হোম » নিবন্ধ » বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৃথিবী আলে...

বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৃথিবী আলেমদের করণীয়

auth হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম ১৬ জুন ২০২৬
১১ মিনিটে পড়ুন
feature

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ২৩ বছরের নবুয়তি জীবন দুই ভাগে বিভক্ত। মক্কী জীবনের ১৩ বছর তিনি কেবল তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইসলামের সমগ্র বিষয় দুইটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: ঈমান ও আমল। ঈমান হলো আল্লাহর সাথে বান্দার একটি চুক্তি। ইসলামে প্রবেশ করতে হলে প্রথমে তওহীদের উপর ঈমান আনতে হবে। আর নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতসহ সকল ইবাদত হলো আমল।

আমাদের দেশের আলেম-ওলামারা শুক্রবারের খুতবা ও ওয়াজ-মাহফিলে নানা বিষয়ে বক্তব্য দেন। এর মধ্যে অনেক অপ্রয়োজনীয় ও বিতর্কিত বিষয়ও থাকে। ফলে মুসলমানদের মধ্যে ফেরকা, মাযহাব, তরিকা ও দল-উপদলের বিভেদ বাড়ছে, একে অপরের বিরুদ্ধে ফতোয়া চলছে। এতে সময় ও শ্রম নষ্ট হচ্ছে এবং পারস্পরিক শত্রুতা-বিদ্বেষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্ব পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ইতিমধ্যে ১৭টি জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। আজারবাইজানে হামলার মাধ্যমে তা মধ্য এশিয়ায় পৌঁছে গেছে, যা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের খুব কাছাকাছি। দুটি বড় যুদ্ধ এক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যেমন দাবানল একবার শুরু হলে সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। এমন সংকটময় সময়ে জনগণের সামনে ফেরকাবাজি, ফতোয়া ও বিভেদের আলোচনা না করে, তাদেরকে তওহীদের উপর ঐক্যবদ্ধ করাই এখন আলেমদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রথম কাজ হওয়া উচিত।

আলেম-ওলামাদের উচিত এখন সকলে একযোগে সাধারণ মুসল্লিদের সামনে শুধু তওহীদ ও জিহাদ নিয়ে আলোচনা করা। কুরআনে আল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন: যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে এবং জান-মাল দিয়ে জিহাদ করে, তারাই প্রকৃত মো’মেন (সুরা হুজুরাত ১৫)। আল্লাহ চান আমরা সবাই মো’মেন হই। তাই আলেমদের প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত- জনগণকে মো’মেন বানানো। ফেরকা, মাযহাব বা বিতর্কিক আলোচনা নয়, শুধু তওহীদ ও জিহাদের দাওয়াত। মো’মেন তৈরি করতে পারলে আমাদের উদ্দেশ্যও হাসিল হবে, আল্লাহর উদ্দেশ্যও হাসিল হবে।

তওহীদ কেন বেশি জরুরি

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ২৩ বছরের নবুয়তি জীবন দুই ভাগে বিভক্ত। মক্কী জীবনের ১৩ বছর তিনি কেবল তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইসলামের সমগ্র বিষয় দুইটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: ঈমান ও আমল। ঈমান হলো আল্লাহর সাথে বান্দার একটি চুক্তি। ইসলামে প্রবেশ করতে হলে প্রথমে তওহীদের উপর ঈমান আনতে হবে। আর নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতসহ সকল ইবাদত হলো আমল। যার ঈমান নেই, তার কোনো আমলের কোনো মূল্য নেই। অথচ আমাদের মসজিদ, মাহফিল ও মাদ্রাসায় বেশিরভাগ সময় শুধু আমলের গুরুত্ব, সওয়াব, নিয়ম-কানুন ও মাস’আলা-মাসায়েল শেখানো হয়। ফলে আমলের উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু ঈমানের কথা আলোচনাই করা হয় না। অথচ ঈমানই আমাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। আমল শুধু জান্নাতের বিভিন্ন স্তর নির্ধারণ করবে। সুতরাং, প্রথমে জান্নাতে প্রবেশের ব্যবস্থা করতে হবে, তারপর স্তরের চিন্তা।

“ঈমানের সারকথা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ – অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম-বিধান মানব না। এই অঙ্গীকারের মাধ্যমে বান্দা তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শুধুমাত্র আল্লাহর হুকুমই মেনে চলবে।”

তাই জনগণকে সর্বপ্রথম তওহীদ কী, ঈমান কী, তা ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। ঈমানের সারকথা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ – অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম-বিধান মানব না। এই অঙ্গীকারের মাধ্যমে বান্দা তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শুধুমাত্র আল্লাহর হুকুমই মেনে চলবে। এই ঈমানের মাধ্যমে ইবলিসের চ্যালেঞ্জে আল্লাহ বিজয়ী হবেন এবং দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। আলেম-ওলামাদের উচিত জনগণকে প্রথমে প্রকৃত ঈমানের মধ্যে নিয়ে আসা।

জন্মগতভাবে ঈমানদার হওয়া যায় না

আমাদের একটি বড় সমস্যা হলো, আমরা ধরেই নিয়েছি যে আমাদের ঈমান আছে। এখন শুধু বেশি বেশি নামাজ রোজা করলেই জান্নাতের উচ্চ স্তরে চলে যাব। ঈমান যেন এক জন্মগত বিষয়। কিন্তু বংশ-পরম্পরায় প্রাপ্ত আল্লাহর উপর সাধারণ বিশ্বাসকে ঈমান বলা যায় না। প্রকৃত ঈমানদার হতে হলে আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ হিসাবে মেনে নিতে হয়। ইলাহ অর্থ যাঁর হুকুম মানতে হয়। শুধু আল্লাহকে স্রষ্টা, প্রতিপালক হিসেবে বিশ্বাস করে বাস্তব জীবনে অন্য কারো (যেমন ব্রিটিশদের) হুকুম মানলে তাকে ঈমান বলা যায় না।

“যার ঈমান নেই, তার কোনো আমলের কোনো মূল্য নেই। … ঈমানই আমাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। আমল শুধু জান্নাতের বিভিন্ন স্তর নির্ধারণ করবে।”

মক্কার কাফেররাও বিশ্বাস করত যে সবকিছুর স্রষ্টা আল্লাহ। তারা আল্লাহকে খালেক, মালেক ও প্রতিপালক বলে জানত। তারা নামাজ পড়ত, রোজা রাখত, হজ করত এবং পরকালেও বিশ্বাস করত। তারা কাজ শুরু করার আগে “বিসমিকা আল্লাহুম্মা” বলত। নবীজি (সা.)-এর পিতার নামও ছিল আব্দুল্লাহ (আল্লাহর দাস)। তবুও তারা কাফের ছিল। কারণ তারা আল্লাহকে ইলাহ অর্থাৎ একমাত্র হুকুমদাতা হিসেবে মানত না। তারা মূর্তি পূজা করত এবং বিশ্বাস করত যে লাত, মানাত, উজ্জা তাদের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে – ঠিক যেমন আজ অনেক মুরিদ পীর-ফকিরের সুপারিশে বিশ্বাস করে।

তাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম মানার কোনো অঙ্গীকার ছিল না। ফলে তাদের তওহীদের প্রতি ঈমান ছিল না। এজন্যই রাসূলুল্লাহ (সা.) তওহীদের বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ব্যক্তিগত জীবনে নামাজ পড়ো, রোজা রাখো, হজ করো – এসব করলেও জান্নাতে যাওয়া যাবে না এবং ইসলামের উদ্দেশ্যও হাসিল হবে না।

ইসলামের উদ্দেশ্য

ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হলো – মানুষ যেন নির্ভয়ে ঘরের দরজা খুলে ঘুমাতে পারে এবং সমাজে শান্তি, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্য আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ হিসেবে মানতে হবে এবং আল্লাহর হুকুম-বিধান ছাড়া অন্য কারো হুকুম মানা যাবে না। যারা এই প্রকৃত ঈমান আনবে, তারাই কেবল জান্নাতে যেতে পারবে। এজন্যই হাদিসে এসেছে: “যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সহীহ বুখারী ৭৩৭২, সহীহ মুসলিম ১৯ ও অন্যান্য)

তবে শুধু মুখে স্বীকার করলেই চলবে না। বাস্তব জীবনে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি অন্য কারো হুকুম-বিধান মানা হয়, তাহলে তা মুনাফেকি। আর ইসলামে মুনাফিকের স্থান জাহান্নাম। সুতরাং, অন্তর (কলব) থেকে বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহর হুকুমই আমাদের জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে এবং ইহকাল ও পরকালে মুক্তি দেবে।

একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে মেনে নিল, তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” এ কথা শুনে আবু যর গিফারী (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! যদি সে ব্যভিচার করে, চুরি করে?” রাসূলুল্লাহ (সা.) তিনবার বললেন, “হ্যাঁ, তবুও আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে তাকে জান্নাত দান করবেন।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)। তওহীদ এত গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এই তওহীদের মাধ্যমেই ইবলিসের চ্যালেঞ্জে আল্লাহ বিজয়ী হবেন। ফলে মানবজীবনে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

মুসলিমরা যেভবে ইসলাম থেকে সরে গেছে

বর্তমানে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তারা আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে মানছে না। ব্যক্তিগত জীবনে তারা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, হজ করে – কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহর আইন মানে না। তারা মানে পশ্চিমাদের তৈরি আইন। দ্বিতীয়ত, আদালতের বিচারও আল্লাহর বিধান অনুসারে হয় না। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা হজ করতে যান, আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায়। কিন্তু বিচারের রায় দেন পশ্চিমা আইন অনুসারে।

“ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হলো – মানুষ যেন নির্ভয়ে ঘরের দরজা খুলে ঘুমাতে পারে এবং সমাজে শান্তি, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।”

আল্লাহ সুরা বাকারায় বলেছেন, “কুতিবা আলাইকুম কিসাস” – অর্থাৎ হত্যার বদলে সমপরিমাণ বদলা নেওয়া ফরজ (সুরা বাকারা ১৭৮)। কিন্তু আজ এ আদেশ গ্রাহ্যই করা হয় না। চুরি, ব্যভিচার, ডাকাতি ইত্যাদি অপরাধের জন্য কুরআনে যে শাস্তির বিধান রয়েছে, তা আজ আর প্রয়োগ হয় না। আমাদের বিচারালয়গুলোতে এখনও ব্রিটিশ আমলের তৈরি আইন অনুসারে বিচার চলে। ফলে এ জাতি আর ইসলামের মধ্যে নেই।

মুসলিমরা শিরকে নিমজ্জিত

বর্তমানে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তারা আল্লাহর কিছু বিধান মানছে, আবার কিছু বিধান মানছে না। অথচ আল্লাহর কিছু আদেশ মানা এবং কিছু আদেশ না মানা স্পষ্ট শিরক (সুরা বাকারা ৮৫)।

উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ শূকরের মাংস খাওয়া হারাম করেছেন। এক টুকরো শূকরের মাংস কোনো মুসল্লির প্লেটে দিলে গণপিটুনিতে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। কিন্তু আল্লাহ সুদকেও হারাম করেছেন। সেই একই ব্যক্তি শূকরের মাংসের কথা শুনলে বমি করে ফেলেন, অথচ নির্দ্বিধায় সুদ খাচ্ছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে হারাম (শূকর) মানছেন, কিন্তু সমষ্টিগত ও অর্থনৈতিক জীবনে হারাম (সুদ) মানছেন না। রমজান মাসেও ব্যাংকে সুদের হার ১৬% থাকে। রোজা রেখেও এ জাতি কোটি কোটি টাকার সুদ খায়। বাংলাদেশকে প্রতি বছর প্রায় দেড় লক্ষ কোটি টাকা সুদ দিতে হয়। এভাবে আমরা সুদের মধ্যে ডুবে আছি। অর্থাৎ কিছু মানছি, কিছু মানছি না – এটাই শিরক।

একইভাবে আল্লাহ বলেছেন, “কুতিবা আলাইকুমুস সিয়াম” – তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে (সুরা বাকারা ১৮৩)। তাই মুসলিমরা কষ্ট করে রোজা রাখেন। আবার আল্লাহ বলেছেন, “কুতিবা আলাইকুমুল কিতাল” – তোমাদের উপর যুদ্ধ (জিহাদ) ফরজ করা হয়েছে (সুরা বাকারা ২১৬)। কিন্তু মুসলিমরা রোজা রাখলেও জিহাদ করছেন না। যুদ্ধের কথা উঠলেই বলেন, “এটা রাসূল (সা.)-এর যুগের কাজ, আমাদের কাজ নয়।”

“সংকটময় সময়ে জনগণের সামনে ফেরকাবাজি, ফতোয়া ও বিভেদের আলোচনা না করে, তাদেরকে তওহীদের উপর ঐক্যবদ্ধ করাই এখন আলেমদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রথম কাজ হওয়া উচিত।”

অথচ আল্লাহ কুরআনে জিহাদকে সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করেছেন। তিনি বলেননি যে কিছু লোক করবে, আর কিছু লোক করবে না। ফলে মুসলিমরা কিছু ফরজ মানছেন, কিছু ফরজ মানছেন না। ব্যক্তিগত জীবনের ফরজ (নামাজ, রোজা) মানছেন, কারণ এগুলো নিরাপদ। নামাজ পড়লে বা রোজা রাখলে কারো কোনো সমস্যা হয় না।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে আল্লাহর বিধান চালু করার কথা বললেই তাদেরকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি বলে আখ্যায়িত করা হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প মুসলিমদের উপর বোমা হামলা চালালেও আপনি রোজা রাখলে হোয়াইট হাউজে ইফতারের ব্যবস্থা করতে কোনো আপত্তি নেই। পুতিন মসজিদ বানিয়ে দেন নামাজের জন্য। নরেন্দ্র মোদি হজে যাওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা দেন। নামাজ-রোজা নিয়ে বিশ্বের কারো কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু “রাষ্ট্র চলবে আল্লাহর বিধানে” বললেই সমস্যা শুরু হয়।

প্রথম দায়িত্ব জাতিটাকে তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা

আলেম-ওলামাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে যে, তওহীদ হলো ইসলামের মূল ভিত্তি এবং ইসলামের ঘরে প্রবেশের দরজা। তওহীদ না থাকলে কোনো আমলেরই কোনো মূল্য নেই। তওহীদের অর্থ হলো – জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান ছাড়া কারো বিধান না মানা। কিন্তু বর্তমানে আমাদের সমাজে আল্লাহর কিছু বিধান মানা হচ্ছে, আবার জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনের অনেক বিধান মানা হচ্ছে না। এভাবে গোটা জাতি শিরকে ডুবে আছে। অথচ এই শিরক আল্লাহ কখনো ক্ষমা করবেন না (সুরা নিসা ৪৮)। তাই যারা মুসল্লিদের সামনে ওয়াজ-মাহফিল করেন, তাদের প্রতি আমার আন্তরিক আহ্বান:আপনারা জনগণকে সর্বপ্রথম তওহীদ বুঝিয়ে দিন। তাদেরকে এই একটি কথার উপর ঐক্যবদ্ধ করুন যে – “আল্লাহর বিধান ছাড়া আমরা কারো বিধান মানব না।” এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।

দ্বিতীয় কাজ দীন প্রতিষ্ঠা

ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পর আমাদের দ্বিতীয় কর্তব্য হলো আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করা। এটিই আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। দীন প্রতিষ্ঠার আকিদা হলো- এটি প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে শান্তি, ন্যায়, সুবিচার ও মানবতা কায়েম হবে, হানাহানি ও যুদ্ধ বন্ধ হবে। তাই ইসলাম মানেই শান্তি। আজ বিশ্বজুড়ে অশান্তি বিরাজ করছে; রাষ্ট্র ও বিভিন্ন শক্তি যুদ্ধের দিকে ঝুঁকছে। এ অবস্থায় সত্যিকারের শান্তি আনতে ঈমানের পর আমাদের প্রধান দায়িত্ব দীন কায়েম করা। আল্লাহ যেমন সালাহ কায়েমের নির্দেশ দিয়েছেন এবং আমরা তা মানি, তেমনি দীন কায়েমের নির্দেশও দিয়েছেন (সুরা শুরা ১৩)। কিন্তু আমরা সেদিকে এগোই না। কেউ কেউ ভিন্ন পদ্ধতিতে দীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। আল্লাহর রসুল ও তাঁর সাহাবিরা যেভাবে দীন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আমাদেরও সেই পথেই দীন কায়েম করতে হবে।

তওহীদ জান্নাতের চাবি

দীন কায়েম না করে আমাদের আলেম-ওলামারা ওয়াজ করছেন। সুন্দর সুন্দর বয়ান শুনে মুসল্লিরা ঘরে ফিরে যাচ্ছেন, নামাজ পড়ছেন। ভাবছেন, নামাজ পড়ে জান্নাতে চলে যাবেন। নামাজ কাউকে জান্নাতে নিতে পারবে না, জান্নাতে নেবে তওহীদ। আর নামাজ আপনার মধ্যে প্রয়োজনীয় আধ্যাত্মিক, মানসিক ও শারীরিক গুণাবলী গড়ে দেবে, যাতে আপনি সংগ্রাম করে তওহীদ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। নামাজের মাধ্যমে আমরা যে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও এক নেতার আনুগত্য, সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা শিখি, তা আমাদের মধ্যে সংগ্রামী চরিত্র নিয়ে আসবে, যাতে আমরা দীন প্রতিষ্ঠা করতে পারি; না হলে নামাজের কোনো প্রয়োজন ছিল না।

যাইহোক, আলেম-ওলামাদের প্রতি আমার আহ্বান- আপনারা মুসলমানদেরকে প্রথমে ঈমানের দাওয়াত দিন। ১০০টা তসবির দানা একত্রে এক সুতোয় বাঁধলে তসবি হয়, আর সেই সুতো কেটে দিলেই তসবিগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক তেমনি বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার রশি হচ্ছে তওহীদ। তাই জনগণকে প্রথমে তওহীদের গুরুত্ব বোঝাতে হবে। এক হাদিসে এসেছে, হাশরের দিন একজন গুনাহগারকে হাজির করা হবে, যার গুনাহের কোনো শেষ নেই। তখন আল্লাহ তার নিজের থেকে একটি কাগজ বের করবেন- যাতে লেখা থাকবে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। আর সেই টুকরোটি ডান পাল্লায় রাখার সাথে সাথে পাল্লা ভারী হয়ে যাবে। সুতরাং, হাশরের দিন ঈমান মানুষকে জান্নাতে নেবে। অন্য কিছু সেদিন কাজে আসবে না।

শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল সূত্র

জনগণ মনে করে, তাদের ঈমান আছে। কিন্তু তিক্ত সত্য হচ্ছে, জনগণের ঈমান নেই। কারণ তারা আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে মানে না। রাষ্ট্রীয় জীবনে আল্লাহর হুকুম-বিধান যে মানতে হবে, এটা তারা বুঝে না। জনগণ আল্লাহকে বিশ্বাস করে, ঠিক যেমন মক্কার কাফেররা আল্লাহকে বিশ্বাস করত। ঈমান কী, কেন এ জাতির ঈমান নেই- এ বিষয়টি জনগণের ভেতরে ভালোভাবে গেঁথে দিতে হবে। এরপর যখন জনগণ আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য কারো বিধান না মানার অঙ্গীকার করবে, তখন জনগণ জনশক্তিতে পরিণত হবে। আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হবে।

এরপর ঐক্যবদ্ধ জনগণকে নিয়ে দীন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হবে। তখন পুরো জাতি এক জাতিতে পরিণত হবে, তাদের নেতা হবেন একজন, হুকুম চলবে আল্লাহর, জনজীবনের শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে আসবে, মানুষ ঘরের দরজা খুলে ঘুমাতে পারবে। আমাদের আল্লাহ এক, রসুল (সা.) এক, কোরআন এক, কাবা এক; আমাদের জাতি হবে একটি, ইমাম হবেন একজন- শান্তি প্রতিষ্ঠার এ সূত্রটি আলেমদেরকে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। ছোটখাটো মাসলা-মাসায়েল, দাড়ি-টুপি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তর্ক, বাহাস, একে অপরকে দোষারোপ, বিষোদগার বন্ধ করে প্রথমে আমাদের তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

বিশ্বের সামগ্রিক পরিস্থিতি খুবই খারাপ। এমতাবস্থায় প্রথমে তওহীদের উপর ঈমান এবং দ্বিতীয়ত আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করা- এটাই আমাদের এখন মূল কাজ। বর্তমানে সারাদেশের আমাদের মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা, মক্তব ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ওলামায়ে কেরামদের এটাই এখন আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত- প্রথমত তওহীদ, ঈমান, একতা; দ্বিতীয়ত জিহাদের মাধ্যমে দীন প্রতিষ্ঠা। এই দুটো জিনিস যদি আলেমরা জনগণকে বোঝাতে পারেন, তাহলে সুরা হুজুরাতের ১৫ নম্বর আয়াতের মো’মেনের সংজ্ঞা পূর্ণ হয়ে যাবে। তখন জনগণই আমাদের শক্তি হয়ে দাঁড়াবে, আমরা আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত হব।

টপিক: আলেমজিহাদতওহীদবিশ্বযুদ্ধ
লেখক পরিচিতি
Author

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম (জন্ম: ২৮ নভেম্বর, ১৯৭২) হলেন একজন সমাজ সংস্কারক, লেখক। তিনি বাংলাদেশ ভিত্তিক অরাজনৈতিক, ধর্মীয় সংস্কারবাদী আন্দোলন হেযবুত তওহীদের বর্তমান সুপ্রিম লিডার (এমাম)। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ বায়েজীদ খান পান্নীর মৃত্যুর পর থেকে তিনি সংগঠন প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি চরমপন্থা ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে মতাদর্শিক সংগ্রাম, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন এবং প্রকৃত ইসলামের প্রচারক হিসেবে পরিচিত।
×
QR কোড স্ক্যান করুন