইলো না। মানুষের জীবন-সম্পদের কোনো নিরাপত্তা রইলো না। এখানে চার বছরের শিশু থেকে সত্তর বছরের বৃদ্ধা নারী পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আদালতে লক্ষ লক্ষ মামলা জমা হয়ে আছে। অফিসে অফিসে দুর্নীতি চলছে। সুদ ও ট্যাক্সের জ্বালায় মানুষ অস্থির হয়ে পরেছে। সমাজ আজকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পরেছে।
এ যেন সেই আরবের জাহিলি সমাজ! চোখ বন্ধ করে কল্পনা করলে মনে হয়, আমরা যেন ঠিক সেই সমাজে প্রত্যাবর্তন করেছি। ঠিক সেই অনৈক্য, নিরাপত্তাহীনতা, নারীর অসম্মান, অন্ধত্ব-কূপমণ্ডূকতা, ধর্মান্ধতা-ধর্মব্যবসা, অপরাজনীতি, খুনোখুনি, সুদ-ঘুষ-দুর্নীতি, অরাজকতা, চুরি-ডাকাতি-অপরাধ প্রবণতা, সব যেন নতুন করে ফিরে এসেছে।
জাতির মুক্তির উপায় কী?
আমরা হেযবুত তওহীদ প্রতিনিয়ত একটা কথা বলে যাচ্ছি, ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তন, অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। মুক্তির জন্য প্রয়োজন গোটা সিস্টেমের আমূল পরিবর্তন, মূলনীতির পরিবর্তন, বৈপ্লবিক পরিবর্তন। যেটা রাসুলুল্লাহ (সা:) করে গিয়েছিলেন। কি সেটা?
“মানুষের তৈরি সিস্টেম বা জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে আল্লাহর দেয়া জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। আল্লাহর হুকুম দিয়ে, আল্লাহর বিধান দিয়ে আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, আইন-আদালত ইত্যাদি সমস্ত কিছু পরিচালিত করা।”
আমরা কিন্তু বলছি না, আজকের যুগে চলমান সমস্ত প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের অঙ্গসমূহ অকেঁজো করে দিতে হবে বা বাতিল ঘোষণা করতে হবে। না, তা নয়। বরং প্রত্যেকটা অঙ্গনে শুধু মানুষের তৈরি হুকুমের পরিবর্তে আল্লাহর হুকুম কায়েম করতে হবে। ব্যক্তি থেকে পরিবার, সমাজ থেকে রাষ্ট্র, অর্থনীতি থেকে পররাষ্ট্রনীতি, আদালত থেকে সামরিক বাহিনী, প্রতিটি অঙ্গন আল্লাহর হুকুম দ্বারা পরিচালিত করতে হবে। আমাদেরকে উপলব্ধি করতে হবে- আমাদের রব একজন, আমাদের রাসুল একজন, আমাদের কোরআন একটি, আমাদের কাবা একটি; অত:এব আমাদের জাতিও হবে একটি। আমাদের নেতাও হবেন একজন। একজন সত্যনিষ্ঠ নেতার নেতৃত্বে পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর হুকুমের আলোকে সমস্ত কিছু পরিচালিত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা- এই পরিবর্তনের চেতনাটা আসতে হবে একেবারে তৃণমূল থেকে। জনগণ যদি পরিবর্তনের কোন চেতনা লালন না করে, তাহলে সিস্টেমের এই আমূল পরিবর্তন আসবে না। আর জোর করে পরিবর্তন আনলেও কোন লাভ হবে না। কারণ যে সমাজের মানুষের মধ্যে আত্মিকভাবে পরিবর্তন আসে নি, সেই সমাজে শক্তি দিয়ে অপরাধ দমন করা যায় না। তাই জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা মানুষের তৈরি জীবনব্যবস্থা চালু রাখবে, নাকি আল্লাহর দেয়া ঐশী বিধান অনুযায়ী তাদের জীবন পরিচালনা করবে।
সত্যদীন প্রতিষ্ঠায় আমাদের আহ্বান
সর্বশেষ আমি শুধু একটি কথা বলতে চাই, মুক্তির পথ পাওয়া গেছে। রাসুলুল্লাহ (স) যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জাহেলি আরব সমাজকে আলোকিত করেছিলেন; ক্ষুধার্ত, অসভ্য, বর্বর জাতিকে পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য ও শক্তিশালী জাতিতে পরিণত করেছিলেন, সেই সত্যদীন ইসলামের সঠিক রূপরেখা মানুষের সামনে পুনরায় তুলে ধরেছেন হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাতা এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। ইসলাম কি, ইসলাম আগমনের উদ্দেশ্য কি, কেন উম্মতে মুহাম্মদী নামক জাতিটাকে গড়ে তোলা হয়েছিল, কেন তারা লড়াই-সংগ্রাম করেছিলেন, কিভাবে তারা বিশ্বকে জয় করেছিল, কেনই বা পরবর্তী প্রজন্ম পরাজিত হলো, আর আজ কেন আমরা সারা পৃথিবীতে নিপীড়িত-লাঞ্ছিত, এই সমস্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর তিনি দিয়ে গিয়েছেন পবিত্র কোরআন, হাদিস ও ইতিহাসের আলোকে। এমামুয্যামানের ওফাতের পর আমরা হেযবুত তওহীদ সেগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরছি।
আমরা বলছি, আমাদের এই দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তির একটাই পথ- আল্লাহর হুকুমের ভিত্তিতে আমাদের সার্বিক জীবন পরিচালিত করতে হবে। এদেশের মানুষ বহু রকমের শাসন দেখেছে, কিন্তু কোনো কালে তারা শান্তি পায় নি। আমরা বলছি, শান্তির একমাত্র গ্যারান্টি- ইসলাম। এটা আল্লাহর দেয়া একমাত্র নিখুঁত-ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এবং এটি একটি পরীক্ষিত জীবনব্যবস্থা যা শত শত বছর মানবসমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং মানুষকে শান্তি দিয়েছিল। আজকে যদি আমরা পুনরায় সেই জীবনব্যবস্থাকে আলিঙ্গন করে নেই, তাহলে আবারো আমরা শান্তি ফিরে আসবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈমানের এই ডাকে সাড়া দেয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম
